অদম্য সাহসের প্রতীক ইলা মিত্র
সংগ্রামী ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর ডেইলি স্টার ‘শতবর্ষে স্মরণ: ইলা মিত্র ও তেভাগা আন্দোলন’ শীর্ষক একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। ইলা মিত্রের সঙ্গে মতিউর রহমানের পরিচয় ছিল। অনেকবার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। কথা বলেছেন নানা বিষয় নিয়ে। বক্তৃতায় তিনি সেই ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আলাপচারিতার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি ইলা মিত্রের জীবন, রাজনীতি, তেভাগা আন্দোলন নিয়ে নানা তথ্য দিয়েছেন। পাঠকদের জন্য বক্তৃতাটি প্রকাশ করা হলো।
আমার যত দূর মনে পড়ে, তখন ছিল ১৯৫৮ সাল, আমরা বংশালে থাকি। আমি তখন কিশোর। আমাদের বাড়ির পরিবেশ বামপন্থী রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তাই বাম ধারার কিছু বই–ম্যাগাজিন কেনা হতো। এর মধ্যে একটি বই ছিল ‘জেলখানার চিঠি’। এখনো মনে পড়ে বইটির দুইরঙা সেই প্রচ্ছদ ও হালকা রঙের ছবি। প্রচ্ছদপট ছিল—খাঁচা থেকে বেরিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে…। কবিতাগুলো পড়েছিলাম সেই কৈশোরে। প্রথম কবিতাটি ছিল ব্রিটিশ গায়ানার কবি ও রাজনৈতিক কর্মী মার্টিন কার্টারের (১৯২৭–১৯৯৭)। কবিতাটির কয়েকটি লাইন ছিল এমন:
‘ওরা শুধু আমার এইটুকুই করেছে—
জেলে পুরেছে, লুকিয়ে ফেলেছে,
সূর্য থেকে, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে,
আকাশকে অন্ধকার, বাতাসকে বিষময়—
আর আমার নিঃশ্বাসকে রুদ্ধ করে দিয়েছে—
এই আশায় যে,
আমি মরে যাব।
কিন্তু হায়
আমি হাসি ওদের আয়োজনে—
হাসি—
কারণ, আমি জানি ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে না,
না পারে স্তব্ধ করে দিতে আমার চিন্তাকে—
না পারে মুছে ফেলতে আমার লেখনকে—
আমি মানুষ—
আমি আছি মানুষেরই মাঝখানে।’
কবিতার বইটি আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনেক খুঁজে বইটির মলাটবিহীন একটি কপি পাওয়া গেল প্রথম আলোর লাইব্রেরিতে। এ বইয়ের আরও দুটি কবিতার কথা মনে পড়ে—একটি সেই সময় জেলে বন্দী তুর্কি কবি নাজিম হিকমতকে নিয়ে লেখা মার্কিন লেখক হাওয়ার্ড ফাস্টের কবিতা, অন্যটি ‘স্পার্টাকাস’ উপন্যাসের লেখক জেলবন্দী সেই হাওয়ার্ড ফাস্টকে নিয়ে পাবলো নেরুদার লেখা। পরে ষাটের দশকে আমি হাওয়ার্ড ফাস্টের নাটক–উপন্যাস পড়েছিলাম।
ছয়টি কবিতা নিয়ে ‘জেলখানার চিঠি’ বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা ৪৪। ১৯৫৫ সালে কলকাতার শ্যামচরণ দে স্ট্রিটের নবভারতী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশক সুনীল দাশগুপ্ত। পাকিস্তানে বইটির প্রাপ্তিস্থান ছিল বইঘর, ফিরিঙ্গি বাজার রোড, চট্টগ্রাম। দাম এক টাকা আট আনা। বইটির অনুবাদক ছিলেন আমাদের আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কমরেড ইলা মিত্র।
আমরা জানি, ১৯৫৪ সালে বন্দী অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কলকাতা চলে যান। এই বই বের হয় ১৯৫৫ সালে। ‘হিরোশিমার মেয়ে’সহ মোট সাতটি বই অনুবাদ করেছেন ইলা মিত্র।
