সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে বোনের ওপর সহিংসতার অভিযোগ যখন ভাইয়ের বিরুদ্ধে

‘ভাই আমার জীবন ছারখার করে দিচ্ছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি’—কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর। মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। আপন বলতে এখন এক ভাই-ই। অথচ উত্তরার যে ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে তাঁদের বিরোধ, সেই ভাইয়ের বিরুদ্ধেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হয়েছে তাঁকে। অভিযোগ, ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাঁকে চাপে রাখছেন ভাই।

যে ভাইয়ের সঙ্গে শৈশব কেটেছে, মা-বাবার মৃত্যুর পর সেই ভাই-ই হয়ে উঠেছেন তাঁর নিরাপত্তাহীনতার কারণ—এমন অভিজ্ঞতা শুধু এই নারীর নয়। সম্পত্তির ভাগ, মা-বাবার রেখে যাওয়া ঘর কিংবা পারিবারিক অধিকার নিয়ে কোথাও ভাই-বোনের সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে, কোথাও নারীকে বঞ্চিত করা হয়েছে, আবার কোথাও অভিযোগ উঠেছে ভয়ভীতি ও মানসিক নির্যাতনের।

ওই নারী জানিয়েছেন, মা–বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ এখনো ভাগাভাগি হয়নি। উত্তরায় মায়ের কেনা ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দুই ভাই-বোন সমান ভাগে নেবেন—এমনটাই মা মৌখিকভাবে বলে গিয়েছিলেন। সেই সম্পদের ভাগ চাওয়ার কারণেই পারিবারিক সহিংসতা শুরু।

পারিবারিক সহিংসতার কথা উঠলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বামীর হাতে স্ত্রীর নির্যাতনের ছবি। কিন্তু নির্যাতন যে কেবল দাম্পত্য সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয়, পরিবারের অন্য সদস্যের হাতেও নারী ও শিশু এর শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে মা-বাবার মৃত্যুর পর একা হয়ে পড়া এমন নারীদের কেউ কেউ আপন ভাইয়ের কাছেই বঞ্চনা, অপমান, ভয়ভীতি কিংবা সম্পদ থেকে অধিকার হারানোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

প্রথম আলো এমন কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, আপন ভাইয়ের হাতে তাঁদের বঞ্চনা ও নির্যাতনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তাঁদের কারও অভিযোগের কেন্দ্রে সম্পদ, কারও ক্ষেত্রে মা-বাবার মৃত্যুর পর বদলে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক। একজন নারী তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে জিডির পর মামলা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে খোঁজ নিয়ে মনে হয়েছে, বোনের (৪৪ বছর বয়সী নারী) ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
মহসিন হাসান, উপপরিদর্শক, উত্তরা পশ্চিম থানা

লিগ্যাল নোটিশ, তারপর জিডি

৪৪ বছর বয়সী ওই নারী একজন উদ্যোক্তা। সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর বাবা ছিলেন রাষ্ট্র মালিকানার একটি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। বাবা মারা যান ২০০০ সালে, মা ২০১৯ সালে। দুই ভাই-বোনের দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। ভাই একটি বেসরকারি ব্যাংকের একটি শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

ওই নারী জানিয়েছেন, মা-বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ এখনো ভাগাভাগি হয়নি। উত্তরায় মায়ের কেনা ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দুই ভাই-বোন সমান ভাগে নেবেন—এমনটাই মা মৌখিকভাবে বলে গিয়েছিলেন। সেই সম্পদের ভাগ চাওয়ার কারণেই পারিবারিক সহিংসতা শুরু।

গত ১৮ জুন ভাইয়ের আচরণ এবং সম্পত্তির কাগজপত্র ‘চুরি’ করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ জানিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠান ওই নারী। এরপর ভাই তাঁকে ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ কারণে ১ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানায় গিয়ে তিনি জিডি করেন। পরে ৮ জুলাই তাঁর ভাই আইনি নোটিশের জবাব পাঠান।

আইনি দুটি নোটিশ পর্যালোচনা করে প্রথম আলো দেখেছে, দুজনই একে অপরের বিরুদ্ধে বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ করেছেন।

২৬ জুন রাতে ভাই উত্তরার বাসায় গিয়ে আইনি নোটিশ প্রত্যাহার করতে বলেন বলে জিডিতে উল্লেখ করেছেন ওই নারী। নোটিশ প্রত্যাহার করতে রাজি না হলে তাঁকে মারধর করতে আসেন, চিৎকার-চেঁচামেচি ও গালিগালাজ করেন এবং ভয়ভীতি ও হুমকি দেন—এমন অভিযোগও করেছেন তিনি।

