জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের প্রতি সুবিচার হয়নি

এম শামসুল আলমফাইল ছবি: প্রথম আলো

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনগণের প্রতি সুবিচার হলো না। যে ধরনের ক্রিয়া–প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার এই খাত অপারেট করেছে, এটা তারই ধারাবাহিকতা। গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে যেসব বিচার–বিশ্লেষণগুলো বিবেচনায় আনা দরকার ছিল, সেটাতে ব্যর্থ হলো সরকার। এ সিদ্ধান্তে এটাই বোঝা যায়। কারণ, যুদ্ধবিরতির পর (মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের) যেখানে তেলের দাম ১২০ ডলার থেকে ধীর ধীরে ৯০ ডলারে নেমে এসেছে, তখন এইভাবে মূল্য বৃদ্ধি করেছে সরকার।

জ্বালানি তেলের মজুদ আছে, সরকার বললেও এর সুফল জনগণ পাচ্ছে না। রাস্তায় লাইন দিয়ে এই তাপপ্রবাহে মানুষ পুড়ছে, সেখানে এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধি করে সরকার জনগণের জন্য কী কল্যাণ করতে চায়, সেই বার্তাটা তো প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

সরকার যা–ই করুক, সেটা জনগণের কল্যাণের জন্য করে, সেই মেসেজটা তো মানুষকে পেতে হবে। এটা দিয়ে কী কল্যাণ হলো? এটা তো সরকারকে নিজে বুঝতে হবে এবং সেটাকে জনগণকেও বোঝাতে হবে। দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্তে আমি অন্তত কোনো কল্যাণ দেখি না।

জ্বালানি তেলের জন্য রাতভর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সড়কেই কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়েন এই ব্যক্তি। ঢাকার মিরপুরের সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে আজ শনিবার ভোরে
ছবি: ড্রিঞ্জা চাম্বুগং

আমি যে কথাটা বারবার বলে আসছি যে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ গণবান্ধব হবে এবং জনগণের কল্যাণই হবে মুখ্য। জ্বালানি খাতে জনগণ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে, নিগৃহীত হয়েছে, লুণ্ঠিত হয়েছে, নিপীড়িত হয়েছে।

আমরা হচ্ছি সেই জাতি, যার ৮০ শতাংশই হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। আমাদের সেবা বেসরকারি খাতে দিয়ে, লোকজন দিয়ে সেবা তৈরি করে সেই সেবা ভোগ করার মতো বিলাসী বা আয়েশি জীবন যাপন করার মতো আর্থিকভাবে সক্ষম আমরা নই।

ডিজেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে কৃষকদের অপেক্ষা। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে গত শুক্রবার
ছবি: দীপু মালাকার
আরও পড়ুন

এ রকম সংকটের মধ্যে সরকারের কথায়, সরকারের আচরণে, কার্যক্রমে মানুষ ব্যথা, কষ্ট ও দুশ্চিন্তার উপশম দেখবে, আশায় বুক বাঁধবে, কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিয়ে সরকার হাজির হবে—এটা তো জনগণের প্রত্যাশা ছিল। আমি যদি সরকার হতাম, তাহলে প্রথমেই আমি নাকে খত দিয়ে বলতাম, সরকারের কপালে যে কলঙ্কতিলক মুনাফাখোর হিসেবে, তা আমি মুছে দিতাম। শুধু কস্ট প্রাইসে যতটুকু সরকারের খরচ লাগে, সেটাই নির্ধারিত মূল্যে জনগণের কাছ থেকে আদায় করতাম।

গোটা তেল আমদানিটা, জ্বালানি আমদানিটা, বিদ্যুৎ আমদানিটা আমরা বেসরকারি খাতে তো দিয়েছি, পাশাপাশি আমদানিনির্ভর করে ফেলেছি। আমার তেল, আমার গ্যাস—আমি রপ্তানি ঠেকিয়েছি জীবন দিয়ে। আজকে সেগুলো বাদ দিয়ে আমি এখন আমদানি করার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ব্যবসা তৈরি করে দিয়েছি দেশে-বিদেশে। তারা ভয়ংকর রকমের মুনাফা করছে এবং এগুলো করতে গিয়ে এত ব্যয়বৃদ্ধি হয়েছে যে আমার এখন পয়সাই নেই সেগুলো আমদানি করে ব্যবহার করার। আমি এখন বঞ্চিত হচ্ছি, আমি এখন ক্ষুধিত, আমি এখন উপবাসে আছি, আমার অর্থনীতি এখন প্রায় তলানিতে। তাহলে সেই জায়গাটায় আমি সরকার হলে সবার আগে যে কাজটা করতাম, মুনাফা থেকে মুক্ত করে দিতাম জাতিকে।

আরও পড়ুন

মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে, সব উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, সব বেড়ে যাবে।

জ্বালানি তেলের জন্য গতকাল শনিবার ঢাকার ভাষানটেকের মাটিকাটা এলাকায় গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

বাজারের ওপরে তো সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে দামে কি এলপিজি পায় মানুষ? পাচ্ছে না। রেগুলেটরি কমিশনের দায়িত্ব নির্ধারিত দাম এনফোর্স করা। সেটা মানাতে পারল না, পারছে না। তার জন্য ফৌজদারি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা, তাদের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার কথা—কিচ্ছু করতে পারেনি। কোনো কিছু করার দায় নেই।

রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো—বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর, বিপিসি, পেট্রোবাংলা—সবাই নিষ্ক্রিয়, সবাই অচল। এগুলো অচল হলে সরকার কি আর সচল থাকতে পারে? এগুলোই তো সরকারের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এইভাবে এই রকম অবস্থার মধ্য দিয়ে যে অর্থনীতি আমরা দেখতে পাই, সে অর্থনীতিকে কি আর সচল বলা যায়? তা দিয়ে কি এই ৯ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট হয়? তা দিয়ে কি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৮ রাখা যায়?

আরও পড়ুন

মূল্যবৃদ্ধি সেখানে কী ভয়ংকর পরিণতি আনতে পারে এ পরিস্থিতিতে, সেটা বোঝার ক্ষমতা যদি দেশের অর্থনীতিবিদদের না থাকে, তাহলে আমি–আপনি এ কথা বলে লাভ নেই। সরকারের যদি বোঝার মানসিকতা না থাকে, তাহলে আমার–আপনার বোঝায়, বলায় কিছু যায়–আসে না। রাজনীতিবিদেরা যদি সক্রিয় না হন, নিষ্ক্রিয় থাকেন, তাঁরা যদি এ সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা, দুর্যোগ হিসেবে না মনে করেন, তাহলে এ দেশের দেউলিয়া হতে আর বাকি নেই।

  • অধ্যাপক এম শামসুল আলম: জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)