ইলা মিত্র, আমাদের ইলাদি মারা গেছেন ২০০২ সালে। তাঁর বাড়ি যশোরে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতায় থেকেছেন। বেথুন স্কুল আর কলেজে পড়েছেন। বিএ পাস করেন সেখান থেকে। অনেক বছর পরে ১৯৫৭ সালে কলকাতায় প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে বাংলায় এমএ পাস করেছেন। তাঁর স্বামী রমেন মিত্র মারা যান ২০০৫ সালে। ১৯৪৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। কী আশ্চর্য, একমাত্র সন্তানের জন্মের জন্য ১৯৪৮ সালের মার্চে গোপনে কলকাতায় এসেছিলেন ইলা মিত্র! জন্মের ১৬ দিন পর থেকে তিনি তাঁর সন্তানকে সেভাবে দেখার সুযোগ পাননি। পরে সেই সন্তানকে ইলা মিত্রের শাশুড়ি রামচণ্ডপুর গ্রামে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে মাঝেমধ্যে গোপনে গিয়ে ছেলেকে দেখে আসতেন তিনি। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি যখন কলকাতায় ফিরে যান, তখন তাঁর একমাত্র সন্তানকে আবারও বুকে ফিরে পান।
ইলা মিত্রের পুত্রের নাম রণেন মিত্র। ডাকনাম মোহন। মোহন বিয়ে করেছে কবি রাম বসুর (১৯২৫–২০০৭) মেয়ে সুকন্যা মিত্রকে। রাম বসু ছিলেন বামপন্থী প্রগতিশীল কবি। রণেন আর সুকন্যার একমাত্র সন্তান ঋতেন মিত্র। নব্বইয়ের দশকে যখন আমরা কলকাতায় তাঁদের বাড়িতে গিয়েছি, তখন ঋতেনকে দেখতাম রমেন মিত্রর কোলে বসে আছে। রমেনদা তাকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা। ভুল না হলে, ২০১০ সালে আমি ঋতেনের বিয়েতে কলকাতা গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ থেকে অনেককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। একমাত্র আমিই উপস্থিত ছিলাম ওই বিয়েতে। সর্বশেষ জানলাম, সেই ঋতেন মিত্র (রমেন মিত্র আর ইলা মিত্রের পৌত্র) যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর স্ত্রী নীহারিকা মিত্র সেখানেই থাকে এখন। এটা জানার পর থেকে ইলা মিত্রের সন্তান মোহনকে বারবার ফোন করি। ফোন ধরে না। শুনেছি সে অসুস্থ। তার স্ত্রী সুকন্যাও অসুস্থ। তাহলে তাঁদের পরিবারে আর কেউ থাকবে না? এই জীবন কেমন!
ইলা মিত্র কৈশোর বয়স থেকে ক্রীড়া মাঠে সক্রিয় ছিলেন। তিনি মূলত অ্যাথলেটিকসে নৈপুণ্য দেখালেও সাঁতারসহ অন্যান্য খেলাতেও সমান পারদর্শী ছিলেন। ‘দেশ’ পত্রিকা থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৪০ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে অংশ নিতে ভারতের পক্ষ থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তাঁর আর যাওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই অলিম্পিকই অনুষ্ঠিত হয়নি।
আমাদের দুজনের মধ্যে প্রথমে মালেকার সঙ্গে ইলা মিত্রের পরিচয় হয়েছিল, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়, কলকাতায়। আমার সঙ্গে পরিচয় ১৯৭২ সালে, কলকাতায়। তবে রমেন মিত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল একাত্তরে আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের ক্যাম্পে। তারপরে কলকাতায়। মালেকার সঙ্গে দেখা হলে তাঁকে রমেনদা বলতেন, ‘এই মালেকা, তুই তো হলি ছিঁড়া–মতি।’ মানে শ্রীমতী মালেকা মতি থেকে বিচ্ছিন্ন, তুই ছিঁড়া–মতি। তারপর বাহাত্তর সালে প্রথম কলকাতা গেলে রমেনদা আর ইলাদির সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