জিডিতে ওই নারী আরও বলেছেন, তিনি উত্তরার বাসায় একা থাকেন। তাঁর ভাই প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে আসেন এবং রোববার কর্মস্থলে ফিরে যান। ভাই নানা ধরনের ছেলে বাসায় নিয়ে আসেন এবং তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। তিনি বাধা দিলে ভাই খারাপ আচরণ করেন বলে অভিযোগ তাঁর। ভাই অনৈতিক কাজ করেন বলেও সন্দেহ তাঁর।

অভিযোগের বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মহসিন হাসান ২৩ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে খোঁজ নিয়ে মনে হয়েছে, বোনের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

জিডির বিষয়ে তদন্ত করতে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন এসআই মহসিন। চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নন-জিআর (সাধারণ রেজিস্ট্রারবহির্ভূত ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম ও নথিপত্র সংরক্ষণ করা হয় যেখানে) শাখায় অনুমতি চেয়ে থানা থেকে আবেদন পাঠানোর কথা। তবে গত রোববার পর্যন্ত সেই আবেদন পাঠানো হয়নি। এই সপ্তাহে আবেদন পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সম্পদের বিষয়ে ওই ভাই বলেন, তাঁর বোন সম্পদের সমান অধিকার চান। তাঁদের মা মৌখিকভাবে ফ্ল্যাটটি দুই ভাই-বোনের মধ্যে সমান ভাগ করে নিতে বলেছিলেন। তবে এর লিখিত কোনো নির্দেশনা নেই। এ কারণে তিনি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। তাঁরা শরিয়াহ আইন অনুযায়ী সম্পদ ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

‘সম্পদ মূল বিষয় নয়’

জিডি করা নারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাই আমার জীবন ছারখার করে দিচ্ছে। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমরা ভাই-বোন কেউ বিবাহিত নই। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, ভাইয়েরা যখন বোনদের নির্যাতন করে তখন ভাইয়ের স্ত্রীদের উসকানিদাতা হিসেবে দোষারোপ করা হয়। নারীর বিরুদ্ধে নারীকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার চর্চা রয়েছে সমাজে। আসলে ভাই যদি নিজের বোনের প্রতি সহানুভূতিশীল না হন, তাহলে অন্যদের দোষ দেওয়ার কোনো মানে নেই।’

বোনের অভিযোগের বিষয়ে ওই নারীর ভাই ২৪ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি কোনো ধরনের হুমকি বা ভয়ভীতি দেখাননি। বরং বোনের দুর্ব্যবহারের কারণে দুই মাস ধরে তিনি উত্তরার ফ্ল্যাটে যান না।

সম্পদের বিষয়ে ওই ভাই বলেন, তাঁর বোন সম্পদের সমান অধিকার চান। তাঁদের মা মৌখিকভাবে ফ্ল্যাটটি দুই ভাই-বোনের মধ্যে সমান ভাগ করে নিতে বলেছিলেন। তবে এর লিখিত কোনো নির্দেশনা নেই। এ কারণে তিনি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। তাঁরা শরিয়াহ আইন অনুযায়ী সম্পদ ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

মামলার প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়ে ওই নারী বলেন, ‘এখানে সম্পদ মূল বিষয় নয়। আমি নারীর অধিকার নিয়ে উদাহরণ তৈরি করতে চাই। এভাবে পরিবারের আপন সদস্যদের হাতে কোনো নারীর বঞ্চনার শিকার হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’

হুট করেই ভাই বদলে যান

আরেক নারীর গল্পের শুরুটা অন্য রকম। দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে বড় হয়েছেন দুই ভাই-বোন। একজনের প্রতি অন্যজনের মায়াও ছিল। কিন্তু বড় ভাই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর এবং মা-বাবা অসুস্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে।

৪৫ বছর বয়সী ওই নারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করেছেন। এখন ফ্রিল্যান্স পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর বাবা চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তা ছিলেন। চট্টগ্রামে তাঁদের নিজস্ব ফ্ল্যাট ছিল। রাজধানীর মিরপুরে দাদার তৈরি বাড়ি ও দোকান থেকে তাঁর বাবা পেয়েছিলেন ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও একটি দোকানের মালিকানা। ২০২০ সালে মা-বাবা ও ভাই ঢাকায় আসার আগে পাঁচ বছর তিনি ওই বাসায় ছিলেন।

ওই নারী বলেন, এই পাঁচ বছরের মধ্যে পরিবারে একের পর এক খারাপ সময় আসে। ২০১৯ সালে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ঢাকার বাইরে বদলি হলে তিনি দুই সন্তান নিয়ে সেখানে চলে যান। একই বছর তাঁর ভাবি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভাই-ভাবির কোনো সন্তান নেই। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ছয় মাসের ব্যবধানে মারা যান তাঁর বাবা ও মা।

