সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে গবাদি পশুপাখির টিকার সংকট আছে। টিকা দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব আছে। এ ছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জনবলেরও ঘাটতি আছে। এসব কারণে প্রতিবছর প্রাণিসম্পদের (হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ভেড়া-মহিষ প্রভৃতি) একটা বড় অংশ টিকার বাইরে থেকে যায়। ফলে রোগব্যাধিতে প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়।

সরকারের প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এলআরআই) গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি প্রভৃতি পশুপাখিকে রক্ষায় ১৭টি রোগের টিকা উৎপাদন করে। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন এ প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ টিকা উৎপাদন করে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা প্রথম আলোকে বলেন, এলআরআই যে পরিমাণ টিকা উৎপাদন করে, তা পর্যাপ্ত নয়। এ জন্য এলআরআইয়ের ল্যাবের আরও আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করতে হবে। এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে আলোচনা চলছে।

টিকার বড় ঘাটতি
এলআরআইয়ের তথ্যানুযায়ী, তারা ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অথচ এই অর্থবছরে দেশে মোট প্রাণিসম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৩ কোটি ২৪ লাখ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি গরু বা মুরগিকে একাধিক রোগের টিকা দিতে হয়। আবার কোনো কোনো রোগের জন্য দিতে হয় একাধিক ডোজ টিকা। কিন্তু সরকার যে পরিমাণ টিকা উৎপাদন করে, তাতে বড় ঘাটতি থেকে যায়। বেসরকারিভাবে টিকা আমদানি করার পরও এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব হয় না।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকের তথ্যানুযায়ী, এলআরআই দেশের চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ টিকা উৎপাদন করতে পারে। উৎপাদনের বড় ঘাটতির জন্য এলআরআইয়ের জনবল ও বাজেট–স্বল্পতার কথা বৈঠকে উঠে আসে।

অবশ্য এলআরআইয়ের পরিচালক অমলেন্দু ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, জনবল ও ভর্তুকি বাড়ালেও বর্তমান ল্যাব (কারখানা) দিয়ে টিকার উৎপাদন খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হবে না।

আর্থিক ক্ষতি
২০১৮ সালে সরকারের এক হিসাব অনুযায়ী, শুধু ক্ষুরারোগের কারণেই দেশে প্রতিবছর ১ হাজার ৬২ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলআরআই ক্ষুরারোগের টিকা উৎপাদন করে, কিন্তু তা অপর্যাপ্ত। সব গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনতে পারলে এই আর্থিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।

তবে গবাদি পশুপাখিকে টিকা না দেওয়ার কারণে প্রতিবছর ঠিক কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সিস্টেমের পরিচালক ও ভেটেরিনারি অনুষদের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আবু হাদী নূর আলী খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের প্রাণিসম্পদ থেকে যে পরিমাণ লাভ হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। কারণ, টিকা না দিলে অনেক প্রাণিসম্পদই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। একজন কৃষকের ১০টি গরুর মধ্যে দুটি মারা গেলে তাঁর অনেক ক্ষতি। আর টিকা দিলে ওই গরু দুটি মরবে না। এ ছাড়া রোগে আক্রান্ত হলে পশুর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি চিকিৎসা খরচও আছে।

তৃণমূলে সচেতনতার অভাব
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়ি গ্রামের মো. সোহরাব আলীর সাতটি গরু আছে। তবে তিনি একটি গরুকেও এখন পর্যন্ত টিকা দেননি। সোহরাব প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ আহেও না, টিকামিকাও দেই না। কেউ কয় নাই যে টিকা দিওন লাগব।’

সোহরাবের মতো অনেকেই গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিকে টিকা দেওয়ার বিষয়ে সচেতন নন। আবার এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকেও পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই।

অধ্যাপক আবু হাদী নূর আলী খান বলেন, বড় খামারিদের প্রায় সবাই টিকার বিষয়ে সচেতন। কিন্তু গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে পালন করা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ভেড়া-মহিষের বড় অংশকে টিকা দেওয়া হয় না। এ ছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপজেলা পর্যায়ে অল্প কয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে লাখ লাখ গৃহপালিত পশুপাখিকে টিকা দেওয়া সম্ভব নয়।

পোলট্রিতে সচেতন সরকার
পোলট্রিতে বার্ড ফ্লু ও গবাদিপশুতে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগ প্রতিরোধে টিকা আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বার্ড ফ্লুর জন্য ১৮ কোটি ও এলএসডি রোগ প্রতিরোধে ৫০ লাখ টিকা আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বার্ড ফ্লুর টিকা আমদানির বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পোলট্রি আমাদের বড় উৎপাদন। এটা টিকিয়ে রাখতে হবে। আমরা প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিচ্ছি। নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কাজ করছি।’

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশ সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। এর মধ্যে যেন পোলট্রি খাতে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হয়, সে জন্য টিকা আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।