পানি নামার পাঁচ দিন পরও স্বাভাবিক হয়নি বান্দরবান

বিভিন্ন সড়ক ও ভবনে বন্যার পানির সঙ্গে আসা পলি এখনো পরিষ্কার করা যায়নি। স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। গতকাল বিকেল পাঁচটায় বান্দরবান শহরের ক্যাচিংঘাটা নতুনপাড়া এলাকায়
ছবি: মংহাইসিং মারমা

পানি নেমে যাওয়ার পাঁচ দিন পরও পার্বত্য জেলা বান্দরবানের জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি। সর্বত্রই যেন বন্যার ক্ষত ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। শহরের প্রধান বাজারও কাদায় সয়লাব। সেখানে অল্প কিছু বিক্রেতা বসলেও পণ্যের সরবরাহ কম। বিভিন্ন সড়ক ও ভবনে বন্যার পানির সঙ্গে আসা পলি এখনো পরিষ্কার করা যায়নি। স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ।

পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বনানী স মিল এলাকায় প্রায় দেড় শ পরিবারের বসবাস। ৬ আগস্ট রাত থেকে এখানে বিদ্যুৎ নেই। গত বৃহস্পতিবার পানি নামার পর অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ এলেও স মিল এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি। গত ৯ দিন বিদ্যুৎ না আসায় পানিও পাচ্ছেন না এখানকার বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী নুরুল কবির বলেন, তাঁরা খাওয়ার পানি হিসেবে পৌরসভার সরবরাহের পানি ব্যবহার করেন। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে সাঙ্গু নদ থেকে বাড়ির ট্যাংকে পানি তুলে গৃহস্থালির কাজ সারেন। বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো পানিই পাচ্ছেন না। দূর থেকে পানি আনতে হচ্ছে। খরচ হচ্ছে বাড়তি গাড়িভাড়াও।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন বলেন, ‘শহরে ৯০ ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ এসেছে। রোয়াংছড়িতেও বিদ্যুৎ চালু করা গেছে আজ (মঙ্গলবার)। কিন্তু থানচি ও রুমায় সড়ক মেরামত না হলে বিদ্যুৎ চালু করা কঠিন। সদরে দুই দিনের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ দেওয়ার আশা করছি।’

‘শহরে ৯০ ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ এসেছে। রোয়াংছড়িতেও বিদ্যুৎ চালু করা গেছে আজ (মঙ্গলবার)। কিন্তু থানচি ও রুমায় সড়ক মেরামত না হলে বিদ্যুৎ চালু করা কঠিন। সদরে দুই দিনের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ দেওয়ার আশা করছি।’
সৈয়দ আমির হোসেন, বিদ্যুৎ নির্বাহী প্রকৌশলী, উন্নয়ন বোর্ড

শহরের বিভিন্ন সড়কে এখনো রয়ে গেছে কাদামাটি। অভ্যন্তরীণ বেশির ভাগ সড়ক বেহাল। কোনো কোনো এলাকায় কাদার জন্য রিকশাও চলাচল করতে পারছে না। ডুবে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি–বেসরকারি দপ্তরগুলোতে পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর ফেলে লোকজন এখনো আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বজনদের বাড়িতে দিন কাটাচ্ছেন।

বান্দরবানে ৬ আগস্ট অতিবৃষ্টি শুরু হয়। ৭ আগস্ট থেকে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে পানি উঠে জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া বন্যায় ধসে গিয়ে রুমা ও থানচির সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সদরের ডিসি, এসপির কার্যালয়সহ বেশির ভাগ সরকারি–বেসরকারি কার্যালয়ে পানি ঢুকে পড়ে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভিজে যাওয়া কিছু নথি কার্যালয়ের সিঁড়ির পাশে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। কার্যালয়টির কর্মী সাগর দে জানান, বন্যায় দপ্তরটির নিচতলা ডুবে গিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ভিজে যায়। সেগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি পরিশোধন কেন্দ্র পানিতে ডুবে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পানি সরবরাহব্যবস্থা। গতকাল পর্যন্ত এক কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরিশোধনাগার উৎপাদন করেছে ৩০ লাখ লিটার। পরিশোধনাগারের সব ইউনিট চালু হলে স্বাভাবিক অবস্থায় ৫০ লাখ লিটার পানি পরিশোধন করে শহরে সরবরাহ করতে পারে সংস্থাটি। সংকট সামাল দিতে দুটি ভ্রাম্যমাণ পানি শোধনাগারও শহরে আনা হয়েছে।

বান্দরবানে ৬ আগস্ট অতিবৃষ্টি শুরু হয়। ৭ আগস্ট থেকে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে পানি উঠে জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া বন্যায় ধসে গিয়ে রুমা ও থানচির সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে গতকালও সদরের বান্দরবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাপীড়িত প্রায় দুই শ মানুষ ছিলেন। উজানীপাড়া ও মধ্যমপাড়ার ভেসে যাওয়া বাড়িঘর বাসিন্দাদের মেরামত ও পরিচ্ছন্ন করতে দেখা গেছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, সদরে ৪১টি স্কুলে পানি ঢুকেছে। জেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মোট ক্ষতি প্রায় ২০ লাখ টাকা।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়াউল ইসলাম মজুমদার বলেছেন, তাঁদের ৯০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২০০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ সড়কে এখনো যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা যায়নি।

আরও পড়ুন