তারপর পুনরায় আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় ১৯৮৬ সালে। পরিচয় গভীর হতে থাকে। ১৯৮৬ সাল থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত বহুবার আমাদের দেখা হয়েছে। কত আলোচনা, কত গল্প হয়েছে অতীত নিয়ে! তিনি আমাকে কতজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন! তবে আমি ইলাদিকে একটু ভয় পেতাম। সহজ হতে পারতাম না। সেই তুলনায় রমেন মিত্রের প্রতি আমার আকর্ষণ বেশি ছিল। অতীতে রাজনীতি, আন্দোলন, দেশ–বিদেশের অভিজ্ঞতা, নানা মানুষ–ব্যক্তি, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিদের নিয়ে তিনি অনেক কথা বলতেন। দুটি বই তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বলা যায়, আমি তাঁর কাছ থেকে চেয়েই নিয়েছিলাম ফরাসি দুই কবি পল এলুয়ার ও লুই অরাগঁর নির্বাচিত কবিতার বই। ইলাদি কবি অরুণ মিত্র ও গোলাম কুদ্দুসের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডের কয়েকজন বন্দী কমরেডের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়েছিল ইলাদির সাহায্যে।
ইলা মিত্রের এক ভাই নৃপেন সেন ডাক্তার ছিলেন। আমার আগ্রহের কথা শুনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রখ্যাত লেখক ইলিয়া এরেনবুর্গের চার খণ্ডে আত্মজীবনী মেন, ইয়ারস, লাইফ–এর প্রথম দুই খণ্ড আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সেই সময় থেকে তাঁদের সিআইটি রোডের বাসাটা হয়ে উঠেছিল আমাদের কলকাতায় প্রধান আকর্ষণ। তখন আরেকটি আকর্ষণ ছিল ইলাদির বাসার খুব কাছের লেনিন স্কুল। সেই স্কুলের প্রায় পরিত্যক্ত একটি ঘরে থাকতেন রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি আমার জীবনের বড় এক শিক্ষক। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমৃত্যু কত কিছু যে তিনি আমাকে শুনিয়েছেন, শিখিয়েছেন। কলকাতার সেই দুই জায়গার প্রতি ছিল আমার বিশেষ আগ্রহ।
মনে পড়ে, ১৯৯৯ সালে রণেশদার মরদেহ নিয়ে ইলা মিত্র শেষবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন। সেবারই শেষ দেখা ইলাদির সঙ্গে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ইলাদি এসেছিলেন চার–পাঁচবার, কিন্তু রমেন মিত্র একবারও আসেননি। ১৯৭২ সালে ইলাদি প্রথম এসেছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে। দ্বিতীয়বার আসেন ১৯৭৪ সালে শিক্ষকদের সম্মেলনে অংশ নিতে। সেই দুবারই তিনি বিশেষভাবে দেখা করেছিলেন ডাক্তার কে এস আলমের সঙ্গে। ১৯৫৪ সালে প্যারোলে মুক্তির পর ইলা মিত্রকে তিনি ঢাকা থেকে বিমানযোগে কলকাতায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছিলেন। দুবারই তিনি দেখা করেছিলেন একসময় তাঁর সঙ্গে জেলে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। ১৯৯৬ সালেও তিনি এসেছিলেন নাচোল বিদ্রোহের ৫০ বছর উদ্যাপন উপলক্ষে।
১৯৪৬ সালে কলকাতার পর নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হলে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ১২–১৪ জন কমিউনিস্ট নারী কর্মীর সঙ্গে ইলা মিত্র চলে যান নোয়াখালীর হাসনাবাদে, সেখানে তিনি ত্রাণকার্য পরিচালনা করেছিলেন।
দুই.
