জঙ্গিবিরোধী অনুসন্ধান ও অভিযানে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, নতুন জঙ্গিগোষ্ঠী সংগঠিত হতে শুরু করে ২০১৭ সালে। নিষিদ্ধ তিন জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম, জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের সাবেক কয়েকজন এর উদ্যোক্তা। তাঁরা ২০১৯ সালে সংগঠনের নাম ঠিক করেন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া (যার বাংলা অর্থ: পূর্ববর্তী হিন্দের সাহায্যকারী দল)। এর আগে থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সদস্য সংগ্রহ শুরু করা হয়। 

ওয়াকিবহাল একটি সূত্র জানায়, এই জঙ্গিগোষ্ঠী সদস্যদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে পাহাড়ের নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে। টাকার বিনিময়ে কেএনএফ বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি, থানছি ও তৎসংলগ্ন রাঙামাটির বিলাইছড়িতে তাদের ক্যাম্পে জামাতুল আনসারের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়।

কেএনএফ পাহাড়ে অপেক্ষাকৃত নতুন সংগঠন। বম জাতিগোষ্ঠীর একটা অংশের উদ্যোগে এটি গঠিত হলেও তাদের দাবি, ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২১ সালের শেষ দিকে কেএনএফের ক্যাম্পে এই জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সেখানে অস্ত্র চালানো, বোমা (আইইডি) তৈরি, ঝটিকা ও চোরাগোপ্তা হামলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সম্প্রতি কেএনএফের ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর যেসব তথ্য–উপাত্ত পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায়, কেএনএফের সঙ্গে তাদের ক্যাম্পে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের জন্য জামাতুল আনসারের চুক্তি হয়েছিল। সে চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৩ সাল পর্যন্ত। জামাতুল আনসার এখন পর্যন্ত পাহাড়ে প্রশিক্ষণের জন্য তিন দফায় তিনটি ব্যাচ পাঠিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ব্যাচে ১২ জন, দ্বিতীয় ব্যাচে ৩১ জন, তৃতীয় ব্যাচে ১২ জনসহ মোট ৫৫ জনকে পাঠানো হয়।

গত সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা থেকে একযোগে সাত তরুণ বাড়ি ছেড়ে যায়। নিখোঁজ এসব তরুণের বিষয়ে র‌্যাব তদন্তে নেমে আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণকারী নতুন এই জঙ্গিগোষ্ঠীর বিষয়ে জানতে পারে। এরপর গত অক্টোবরে নিখোঁজ ৫৫ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পাহাড়ে প্রশিক্ষণ শিবিরকে লক্ষ্যবস্তু করে বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় গত অক্টোবরে নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় র‌্যাব অভিযান শুরু করে। অভিযান-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযানের সময় কেএনএফের আস্তানায় জামাতুল আনসারের ৫৩ জন সদস্য ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে পাহাড়ে এবং সেখান থেকে পালিয়ে আসা দুজনকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে। পাহাড় থেকে ফেরা দুজনকে সিলেট ও ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। বাকিদের গ্রেপ্তার করতে পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত আছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেছেন, এ পর্যন্ত নতুন এই সংগঠনের মোট ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত সোমবার ভোরে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে জামাতুল আনসারের সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান ওরফে রনবীর ও তাঁর সহযোগী আবুল বাশার মৃধা ওরফে আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাসুকুর রহমানের কাছ থেকে উদ্ধার করা একটি মুঠোফোনে পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠনটির সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণের ভিডিও পাওয়া গেছে।

গতকাল মঙ্গলবার কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ভিডিও চিত্রটি প্রকাশ করে র‌্যাব। ভিডিওতে সামরিক পোশাকের আদলে তৈরি পোশাক পরে একে-২২ রাইফেল ও শটগান নিয়ে প্রশিক্ষণের দৃশ্য ধারণ করা হয়। তাতে যে ২২-২৩ জনকে দেখা গেছে, প্রায় সবার পরিচয় জানা গেছে। এর মধ্যে জামাতুল আনসারের আমির আনিসুর রহমান ওরফে মাহমুদ, কথিত সামরিক কমান্ডার শিব্বির আহমেদ ওরফে হামিদ কারছে, দাওয়াতি শাখার প্রধান আবদুল্লাহ মায়মুনকেও দেখা গেছে। ভিডিও চিত্রে পাহাড়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের জঙ্গিরা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই জঙ্গিগোষ্ঠীর সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান ওরফে রনবীরকে এতে দেখা যায়নি। গত সোমবার রনবীরের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া তাঁর সহযোগী আবুল বাশার মৃধা ওরফে আলমকে ভিডিওতে দেখা গেছে। আবুল বাশার এই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং বোমার তৈরির বড় কারিগর বলে জানায় র‌্যাব। 

