ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেন মোরশেদুল

২৮ অক্টোবর থেকে নিজ উদ্যোগ ও খরচে বিনা মূল্যে দূরপাল্লার ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেন মোরশেদুল হক। পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন থেকে তিনি এই উদ্যোগ শুরু করেছেন। তিনি রেলওয়ে পশ্চিমের ১৮টি ট্রেনের প্রতিটিতে ৩০ ও ৪০ পিস করে স্যানিটারি ন্যাপকিন দিচ্ছেন।

৩৫ বছর বয়সী মোরশেদুল হক বললেন, সব ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করার সামর্থ্য তাঁর নেই। একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরির পাশাপাশি ছুটির দিনে তিনি এ কাজ করছেন।

মোরশেদুল চেয়েছিলেন তাঁর উদ্যোগ দেখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সব ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার ব্যবস্থা নিক। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসুক।
এমন কাজ করার জন্য কেউ কেউ মোরশেদুলকে পাগল বলেছেন। ট্রেনে যখন স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে স্টিকার লাগান বা কথা বলেন, তখন কোনো কোনো যাত্রী মুচকি হাসেন। কেউ কেউ ছবি তুলতে আসেন। তবে নারী যাত্রীরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন।

মোরশেদুল বলেছেন, ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে তাঁকে সহযোগিতা করছেন। তিনি আরও বলেন, ট্রেনে খাবার, পানীয় বিক্রি হচ্ছে। ট্রেনে এগুলো পাওয়া যায়, তা সবাই জানে। একইভাবে ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং যাত্রীদের তা জানাতে হবে। প্রয়োজনে কোনো মুঠোফোন নম্বর দেওয়া যায়, যেখানে যাত্রীরা যোগাযোগ করে স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারবেন। যাত্রীরা বিষয়টি জানলে প্রয়োজন হলে ট্রেনের ফার্স্ট এইড বক্স বা যে জায়গায় থাকবে, সেখান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারবেন। স্টেশনগুলোর দোকানেও স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা জরুরি বলেন তিনি।

এসব ভাবনা থেকেই সাধারণ নাগরিক ও ট্রেনের নিয়মিত যাত্রী পরিচয়ে মোরশেদুল হক বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক বরাবর ৩১ অক্টোবর ডাকযোগে একটি চিঠি পাঠান। তাতে দূরপাল্লার সব ট্রেনে নারী যাত্রীরা যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে পারেন এবং নারী যাত্রীরা যাতে বিষয়টি নিয়ে অবগত থাকেন, সে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

কেন এমন উদ্যোগ মোরশেদুলের

২৪ অক্টোবর মোরশেদুল হক বাংলাদেশ রেলওয়ে ফ্যান গ্রুপ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি গ্রুপটিতে লিখেছিলেন, ২৩ অক্টোবর পঞ্চগড়গামী একটি ট্রেনে ছিলেন তিনি। তাঁর পাশের এক নারী যাত্রী মুঠোফোনে কান্নাকাটি করছিলেন। জানতে চাইলেও নিজের সমস্যার কথা বলতে চাননি তিনি। পরে আরেক নারী যাত্রীর সহায়তায় জানা যায়, ওই নারীর মাসিক শুরু হয়েছে, কিন্তু এ নিয়ে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে ক্রসিং থাকায় ট্রেন এক জায়গায় ২০ মিনিটের মতো থামলে মোরশেদুল হক নিচে নেমে ওই নারীকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে এনে দেন।

মোরশেদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ২৩ অক্টোবর ট্রেনে যখন ঘটনাটি ঘটে, তখন তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না হলেও বাসায় ফেরার পর ট্রেনের সেদিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে পীড়া দিতে থাকে। দূরপাল্লার ট্রেনে একেক যাত্রীকে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টাও ভ্রমণ করতে হতে পারে। আর বাসের মতো ট্রেন থামিয়ে তো আর স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা সম্ভব নয়। স্টেশনের দোকানগুলোতে ন্যাপকিন বিক্রিও হয় না। তাই কোনো নারীর ট্রেনে চড়ার পর এবং কোনো প্রস্তুতি না থাকা অবস্থায় মাসিক হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা তো যে কেউ অনুধাবন করতে পারবেন। মূলত তার পর থেকেই তিনি নিজ উদ্যোগে ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা শুরু করেছেন।