ইলা মিত্র বিয়ের আগে ইলা সেন নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন রাজনীতিতে সক্রিয়। ছাত্র ফেডারেশন ও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কাজ করছেন। ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে বিয়ের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুরের অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান কমিউনিস্ট কর্মী রমেন মিত্রের সঙ্গে গ্রামে চলে যান। ১৯৪৬ সালে কলকাতার পর নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হলে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ১২–১৪ জন কমিউনিস্ট নারী কর্মীর সঙ্গে ইলা মিত্র চলে যান নোয়াখালীর হাসনাবাদে, সেখানে তিনি ত্রাণকার্য পরিচালনা করেছিলেন। নোয়াখালীতে ৯ মাস তাঁরা ছিলেন। ইলা মিত্র ছাড়াও সেখানে বিশিষ্ট মহিলা নেত্রী মনোরমা বসু, লীলা নাগ, আশালতা সেনসহ আরও অনেকেই ছিলেন।
রামচন্দ্রপুরে ইলা মিত্রের জীবন সহজ ছিল না। শুরুতে পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে বাড়ির ভেতরে তাঁকে প্রায় বন্দী অবস্থায় থাকতে হয়েছে। ধীরে ধীরে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে তাঁকে রমেন মিত্রের যোগ্য সহকর্মী হয়ে উঠতে হবে। ছোট স্কুল করে বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করেন। তারপর সাঁওতাল ও অন্যান্য কৃষকের মধ্যে কাজ শুরু করেন।
এভাবেই ধীরে ধীরে অন্দরমহল থেকে বের হয়ে ইলা মিত্র সাধারণ কৃষকদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। পাশে ছিলেন রমেন মিত্র—কৃষক সমিতির সম্পাদক, নেতা। ওই অঞ্চলজুড়ে বহু আগে থেকেই সাঁওতাল কৃষকদের আন্দোলন চলছিল এবং তারও ১০০ বছর আগে থেকে ওই অঞ্চলে সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা জানা যায়। সেসব থেকেও ইলা মিত্র শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত দুই রাষ্ট্র হয়ে গেলেও রমেন মিত্র ও ইলা মিত্র এ দেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্দোলন–সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্যই তাঁরা পূর্ববঙ্গে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে রামচন্দ্রপুরে এক বড় সমাবেশ হয়েছিল, সেখানে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন রমেন মিত্র।
তিন.
পাকিস্তান হওয়ার পরও কৃষকসমাজের অধিকারের লড়াই থামেনি। নানা শ্রেণি–পেশার মানুষও তাদের বিভিন্ন দাবিতে লড়াইয়ে যুক্ত ছিল। পাকিস্তানের শুরুতে কমিউনিস্টদের সিদ্ধান্ত ছিল নবীন রাষ্ট্রে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার নীতিতে চলবে। সরকার মেহনতি মানুষের সপক্ষে যে পদক্ষেপ নেবে, কমিউনিস্টরা সেগুলোতে সহায়তা করবে।
ঢাকায় ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যে বড় সমাবেশ হয়েছিল, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে বক্তৃতা করেছিলেন কংগ্রেস নেত্রী লীলা নাগ আর কমিউনিস্ট নেতা নেপাল নাগ। ১৯৪৭ সালের শেষে কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের জঙ্গি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। নতুন সরকারকে একটা সুযোগ দেওয়া দরকার মনে করেছিল তখনকার কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্ব। সে সময় একটা পুস্তিকা বের করা হয়েছিল—‘সুখী পাকিস্তান গড়ে তুলুন’। কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আক্রমণের নীতি অব্যাহত রাখে। বহু রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিলেও কমিউনিস্ট বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়নি।
১৯৪৭ সালের ৬ মার্চ কলকাতায় পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল। কলকাতায় সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস শেষে সাজ্জাদ জহিরকে সাধারণ সম্পাদক করে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। তবে পূর্ববঙ্গের জন্য আলাদা কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়, যার সম্পাদক ছিলেন খোকা রায়। সেই কমিটির সদস্য ছিলেন মণি সিংহসহ আরও অনেকে।
ভারতের সেই কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা ছিল ভুয়া অর্থাৎ মিথ্যা। এতে সাধারণ মেহনতি মানুষের কোনো মঙ্গল হবে না। বুর্জোয়ারা সব আপসের পথে চলে গেছে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হতে দেরি হচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোপে, বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের অনেকগুলো দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং চীনে বিপ্লব হয়েছে। ভারতে এই দুই বিপ্লব একসঙ্গে করতে হবে। আত্মসমালোচনা করে পার্টি বলেছিল, এত দিন কমিউনিস্ট পার্টি দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদী নীতি অনুসরণ করেছে। এবার সারা দেশে জঙ্গি সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। জঙ্গি সংগ্রাম গড়ে তুলে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে এ অঞ্চলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টিও একই নীতি গ্রহণ করেছিল।
তখন ‘জেল বিপ্লব’ তত্ত্বও ছিল—জেলের ভেতরে প্রতিরোধ করতে হবে। খাপড়া ওয়ার্ডে এই নীতি কার্যকর করতে গিয়ে ৭ জন কমিউনিস্ট নেতা শহীদ হন। এভাবে সারা ভারতে ১১টি ঘটনায় ৮৪ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল।
কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসের ওই সিদ্ধান্তের পর ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে ময়মনসিংহের গারো ও হাজং এলাকায় টঙ্কবিরোধী আন্দোলন, রাজশাহীর নাচোলে তেভাগা আন্দোলন ও সিলেটে নানকারবিরোধী আন্দোলন জঙ্গি রূপ নেয়। সেই জঙ্গি আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এলাকাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বহুসংখ্যক নেতা–কর্মী শহীদ হন। অসংখ্য গ্রেপ্তার হন। কেউ কেউ বলেন, সেই সরকারি দমনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১০০ জন নেতা–কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এত কিছুর পরও পার্টির নেতৃত্ব ‘সশস্ত্র সংঘর্ষ’ এবং ‘গৃহযুদ্ধ’ আর ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’–এর নীতিতে চলতে থাকে। তাদের স্লোগান ছিল—ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।
শুধু কৃষক নয়; ছাত্র, যুবক ও শ্রমিকদের জড়ো করার চেষ্টা করে কমিউনিস্ট পার্টি। কিন্তু তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। শুধু বাইরে নয়, জেলের ভেতরেও অনশন ধর্মঘট চলতে থাকে। বিভিন্ন জেলে মোট ১৫০ দিন অনশন ধর্মঘট হয়েছে। তখন ‘জেল বিপ্লব’ তত্ত্বও ছিল—জেলের ভেতরে প্রতিরোধ করতে হবে। খাপড়া ওয়ার্ডে এই নীতি কার্যকর করতে গিয়ে ৭ জন কমিউনিস্ট নেতা শহীদ হন। এভাবে সারা ভারতে ১১টি ঘটনায় ৮৪ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল। বাইরে থেকে জেলগেট আক্রমণ নীতির ফলে সারা ভারতে ৩ হাজার ৯৮২ জন রাজনৈতিক নেতা–কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তখন পর্যন্ত দুই দেশের পার্টি এক নীতিতেই চলত। (মতিউর রহমান, ‘লাল সালাম: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’, প্রথমা প্রকাশন, ২০২৫, পৃ. ৩৪)
এসবের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি এক কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। পার্টি পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। পার্টির অনেক সদস্য–কর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান। পার্টি ভেঙে যায়। তর্কবিতর্ক চলতে থাকে, সন্দেহ–অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা ১২ হাজার থেকে ৩–৪ শ-তে নেমে আসে। সে সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার, এটাও ২০ হাজারে নেমে আসে। (মতিউর রহমান, ‘লাল সালাম’, ২০২৫, পৃ. ৩৬)
এ রকম এক পরিস্থিতিতে ভারত, পাকিস্তান ও পূর্ববঙ্গের সর্বত্র বামপন্থীদের মধ্যে তর্কবিতর্ক, ঝগড়া–বিবাদের সূত্রপাত হয়। একাধিকবার কমিটি হয়। কমিটি বদল করেও কোনো ফল হয় না। বারবার বৈঠক আর বারবার নেতৃত্বের পরিবর্তন হতে থাকে। মোটকথা, তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির এই সশস্ত্র সংগ্রামের রণনীতি পার্টি তথা বাম রাজনীতির জন্য ভুল ও আত্মঘাতী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এতে দলের শক্তি ক্ষয় হয়েছে, অজস্র নেতা–কর্মী হত্যা ও চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের সম্ভাবনা ত্বরান্বিত হওয়ার পরিবর্তে বরং পিছিয়ে পড়েছে। উভয় দেশের কমিউনিস্ট পার্টিই অবশ্য পরবর্তীকালে গৃহীত এই সশস্ত্র সংগ্রামের পথকে ভুল বলে মূল্যায়ন করে এবং তা থেকে সরে আসে।