এই সময়েই ভাইয়ের আচরণ আরও বদলে যায় বলে জানান ওই নারী। তাঁর অভিযোগ, ভাই মা–বাবার প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করতেন না। তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। তিনি দুই বছর ঢাকার বাইরে থাকার সময় মা-বাবার জন্য যে টাকা পাঠাতেন, সেটিও তাঁদের জন্য খরচ করতেন না ভাই।

এর মধ্যে রাজশাহীর একটি বাড়ি ৫৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে ভাই পুরো টাকা নিয়ে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। চট্টগ্রামের ফ্ল্যাট বিক্রির টাকারও কিছু তিনি পাননি। ঢাকার ফ্ল্যাটে ভাইয়ের জিম্মায় সাড়ে সাত ভরি সোনা রেখে গিয়েছিলেন, সেটিও তিনি আর পাননি।

এখানে সম্পদ মূল বিষয় নয়। আমি নারীর অধিকার নিয়ে উদাহরণ তৈরি করতে চাই। এভাবে পরিবারের আপন সদস্যদের হাতে কোনো নারীর বঞ্চনার শিকার হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
৪৪ বছর বয়সী নারী

সম্পদের সবকিছু থেকে বঞ্চিত হওয়ায় বাবা মিরপুরের ফ্ল্যাটটি ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করার ইচ্ছার কথা জানান। ভাইও তা মেনে নেন বলে জানিয়েছেন ওই নারী। দোকান বিক্রি করে ভাই নিজেই পুরো অর্থ নিয়ে নেবেন বুঝতে পেরে তিনি দোকানটি কিনে নেন।

তবে ভাইয়ের একটি আচরণ এখনো তাঁকে ভাবায়। ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়ার আগে ভাই ফ্ল্যাটে তাঁর নিজের অংশ বোনের নামে হেবা করে দেন। ওই নারীর ভাষ্য, ‘হয়তো বিদেশে যাওয়ার আগে ভাইয়ের কিছু অনুশোচনা হয়েছিল!’

বর্তমানে মিরপুরের সেই ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছেন ওই নারী। সন্তানদের স্কুলের কাছে নিজে ভাড়া বাসায় থাকেন। ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর আর কোনো যোগাযোগ নেই।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই ৭ মাসে ৩৫টি ঘটনায় নারী ও শিশু নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতেই সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।

পরিবারের কাছে হঠাৎই যেন ‘দাম কমে যায়’

রাজধানীর একটি নামী স্কুলের শিক্ষক আরেক নারী। এক সন্তানের মা। স্বামীও ভালো চাকরি করতেন। পরিবারে মা-বাবা ও একমাত্র ভাই ছিলেন। ঢাকায় বাবা ফ্ল্যাট কেনার সময় তিনি আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। সংসারে তখন তাঁর ও তাঁর স্বামী-সন্তানের যথেষ্ট কদর ছিল।

স্কুলশিক্ষক ওই নারী বলেন, তিন বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর বদলে যায় পরিবারের আচরণ। একার বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় সন্তানকে নিয়ে মা-বাবা ও ভাইয়ের ফ্ল্যাটে আশ্রয় নেন। সেখানে কেউ ভালো ব্যবহার করেন না। ভাই সবচেয়ে বেশি দুর্ব্যবহার করেন।

ফ্ল্যাট কেনার সময় তিনিও টাকা দিয়েছিলেন এবং বাবার ফ্ল্যাটে তাঁরও অধিকার আছে—এ কথা বলার পর ভাইয়ের আচরণ আরও চরম আকার ধারণ করে বলে অভিযোগ ওই নারীর।

অন্য আরেক নারী একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্বামী ও সন্তান নিয়ে থাকেন ঢাকায়। তাঁর বাবার বাড়ি ঢাকার বাইরে। বাবার অনেক সম্পদ রয়েছে সেখানে। এই নারী বলেন, তাঁরা দুই বোন ও চার ভাই। সম্পদ ভাগাভাগির সময় তাঁকে কম মূল্যের ও কম পরিমাণ সম্পদ দেওয়ার প্রতিবাদ করেন তিনি। এতে ভাইয়েরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন।

এমনকি এলাকায় তাঁকে ভাইয়েরা হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনও করেছিলেন। ১০ বছর ধরে ভাইয়েরা তাঁকে বাবার বাড়িতে ঢুকতে দেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি কোনো ধরনের হুমকি বা ভয়ভীতি দেখাননি। বরং বোনের দুর্ব্যবহারের কারণে দুই মাস ধরে তিনি উত্তরার ফ্ল্যাটে যান না।
৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর ভাই

