সড়ক পরিবহন আইন
আইনের প্রয়োগ কম, মানতেও অনীহা
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কঠোর সড়ক আইন। পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের দাবির মুখে আইনটি শিথিল হচ্ছে
সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলবে না, লাইসেন্সবিহীন চালক গাড়ি চালাতে পারবেন না—নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে এ দুটি দাবি প্রধান ছিল। সড়ক পরিবহন আইনে ফিটনেসবিহীন যান চালানো ও চালকের লাইসেন্স না থাকার সাজা ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। কিন্তু আইন পাসের চার বছর পরও এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে না।
পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তাঁদের চাপে এ-সংক্রান্ত বিধিমালাও প্রণয়ন করতে পারেনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
পরিবহন–বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে আইন প্রয়োগে শিথিল হওয়ার নির্দেশনা আছে। আইন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা এখনো বেপরোয়া। অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাঁদের প্রতি নমনীয়।
নতুন সড়ক আইন, কঠোর শাস্তির বিধান মানুষের মধ্যে আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু মালিক ও শ্রমিকদের দাবির মুখে ছাড় দেওয়ার ফলে গতিটা কমে গেছে। পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে সরকারের পূর্ণ মনোযোগ না থাকলে এ থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।সামছুল হক, অধ্যাপক, পরিবহন–বিশেষজ্ঞ
পরিবহন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা থাকবে। নির্ধারিত হারের বেশি ভাড়া নেওয়া যাবে না। এই আইন ভঙ্গের শাস্তি ১ মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা। পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের দাবির মুখে এটি শিথিল করে শুধু পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার সুপারিশ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আজিমপুর, গাবতলী, শ্যামলী ও ফার্মগেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক বাসেই ভাড়ার তালিকা নেই। সরকারের সর্বশেষ নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। ৭ আগস্ট সরকার বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ করলেও অনেক বাসেই সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে সদরঘাট রুটে চলা তানজিল পরিবহনে সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা। মিরপুর-১ নম্বর থেকে ফার্মগেটের সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১৮ টাকা। তানজিল পরিবহনে নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। এই পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী সুমন মিয়া বলেন, ‘তালিকা দেখে তো ভাড়া নিই না। মালিক যে ভাড়া বলে দেন, সেটাই নিই।’
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামলে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শৃঙ্খলা আনার বিষয়টি আবার সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সরকার ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর কঠোর শাস্তির বিধানসংবলিত একটি আইন পাস করে। এটি পাসের প্রায় এক বছর দুই মাস পর কার্যকরের ঘোষণা আসে। কিন্তু তখন আইনটি সংশোধনের দাবিতে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডেকে সারা দেশ অচল করে দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করে আইনটি সংশোধনের আশ্বাস দেন। বর্তমান সড়ক আইনে ৪২টি ধারায় অপরাধ ও কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা ৩৪টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে ২৯টি ধারা আমলে নিয়ে সংশোধনের সুপারিশ করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।
নিয়ম মানার তাগিদ নেই
দেশের মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও গ্রামীণ সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে কেউ নিয়ম মানেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালক ও আরোহীরা হেলমেট পরেন না। বেশির ভাগ চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স নেন না। এক মোটরসাইকেলে দুজনের বেশি চলেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল অহরহ চলে।
সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ সরকারের অনুমোদনহীন নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ ছোট যানের মহাসড়কে চলাচল। আইনে নছিমন, করিমন চলাচলের সাজা ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ২০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। এসব অবৈধ যান মহাসড়কে চলাচল বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নছিমন, করিমন চালানোর শাস্তি কমিয়ে শুধু এক মাসের কারাদণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী বাস যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী তুলতে দেখা যায়। অথচ আইনে নির্ধারিত স্থানের বাইরে যানবাহন থামানো, পার্কিং ও যাত্রী-মালামাল ওঠানামা অপরাধ। এর শাস্তি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা। যত্রতত্র যাত্রী তোলা বন্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে এই অপরাধের জরিমানা কমিয়ে এক হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
পরিবহন–বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, নতুন সড়ক আইন, কঠোর শাস্তির বিধান মানুষের মধ্যে আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু মালিক ও শ্রমিকদের দাবির মুখে ছাড় দেওয়ার ফলে গতিটা কমে গেছে। পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে সরকারের পূর্ণ মনোযোগ না থাকলে এ থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।