১৯৫১ সালে কলকাতায় পূর্ববঙ্গের ৩০ জন নেতার গোপন বৈঠক হয়। সেখানে পার্টির বড় ভুল–বিচ্যুতির কথা স্বীকার করা হয়। নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়। ওই সম্মেলনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এস এ ডাঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলা হয় যে সেই সশস্ত্র লড়াই–সংগ্রামের পথ ভুল ছিল। নতুন করে গণতন্ত্রের জন্য তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে তারা সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ বলেন যে তাঁদের ভুল হয়েছিল সেই সশস্ত্র সংগ্রাম ও প্রতিরোধের নীতি নিয়ে। সিদ্ধান্ত হয় পার্টি গোপনে থেকে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে কাজ করবে। তারা ছাত্রসংগঠন এবং গণসংগঠন গড়ে তুলবে। তারপর গড়ে তুলতে হবে গণ–আন্দোলন। (মতিউর রহমান, ‘লাল সালাম’, ২০২৫, পৃ. ৩৯–৪০)।
এসবের ফলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট পার্টি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হলো। পূর্ব পাকিস্তানে গণতন্ত্রী দল গড়ে উঠল। যুবলীগ আগেই গঠিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পার্টি এগোতে থাকে।
যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের কথা আমরা জানি। যুক্তফ্রন্ট গঠনে কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ ভূমিকা ছিল। তখন কমিউনিস্ট পার্টিকে সেই যুক্তফ্রন্টে গ্রহণ না করলেও তারা পাশে থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা ভাবতে আজ বিস্ময় লাগে যে সেই নির্বাচনে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির নামে বা অন্য কোনো নামে ২৪ জন বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। (মতিউর রহমান, ‘লাল সালাম’, ২০২৫, পৃ. ৬৩)। ১৯৫৪ সালে সেই প্রাদেশিক পরিষদের ভোটে সরদার ফজলুল করিম নির্বাচিত হয়ে পাকিস্তান সংবিধান–সভার সদস্য হয়েছিলেন।
চার.
পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবে ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে এবং ’৫০ সালের শুরু থেকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে কৃষক আন্দোলন জঙ্গি রূপ নিয়েছিল। তার পেছনে কমিউনিস্ট পার্টির সেই উগ্র বামপন্থী হঠকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল।
টঙ্ক আন্দোলনে ময়মনসিংহের গারো অঞ্চল, নানকার প্রথার বিরুদ্ধে সিলেটের বিয়ানীবাজার ও বড়লেখা এবং তেভাগা আন্দোলনে রাজশাহীর নাচোল অঞ্চল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। নাচোলে সাঁওতালরা তির, ধনুক, বল্লম হাতে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে টহল দিতে থাকে। ক্রমশ আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। সেই আন্দোলনে সব সম্প্রদায়ের মানুষই ঐক্যবদ্ধ হয়। যদিও সাঁওতালরাই ছিলেন মূল চালিকা শক্তি।
পুলিশ আর সেনাবাহিনী এসে ১২টি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে চলে যায় মানুষ। অনেকে সীমান্তের ওপারে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কৃষক কর্মীদের ওপরে নেমে আসে চরম নির্যাতন।
এই সব জঙ্গি আন্দোলনের বিরুদ্ধে গ্রামের জোতদাররাও মারমুখী হয়ে ওঠে। পুলিশের অত্যাচার বাড়ে। এতে সংগ্রামী কৃষকদের ক্ষোভ বেড়ে যায়। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি একজন দারোগা আর তিনজন কনস্টেবল নাচোলের কেন্দুয়ায় টহলে যান। কাউকে না পেয়ে যাকে পান তাঁকেই মারধর শুরু করেন। তখন অত্যাচারিত কৃষকেরা পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ফেলে এবং তাদের হাতে চার পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে চলে যায়। ইলা মিত্র, রমেন মিত্র বা অন্যরা কিছু করতে পারেননি। পুলিশ আর সেনাবাহিনী এসে ১২টি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে চলে যায় মানুষ। অনেকে সীমান্তের ওপারে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কৃষক কর্মীদের ওপরে নেমে আসে চরম নির্যাতন।