আইনি ব্যবস্থা না নিলেও ভাইদের বিরুদ্ধে তিনি এবং তাঁর বিরুদ্ধে ভাইয়েরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন সময় পাল্টাপাল্টি স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে সম্প্রতি ভাইয়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ করেছেন দুজন নারী। তাঁদের একজন একাকী মা। সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই থাকতেন। বাবা আগেই মারা গিয়েছিলেন। মা মারা যাওয়ার পর ভাই তাঁকে সন্তানসহ বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন

শুধু স্বামী নয়, পরিবারের অন্য সদস্যও হতে পারেন নির্যাতনকারী

পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে সাধারণ আলোচনায় স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের হাতে নারীর নির্যাতনের ঘটনাই বেশি সামনে আসে। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যের হাতে নারী ও শিশুর নির্যাতনের ঘটনাও যে পারিবারিক সহিংসতার আওতায় পড়ে, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম।

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ১০টি জাতীয় দৈনিক, কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল ও নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সংকলিত তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই এই সাত মাসে ২৩৭টি পারিবারিক সহিংসতার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৫টি ঘটনা ছিল স্বামী বা স্বামীর পরিবারের লোকজনের হাতে নারী ও শিশু নির্যাতন ও হত্যার।

আর ৩৫টি ঘটনায় নারী ও শিশু নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতেই সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। তাঁদের অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের বেশি। আরও পাঁচজন নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ৬৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ জনের বয়স ১৯ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

আরও পড়ুন

আইন যা বলছে

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এ পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞা শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। আইনে বলা হয়েছে, পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোনো ব্যক্তি পরিবারের কোনো নারী বা শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন বা আর্থিক ক্ষতি করলে তা পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

আইনে বলা হয়েছে, পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোনো ব্যক্তি পরিবারের কোনো নারী বা শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন বা আর্থিক ক্ষতি করলে তা পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কোনো সম্পদ বা সুযোগ-সুবিধায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ব্যবহার বা ভোগদখলের অধিকার থাকলে তাঁকে সেখান থেকে বঞ্চিত করা কিংবা বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়াও আইনের আওতায় পড়বে। এই আইনের অধীন সংঘটিত কোনো অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সুরক্ষা আদেশ ও ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন আদালত। সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘনের শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।

আরও পড়ুন

পরিবার ও সমাজ ভাইকে ক্ষমতাশালী করে তোলে

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক দীপ্তি শিকদার প্রথম আলোকে বলেন, কোনো কোনো পরিবারে বাবা বা ভাইয়ের হাতে যৌন নিপীড়ন, মা–বাবার ভরণপোষণ না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এসবও পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে পড়ে।

তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও সমাজে অনেক ক্ষেত্রে ছেলে শিশুকে ক্ষমতাশালী হিসেবে বড় করা হয়। মেয়ের তুলনায় ছেলেকে ভালো খাবার, ভালো পড়াশোনা ও বেশি সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে মেয়েকে বৈষম্য মেনে নিতে শেখানো হয়।

ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও সমাজে অনেক ক্ষেত্রে ছেলেশিশুকে ক্ষমতাশালী হিসেবে বড় করা হয়। মেয়ের তুলনায় ছেলেকে ভালো খাবার, ভালো পড়াশোনা ও বেশি সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে মেয়েকে বৈষম্য মেনে নিতে শেখানো হয়।
দীপ্তি শিকদার, লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

‘সোনার আংটি বাঁকাও ভালো’-এ ধরনের সামাজিক ধারণা ছেলেশিশুর মনে এমন বার্তা তৈরি করে যে সে ক্ষমতাবান এবং সম্পদে তাঁরই অধিকার বেশি। বড় হয়ে সেই ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে কেউ কেউ বোনকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন, নির্যাতন করেন বলেও মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।

দীপ্তি শিকদার বলেন, এ পরিস্থিতি বদলাতে উত্তরাধিকার আইনে সমতা প্রতিষ্ঠা, পরিবারে ছেলেমেয়েকে সম–অধিকার দিয়ে বড় করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি জরুরি।

তবে ৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর কাছে বিষয়টি শুধু একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে বিরোধ নয়। ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও নিজের অধিকারের প্রশ্নটিই সামনে রাখতে চান তিনি। তাঁর কাছে লড়াইটা শুধু উত্তরার একটি ফ্ল্যাটের জন্য নয়; আপনজনের কাছেও একজন নারীর নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে—সেই কথাটিই বলতে চান তিনি।

আরও পড়ুন