প্রথম আলোতে খবর প্রকাশ ও রেলওয়ের উদ্যোগ

৩১ অক্টোবর প্রথম আলো অনলাইনে ‘ভ্যানে উঠিয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ট্রেনে তোলেন নিরুপায় স্বামী’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা রূপন্তী রানী পালের ট্রেনে চড়তে গিয়ে যে ভোগান্তি হয়েছিল, তা তুলে ধরা হয়। এই প্রতিবেদনেই ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন না থাকায় নারী যাত্রীদের যে ভোগান্তি হয়, সে বিষয়ে মোরশেদুল হকের পোস্টের কথা উল্লেখ করা হয়।

ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার জন্য যাত্রী মোরশেদুল হকের যে অনুরোধ, তা বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা-ও দেখবেন তাঁরা।

মোরশেদুল হক বলেন, ‘যে গ্রুপে আমি লেখাটি পোস্ট করেছিলাম, তাতে বিভিন্ন জন ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তবে ওই গ্রুপ থেকে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি কোনোভাবেই পৌঁছানো সম্ভব হতো না। এ কাজ করে দিয়েছে প্রথম আলো। রেলের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। আমি বিভিন্ন ট্রেনে যখন স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করতে যাচ্ছি, তখন রেলের কর্মকর্তারাই প্রথম আলোর প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করছেন এবং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে কথা বলছেন।’

আজ সোমবার বাংলাদেশ রেলওয়ের (পশ্চিম) মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদারের সই করা চিঠিতে পশ্চিমাঞ্চলে চলাচল করা সব ট্রেনে ফাস্ট এইড বক্সে কমপক্ষে দুটি স্যানিটারি ন্যাপকিন (প্যাকেট) রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বিষয়টিকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অসীম কুমার তালুকদার দূরপাল্লার ট্রেনে শৌচাগারগুলোকে যাত্রীবান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বললেন, শৌচাগারগুলোকে যাত্রীবান্ধব করার উদ্যোগ নিলেও প্রথমে তাঁর মাথাতেও স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয়টি ছিল না। মোরশেদুল হক নামের এক যাত্রীর স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে অভিজ্ঞতা, প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশ, মোরশেদুল হকের ব্যক্তি উদ্যোগে ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ এবং পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের আলোচনাতেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাই ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ খাতে বাজেট কোনো সমস্যা হবে না।

রেলওয়ের অংশীজন সভায় স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে আলোচনা

১ নভেম্বর রেলওয়ের অংশীজন সভায় প্রথম আলোর প্রতিবেদন ও ট্রেনে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার। গত এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্দোলন করেন তিনি।

এরপর ৭ জুলাই বাংলাদেশ রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা নিরসনে ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন করে আবার আলোচনায় আসেন মহিউদ্দিন হাওলাদার। ১৪ দিন আন্দোলনের পর রেল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মহিউদ্দিন হাওলাদার আন্দোলন স্থগিত করেন। এ আন্দোলনের ফলেই মহিউদ্দিনকে এ অংশীজন সভায় উপস্থিত থাকার জন্য ডাকা হয়েছিল। এ সভায় রেলের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মহিউদ্দিন বলেন, রেলের অবব্যস্থাপনা প্রতিরোধে তাঁর ছয় দফা দাবির মধ্যে ট্রেনে ন্যায্যদামে খাবার বিক্রি, বিনা মূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা ছিল। তবে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয়টি সরাসরি এতে উল্লেখ ছিল না।

রেলের অংশীজন সভায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আলোচনায় আসা আর ব্যক্তি উদ্যোগে মোরশেদুল হকের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মহিউদ্দিন হাওলাদার।