সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের কারণে মামলা–গ্রেপ্তারে ফিরছে উদ্বেগ
‘কথা চলবে, কলম চলবে’—এই বক্তব্য সংবলিত ফেস্টুন দেখা গেল আজ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিক্ষোভ সমাবেশে। এ এম হাসান নাসিমের মুক্তির দাবিতে এই বিক্ষোভ ডাকা হয়। ফেসবুকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগে ১৮ এপ্রিল তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ফেসবুকে একটি কার্টুন শেয়ার করাই নাসিমকে গ্রেপ্তারের কারণ। তবে এদিন বিকালেই তাঁর জামিনের আদেশ হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট শেয়ারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গ্রেপ্তারের ঘটনা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত এক মাসে অন্তত চারজনকে ৫৪ ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার এবং একজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
গত এক মাসে অন্তত চারজনকে ৫৪ ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার এবং একজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
গত ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে আজিজুল হক নামে এক ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। একটি পেজ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ছবিসহ ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। সেটি আজিজুল হক নিজের ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ার করেছিলেন।
ভোলায় আরেক ঘটনায় ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয় বিবি সওদা নামের একজন নারীকে। পরে বিষয়টি আলোচনায় এলে তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষমতা দেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই ধারার অপব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে।
বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার বিষয়টি সব সময়ই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিল। গত দেড় দশকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রবণতা দৃশ্যমান ছিল এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনীতে বলা হয়, আমলযোগ্য অপরাধে কাউকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে হলে পুলিশকে দেখাতে হবে যে ওই ব্যক্তি পুলিশের সামনেই অপরাধ করেছেন। যদি অপরাধসম্পর্কিত এজাহার বা নালিশি মামলা তদন্তাধীন থাকে, তবে পুলিশকে দেখাতে হবে যে ওই ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে যুক্তিসংগত সন্দেহের কারণ আছে। শুধু প্রতিরোধমূলক আটক করার জন্য ৫৪ ধারা ব্যবহার করা যাবে না।
এরপরও ময়মনসিংহ এবং ভোলার দুটি ঘটনাতেই ৫৪ ধারার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের সময় স্পষ্টভাবে কারণ জানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
রেজাউর রহমান লেনিনের মতে, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার বিষয়টি সব সময়ই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিল। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রবণতা দৃশ্যমান ছিল এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
এর মধ্য দিয়ে একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সরকার যাঁরা পরিচালনা করছেন, যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের কারও বিরুদ্ধে যাতে কেউ কথা না বলতে পারে, যেটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারও করত।
আইন বদলেছে, গ্রেপ্তারের ধরন বদলায়নি
আওয়ামী লীগের শাসনকালে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করতে নানা আইনের ব্যবহার ছিল ব্যাপকভাবে আলোচিত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ হয়রানিমূলক কয়েকটি আইনে মামলা ও গ্রেপ্তার গিয়েছিল বেড়ে।
তখন শুরুতে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল তথ্যপ্রযুক্তি আইন। এই আইনের ৫৭ ধারার প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছিল। এরপর ২০১৮ সালে করা হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ২০২৩ সালের ৫ জুন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জাতীয় সংসদে বলেন, ওই বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোট ৭ হাজার ১টি মামলা হয়েছে। দেশ–বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিতর্কিত এই আইন বাতিল করে ২০২৩ সালে প্রণীত হয় ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে আইন পরিবর্তন হলেও অনলাইন মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তারের ধরনে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
১৭ এপ্রিল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হাসান নাসিমকে আটকের পর গুলশান থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।
নাসিমকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা কল্পনাও করতে পারি নাই একটা নির্বাচনের পরে কার্টুন শেয়ার দেওয়ার জন্য হাসানকে গ্রেপ্তার করা হবে মাননীয় স্পিকার। আমরা হাসিনার আমলে দেখেছি কটূক্তি করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়।’
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘কার্টুন আমার ব্যাপারে আঁকার কারণে কেউ যদি গ্রেপ্তার হয়, তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।’ তবে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তাঁর এবং বিএনপির বিরুদ্ধে কয়েকটি ফেক আইডি থেকে মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। নূরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ওই ভদ্রলোক এখন পর্যন্ত আমরা জানি না, এই সমস্ত সাইবার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কি না?’
এর আগে চলতি বছরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর পর তিনি এখনো বন্দীই আছেন।
উদ্বেগ
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার দ্বার অবারিত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে সরকার যাঁরা পরিচালনা করছেন, যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের কারও বিরুদ্ধে যাতে কেউ কথা না বলতে পারে। যেটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারও করত।’
তিনি বলেন, এই ধরনের বিষয়গুলো যখন আইনি জায়গা থেকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করা হয়, তখন প্রকারান্তরে সমাজের ভেতরে মানুষের যে স্বাভাবিক প্রশ্ন করার বা সমালোচনা করার অধিকার, সেটি সংকুচিত হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনলাইন-অফলাইনে সমালোচনা হলেও তুলনামূলকভাবে কম আইনি পদক্ষেপ দেখা গেছে। তবে নির্বাচনের পর আবার এমন কিছু ঘটনা ঘটছে, যেখানে বক্তব্য বা মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে—যেখানে সরাসরি কোনো ক্ষতি বা হুমকির অভিযোগ নেই—সেসব ক্ষেত্রেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
সারা হোসেন বলেন, কিছু ক্ষেত্রে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, যেমন গভীর রাতে কাউকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, সেগুলো উদ্বেগজনক এবং নাগরিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো কেবল খারাপ চর্চা নয়, বরং আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি যারা এ ধরনের ঘটনায় জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান সারা হোসেন।