ইলা মিত্র এবং তাঁর সঙ্গীরা সীমান্ত পার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা ভুল পথে চলে যান। শেষ পর্যন্ত পরদিন ৬ জানুয়ারি নাচোলের বহরমপুর রেলস্টেশনে বসে পড়েন। অনেক সাঁওতাল নারীর সঙ্গে মিশে যান ইলা মিত্র। বেশভূষা পরিবর্তন করেন। তবু তিনি ধরা পড়ে যান।
গ্রেপ্তারের পর নাচোল থানায় চার দিন ইলা মিত্রের ওপরে চরম অত্যাচার করা হয়। তারপর সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নবাবগঞ্জ থানায়। দফায় দফায় অত্যাচার করা হয় সেখানে। অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। ধর্ষণ করা হয়। চরমভাবে নির্যাতনের পর প্রায় মৃত্যুর মুখে পতিত হলে ২১ জানুয়ারি ইলা মিত্রকে রাজশাহী জেলে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন তাঁর চিকিৎসা চলে। চিকিৎসার পর কিছুটা উন্নতি হলেও সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভালো হয়নি।
রাজশাহী জেলে থাকাকালে শুরুতে ইলা মিত্রকে এক ঘরে আটকে রাখা হতো। সেখানে কোনো আলো–বাতাস ছিল না। একদিন কোর্ট থেকে ফিরে এসে তিনি জোর করে অন্য মহিলা বন্দীদের ঘরে ঢুকে তাঁদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। জেলে তখন অন্য কমিউনিস্ট নারীরা বন্দী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মনোরমা বসুর কথা ইলা মিত্র বারবার বলেছেন, যাঁর সাহায্যে তিনি কিছুটা সুস্থতার দিকে যেতে থাকেন। তারপরও পুরোপুরি সুস্থ হননি তিনি। একসময় অসুস্থতা চরম পর্যায়ে চলে যায়। তখন তাঁকে রাজশাহী কোর্টে নেওয়া হতো স্ট্রেচারে করে। সেখানে সহবন্দী মনোরমা বসু আর ভানু দেবীর জোরালো পরামর্শে কোর্টে ইলা মিত্র তাঁর ওপর নির্যাতন–বর্বরতার সব তথ্য প্রকাশ করে দেন। (মালেকা বেগম, ‘ইলা মিত্র: নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী’, প্রথমা প্রকাশন, ২০২১, পৃ. ৫৩)।
এসব নিয়ে রাজশাহীসহ সারা দেশে প্রতিবাদ হতে থাকে। ধীরে ধীরে সত্য প্রকাশ পেতে থাকে। এভাবেই ইলা মিত্রের মুক্তির বিষয়টি সামনে চলে আসে। এরপর সরকার বাধ্য হয়ে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে উন্নত চিকিৎসার জন্য। সেখানে আসার পরও চিকিৎসার তেমন উন্নতি হয়নি। মেডিকেল কলেজের ডাক্তার, নার্স ও ছাত্ররা সেবাযত্ন করে তাঁকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন। বামপন্থী প্রগতিশীল ছাত্র, যুবক, রাজনৈতিক ও নারী কর্মীরা তাঁকে হাসপাতালে দেখতে যান। তাঁকে উৎসাহিত করেন।
সবার দাবির মুখে ইলা মিত্র প্যারোলে মুক্তি পান। ডা. কে এস আলম তাঁকে সঙ্গে করে কলকাতায় হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসেন। দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হন।
সে সময় ইলা মিত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। তাঁর মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ইলা মিত্রের ছেলে রণেন মিত্র ও স্বামী রমেন মিত্রকে (তখন তিনি আত্মগোপনে) হাসপাতাল ওয়ার্ডে গোপনে নিয়ে যাওয়া হয়। ইলা মিত্র নীরবে তাঁদের দেখেন।
ভারতের কবিদের মধ্যে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও লেখক–সংগঠক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ইলা মিত্রকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখেন—‘পারুল বোন আমার’। ইলা মিত্রকে তিনি সেই কবিতা পাঠ করে শোনান। ঢাকার সেরা কবি–লেখকেরাও তাঁকে সাহস দিতে যান। মুর্তজা বশীর তাঁর ছবি এঁকেছেন। আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁকে নিয়ে গল্প লিখেছেন। ফয়েজ আহমেদ তাঁকে নিয়ে গদ্য লিখেছেন। আহমদ রফিকও তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। এভাবে ইলা মিত্রকে নিয়ে একটা বড় আলোড়ন শুরু হয়ে যায়। তাঁর মুক্তির দাবি জোরদার হতে থাকে।
তত দিনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত প্রাদেশিক পরিষদে তাঁর মুক্তির দাবি ওঠে। বিশেষ করে বামপন্থী প্রগতিশীল দলগুলো এবং আওয়ামী লীগের সদস্যরা তাঁর মুক্তির জন্য জোরালো দাবি তোলেন। মাওলানা ভাসানী তাঁর মুক্তি দাবি করেন। তখন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রদেশের গভর্নর। অবশেষে সবার দাবির মুখে ইলা মিত্র প্যারোলে মুক্তি পান। ডা. কে এস আলম তাঁকে সঙ্গে করে কলকাতায় হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসেন। দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হন।