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, উদ্ধার হওয়া ভিডিওতে জঙ্গিদের কয়েকটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প দেখানো হয়েছে। সেগুলো হলো জর্দান ক্যাম্প, রেতলাঙ ক্যাম্প, রামজুদান ক্যাম্প (সিপ্পি পাহাড়ের কাছে)। এসব ক্যাম্প বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম অঞ্চলে। ভিডিওর শুরুতেই জামাতুল আনসারের আমির আনিসুর রহমান ওরফে মাহমুদকে দেখা যায়। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের এক প্রশিক্ষককেও দেখা গেছে।

বিভিন্ন ক্যাম্পে সামরিক কার্যক্রম বা প্রশিক্ষণের সার্বিক দায়িত্বে থাকা জামাতুল আনসারের দুই সদস্য শিব্বির ওরফে কারসে এবং মো. দিদার ওরফে চাম্পাইকে দেখা গেছে উল্লেখ করে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সামরিক কার্যক্রম বা প্রশিক্ষণ দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দুটি ভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় এই দুজনকে। আর পুরো সামরিক কার্যক্রম দেখভাল করতেন সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান। ভিডিওতে সালেহ ও আল-আমিন নামের আরও দুজনকে দেখা গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া সালেহ কয়েক দিন আগে বান্দরবানে শারক্বীয়ার দুই সদস্যের কবরের সন্ধান দিয়েছিলেন।

এ ছাড়া অস্ত্র হাতে আরেক তরুণকে দেখা যায়, তাঁর নাম আরিফুর রহমান ওরফে লাইলেং। বিবিএ পাস করা এই তরুণের বাড়ি বরিশালে। নিখোঁজ ৫৫ জনের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। 

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জামাতুল আনসারের সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর জানিয়েছে, মূলত রণকৌশলগত চলাচল, চলতি পথে অস্ত্র বহন ও টহলকালে বা ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়লে তাদের অবস্থান কেমন হবে, সে কৌশল তারা ভিডিওতে রেখেছে। শত্রুর ক্যাম্পে হানা দেওয়ার সময় কীভাবে ৩৬০ ডিগ্রির কৌণিক দূরত্বে সদস্যরা অবস্থান করবেন, সেই অভিযানকারী মহড়া রাখা হয়েছে ভিডিওতে। 

খন্দকার আল মঈন বলেন, এই ভিডিওর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো, যাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামে আছেন এবং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাঁদের আরও উদ্বুদ্ধ করা। সংগঠনটির সামরিক শাখায় যাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তাঁদের করণীয় কী হবে, সেই বিষয় সামনে রেখেও ভিডিওটি করা হয়েছে। সমতলে অবস্থানকারী বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভিডিও দেখিয়ে উদ্বুদ্ধ করাও ছিল তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

এই বিষয়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বড় কোনো হামলার মধ্য দিয়ে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের সময় ভিডিওটি প্রকাশ করতে চেয়েছিল জঙ্গিরা। এ লক্ষ্যে ওয়েবসাইটও তৈরির প্রস্তুতি চলছিল। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছিল মূল লক্ষ্য। 

প্রসঙ্গত, এর আগে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশও (জেএমবি) ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে এবং বোমার সঙ্গে প্রচারপত্র দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আইএস দাবি করে, দেশীয় জঙ্গিগোষ্ঠী নব্য জেএমবিও ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়ংকর জঙ্গি হামলা চালিয়ে নিজেদের জানান দিয়েছিল। হামলার ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে ঘটনার দায় স্বীকারও করেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মুখে এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। নেতাদের বেশির ভাগ মারা পড়েন বা গ্রেপ্তার হন। এবারের অভিযানের সঙ্গে যুক্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজানে হামলার আগে আইএসের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক তরুণ ‘হিজরতের’ নামে ঘর ছেড়েছিলেন। যাঁদের একটা অংশ পরে ভয়ংকর ওই হামলায় অংশ নেন। এবারও যদি কুমিল্লার সাত তরুণ নিখোঁজের ঘটনা গুরুত্বসহকারে নেওয়া না হতো, বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা ছিল। তবে এখনো অনেক পরিবার সন্তানদের নিখোঁজের বিষয়টি প্রকাশ করে না, ফলে সব নিখোঁজের বিষয় নজরে আসে না। যা সবার জন্য বিপদ ডেকে আনে। এই কর্মকর্তার দাবি, নতুন এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে তাঁরা শিগগির নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবেন।