ভোটের আমেজ না থাকা নিয়ে প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

সুজনের নাগরিক সংলাপে আলোচকেরা। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর ২৯ দিন। অথচ এখনো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বা আমেজ তৈরি হয়নি বলেই আলোচনা উঠল এক সংলাপে। নাগরিক সংগঠন সুজনের এই আলোচনায় আলোচকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে, বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং পলাতক আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায়। প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে আলোচকদের মধ্য থেকে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বিভাগীয় সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এখন কোনো মবের ঘটনা ঘটলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে থেকে ‘তামাশা’ দেখে। গণ–অভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৭১৩ জন এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। ফলে আগামী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে নারীদের আসন নিয়ে আলোচনা হলো। ৫ শতাংশ মনোনয়ন কেন নারীরা পেল না, এই প্রশ্ন কেউ করেনি। তাহলে কোথায়, কোন সংস্কার করলাম?’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, ‘নির্বাচনের ২৯ দিন বাকি আছে মাত্র। আমি নিজে একজন প্রার্থী। নির্বাচনী আমেজ যেটা বলা যায়, সেটা কিন্তু এখনো তৈরি হয়নি। আমরা জনসংযোগ ইত্যাদি করছি। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে জনগণ আশ্বস্ত বলে আমাদের কাছে মনে হয় না। কারণ, জনগণ এখনো প্রশ্ন করে যে নির্বাচন আসলেই হবে কি না।’

আরও পড়ুন

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তুষার বলেন, প্রশাসন কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাবানদের দিকে হেলে আছে।

এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘যৌথ অভিযান অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, এগুলো আগে আমিও বলতাম। কিন্তু এখন আমার ভয় লাগে কেন জানেন? কারণ, ভয় লাগে যে পাওয়ারপুল লোকজন একটি লিস্ট ধরিয়ে দেয় প্রশাসনের কাছে। সে লিস্টে থাকে অনেক মানুষ, যারা হয়তো আগে বিভিন্ন দল করত, এখন চুপচাপ আছে। প্রশাসন সেই নিরীহ মানুষদের গ্রেপ্তার করে, আর যারা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, সন্ত্রাসী, তারা কিন্তু বিভিন্ন দলের শেল্টারে ইতিমধ্যে চলে এসেছে...এবং এইটা কিন্তু আরও একটা ইমব্যালেন্স এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, রাকসুর সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, ছাত্ররাজনীতি ধ্বংস করেছেন রাজনীতিবিদেরা। তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ছাত্রদের অপব্যবহার করছেন।

সুজনের ‘গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির আগে কাঠামোগত কারণে যাঁরা পিছিয়ে আছেন তাঁদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এ জন্য আদিবাসীদের উন্নয়নে একটি কমিশন গঠনের পক্ষে মত দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি বলেন, ‘কিন্তু শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এর জন্য কতগুলো সংস্কার দরকার, যাতে নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর হয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে দেশে নেতা তৈরি হয়।’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকার ওপরও জোর দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে দেশে কর্মক্ষম ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। বন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও দলগুলোর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা দরকার বলে মনে করি।’

আরও পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অপতথ্য মোকাবেলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘অপতথ্য নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, যেমনটা হয়েছিল যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিটের সময়। কিন্তু অপতথ্য চিহ্নিত করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে কোনো উদ্যোগ দেখছি না। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা।’

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো মব সন্ত্রাস। সরকারের নীরবতা ও দুর্বলতার কারণে মব সংস্কৃতির অবসান ঘটছে না। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্য সমস্যাগুলো হলো কালোটাকার ব্যবহার, প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই না করা। এ জন্য নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি থাকা দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্য ও ভুল তথ্য রোধে ফ্যাক্টচেকিং সেল তৈরি করা দরকার।

সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার নিয়েই গণভোট হবে। সেগুলোর ব্যাপারে আপনারা জেনেবুঝে হ্যাঁ এবং না–এর পক্ষে অবস্থান নেবেন। হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়া মানেই সংস্কার হওয়া। না জয়যুক্ত হওয়া মানেই সংস্কার না হওয়া। সংস্কার না হলে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারি। সংস্কার না হলে যে সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসবে, তাদেরও স্বৈরাচারী হওয়ার আশঙ্কা একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।’

আরও পড়ুন

জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কারের বিষয় তুলে ধরে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল তিনটা। একটা হলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে সংস্কার ও বিচার। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কী কী করণীয়, সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি যে নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় হতে হবে। টাকার খেলা বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনী এবং রাজনৈতিক অন্ধকারের দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসতে হবে। তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই গণতান্ত্রিক উত্তরণ হবে, তা নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার করতে হবে, যেগুলো জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত এবং স্বাক্ষরিত আছে।’

সংলাপে রাজনীতিবিদদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, গণ অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়ামূল বশির, বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার, গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান প্রমুখ।