প্রতিবেদনে কেজিডিসিএলের এমডি এম এ মাজেদসহ বেশ কয়েক কর্মকর্তাকে দায়ী করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের সরানো হচ্ছে, এমন কথা অফিস আদেশে লেখা হয়নি।

কেজিডিসিএল পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। চট্টগ্রাম নগর ও ১১টি উপজেলায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে কোম্পানিটি। এসব এলাকায় মোট গ্রাহক-সংযোগ রয়েছে ৬ লাখ ১ হাজার ৯১৪টি।

কেজিডিসিএল পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। চট্টগ্রাম নগর ও ১১টি উপজেলায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে কোম্পানিটি। এসব এলাকায় মোট গ্রাহক-সংযোগ রয়েছে ৬ লাখ ১ হাজার ৯১৪টি। এর মধ্যে গৃহস্থালি সংযোগ আছে ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১টি, বাকিগুলো শিল্প-বাণিজ্যসহ অন্য খাতে।

অনিয়ম কত ধরনের

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিতে পূর্ণাঙ্গ পদমর্যাদার মহাব্যবস্থাপক নেই। তবে যোগ্যতাসম্পন্ন বেশ কয়েক কারিগরি উপমহাব্যবস্থাপক কর্মরত আছেন। কিন্তু তাঁদের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষের পছন্দনীয় আদেশ ও নির্দেশ পালনের জন্য কর্মকর্তা আমিনুর রহমানকে তিনটি দায়িত্ব এবং শফিউল আজমকে দুটি অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ রকম একাধিক পদের দায়িত্ব দেওয়ায় দুর্নীতির পথ সুগম হয়েছে।

অন্যদিকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। আবার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে কনিষ্ঠদের পদোন্নতি দেওয়ার সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কারিগরি ক্যাডারের উপব্যবস্থাপক পদের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ নিয়োগ কমিটির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও সহকারী ব্যবস্থাপক পর্যায়ের ১৩ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় এমডি এম এ মাজেদ ও সচিব ফিরোজ খান দায়ী।

২০১৬ সালে কেজিডিসিএলের একটি প্রকল্পের জন্য সহকারী হিসাব কর্মকর্তার ১৫টি অস্থায়ী পদে মেধাতালিকা প্রকাশ করে নিয়োগ কমিটি। এই ১৫ জনের মধ্যে ৭ জন চাকরিতে যোগ দেননি। তাই বাকি ৭ শূন্য পদে নিয়োগের জন্য তৎকালীন ব্যবস্থাপক (পারসোনেল) মো. হাবিবুল গণির কাছে পাঠানো হয়। তিনি নিজেই সাতটি পদের বিপরীতে ছয়জনকে নিয়োগের সুপারিশ করেন। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে। এই অনিয়মের জন্য হাবিবুল গণি, কোম্পানি সচিব ফিরোজ খানসহ আরও দুই কর্মকর্তাকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি।

কেজিডিসিএল দুর্নীতির খনিতে পরিণত হয়েছে। কোম্পানিটিরই দুর্নীতির ফিরিস্তি লিখতে গেলে পত্রিকায় জায়গা পাওয়া যাবে না
—আখতার কবির চৌধুরী, সভাপতি, টিআইবি-সনাক

৩১ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বকেয়া গ্যাস বিল আদায় না করে এবং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে নতুন সংযোগ ও পুনঃসংযোগ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনায় এম এ মাজেদ, মহাব্যবস্থাপক মো. আমিনুর রহমান, শফিউল আজম খানসহ আরও কয়েক কর্মকর্তা দায়ী।

সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন ফিরোজ খান

ফিরোজ খান পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ছিলেন। ২০১৫ সালের দিকে তাঁকে কেজিডিসিএলে পাঠানো হয়। তিনি সর্বশেষ কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ সাত বছর প্রেষণে কর্মরত থেকে ফিরোজ খান নিয়মবহির্ভূত ও ইচ্ছামাফিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তিনি নিজে ওই সিন্ডিকেটের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিনা অজুহাতে বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছেন। কর্মকর্তাদের হয়রানি করেছেন।

কোম্পানির বিভিন্ন বিভাগের দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত মিটার পরীক্ষণ কমিটি বাতিল করেছেন। উল্টো মার্কেটিং বিভাগের চিহ্নিত অসাধু কর্মকর্তাদের দিয়ে ওই কমিটি পুনর্গঠন করেছেন। এসব কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ওই তদন্ত কমিটি।

সরানো হলো যাঁদের

অনিয়মের অভিযোগে দায়ী করা হয়েছে কেজিডিসিএলের এমডি এম এ মাজেদ, কোম্পানি সচিব ফিরোজ খান, মহাব্যবস্থাপক শফিউল আজম খান, মহাব্যবস্থাপক আমিনুর রহমানসহ আরও বেশ কয়েক কর্মকর্তাকে।

২৩ নভেম্বর কোম্পানি সচিব ফিরোজ খানকে সেখান থেকে সরিয়ে সিরাজগঞ্জে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আর ১৯ নভেম্বর পেট্রোবাংলায় পাঠানো হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এ মাজেদকে।

এম এ মাজেদকে কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয় গত বছরের মে মাসে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এখন তাঁর জায়গায় কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয় রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) প্রেষণে কর্মরত ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলামকে।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। বিধি অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিভাগীয় মামলা করার প্রক্রিয়াও চলমান।

যা বললেন, যা বললেন না

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত দুই মাসে ১০ বার এম এ মাজেদের কক্ষে গেলে তিনি কথা বলেননি। ফিরোজ খানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে ফিরোজ খানও প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। নিয়োগ অনিয়মে নাম আসা কর্মকর্তা মো. হাবিবুল গণি বলেন, নিয়োগের বিষয়টি ছয় থেকে সাত বছর আগের। তাই তিনি সব ভুলে গেছেন।

শফিউল আজমের দাবি, তাঁরা সব নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন লিখেছে। তাঁরাও সব জবাব দিয়েছেন।

ব্যবস্থাপক বাসুদেব বিশ্বাস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে মহাব্যবস্থাপক (বিপণন-দক্ষিণ) মো. আমিনুর রহমান বলেন, একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে কোম্পানির গতিকে ব্যাহত করার জন্য এসব অভিযোগ তুলেছেন। তাঁরা সব নিয়ম মেনেই গ্যাস-সংযোগ প্রদানের কাজ করেছেন।

কর্ণফুলী গ্যাসের এসব অনিয়ম অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের সৎ ও কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত করানো উচিত বলে মনে করেন টিআইবি-সনাক (সচেতন নাগরিক কমিটি) সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কেজিডিসিএল দুর্নীতির খনিতে পরিণত হয়েছে। কোম্পানিটির দুর্নীতির ফিরিস্তি লিখতে গেলে পত্রিকায় জায়গা পাওয়া যাবে না। আর এসব অনিয়মের পেছনে আর্থিক লাভের বিষয় জড়িত। তাই তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা উচিত।