কলকাতায় চলে যাওয়ার পরও ইলা মিত্র পূর্ববঙ্গের নাগরিক ছিলেন। কলকাতায় দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হলে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য তিনি চেষ্টা করেন। সেই সময় লোকসভা ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় তাঁকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে দাবি ওঠে। তারপরও সেটা সহজ ছিল না। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অরুণা আসফ আলীর মতো ব্যক্তিরা জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, তাঁর স্বামী রমেন মিত্র যেহেতু একজন ভারতীয় নাগরিক, সেই হিসেবে তাঁর স্ত্রী ইলা মিত্রও ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন।
সুস্থ হয়ে ইলা মিত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে বাংলায় এমএ পাস করেন। তারপর কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। নতুন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চারবার তিনি বিধানসভার সদস্য হয়েছিলেন। তিনি বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) ডেপুটি লিডার ছিলেন। একাধারে ভারতের মহিলা ফেডারেশন জাতীয় পরিষদের সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। আজীবন যুক্ত ছিলেন শিক্ষক আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯৫০–৫৪ সালে যেমন পূর্ববঙ্গের কারাগারে, পরে তেমনি পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬২, ’৭০, ’৭১ ও ’৭২ সালে তাঁকে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন, সামাজিক কাজ করেছেন এবং শিক্ষক আন্দোলন করেছেন। বলা যায়, প্রবল আত্মবিশ্বাস ও বিপ্লবী চেতনা নিয়ে তিনি আজীবন এই সংগ্রামের পথে অবিচল থেকেছেন।
এটা সত্য যে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির উগ্র হঠকারী নীতির কারণে বড় রাজনৈতিক ভুল হয়েছিল। সে জন্য অনেক কমিউনিস্ট নেতা–কর্মীকে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কারাগারে ও আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে। সবকিছুর পরও আমরা উচ্চকণ্ঠে বলতে পারি, সেই পঞ্চাশের দশকে ইলা মিত্রের ওপর নির্যাতনের কাহিনি এবং তাঁর বেঁচে থাকার সাহসী সংগ্রাম পরবর্তীকালে তাঁকে উত্তর–প্রজন্মের জন্য অদম্য সাহস ও মানবাধিকার সংগ্রামের প্রতীক করে তুলেছে। বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষে তিনি সম্মানিত হয়েছেন।
জেল থেকে মুক্ত হয়ে ভারতে নারী আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন ইলা মিত্র। মানবিক প্রতিরোধ, নারীর মর্যাদা ও সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে ইলা মিত্রের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা সব সময় অব্যাহত থাকবে।
পুনশ্চ:
অদম্য ইলা মিত্রের ওপর আমি যে আলোচনা করলাম, এর জন্য ইলা মিত্র–গবেষক মালেকা বেগমই ছিলেন যোগ্যতর ব্যক্তি। তাঁর ‘ইলা মিত্র: নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী’ বইটি তিনি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। সেই বই থেকে বাংলা ভাষার বৃহত্তর পাঠকসমাজ ইলা মিত্র সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
বইয়ের উৎসর্গপত্রে মালেকা বেগম লিখেছেন যে আমি তাঁকে অনেক সাহায্য করেছি। সহযোগিতা কতটা করতে পেরেছি, তা বলতে পারব না। তবে কিছুটা সাহায্য করেছিলাম। ইলা মিত্র, রমেন মিত্র বা রণেন মিত্রর (মোহন) সঙ্গে ছিল আমাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক। এই আলোচনায় এসে তাঁদের প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে পেরে, তাঁদের প্রতি বাংলাদেশ থেকে ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগে অংশ নিতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ বোধ করছি। একই সঙ্গে মালেকা বেগমের প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি।
[ঈষৎ পরিমার্জিত ও সংশোধিত]
