মামস্‌ ইনস্টিটিউটে অস্ত্রোপচারে রেহেনাকে কোনো টাকা দিতে হয়নি। ওষুধপত্রের জন্যও কোনো খরচ লাগেনি। হাসপাতালে এক মাস থাকার জন্য শয্যাভাড়া লাগেনি। তিন বেলা খেয়েছেন, এ জন্যও কেউ কোনো টাকা নেয়নি। অর্থাৎ একদম বিনা মূল্যে নতুন জীবন পেয়েছেন রেহেনা বেগম। শুধু রেহেনা নন, এই হাসপাতালে সব রোগীই বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন।

হাসপাতালটি শুধু চরম দারিদ্র্যে থাকা নারীদের জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য। নারীদের চিকিৎসাসেবায় পথপ্রদর্শক হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছেন অধ্যাপক সায়েবা আখ্তার। প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধে কনডম দিয়ে তৈরি প্রযুক্তি ‘সায়েবা মেথড’ দেশে–বিদেশে বহু নারীর জীবন রক্ষা করেছে। এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক তিনি। চিকিৎসায় বিশেষ অবদান রাখায় ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক দেয়।

বিন্দু বিন্দু অনুদানে গড়ে ওঠা

মগবাজার চৌরাস্তার কাছে নিউ ইস্কাটনে একটি বহুতল ভবনের তলায় ছোট এই হাসপাতাল। অসংখ্য বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ডের ভিড়ে মামস্‌ ইনস্টিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড ওমেন্স হেলথ নামটি খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশে স্ত্রীরোগের বিশেষায়িত চিকিৎসার খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা এর নাম–ঠিকানা জানেন।

মহৎ এই উদ্যোগ কীভাবে শুরু হলো, তা জানতে কথা হয় অধ্যাপক সায়েবা আখ্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে স্ত্রীরোগ বিভাগে কাজের সময় আমি সিদ্ধান্ত নিই, সরকারি চাকরি ছাড়ার পর সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত নারীদের চিকিৎসায় কিছু করব।’ ২০০৬ সালে ঢাকা মেডিকেল থেকে অবসর নেওয়ার কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) স্ত্রীরোগ বিভাগে যোগ দেন। তিন বছর চাকরি করার পর ২০০৯ সালে বিএসএমএমইউ থেকে অবসর নেন। পরের বছর ২০১০ সালে মামস্ ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু।

হাসপাতাল গড়তে অনেক টাকার প্রয়োজন। শুরুতে অধ্যাপক সায়েবা আখ্‌তার নিজের পেনশনের পুরো টাকা হাসপাতাল গড়ে তোলার কাজে লাগান। এ উদ্যোগে চিকিৎসক স্বামী ও ভাইদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছেন। অধ্যাপক সায়েবা আখ্‌তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাকাত ফান্ড আছে। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব যে জাকাত দেন, তাতে হাসপাতালের তিন–চার মাসের খরচ চলে যায়। এ ছাড়া সমাজের নানা ধরনের ব্যক্তি কিছু কিছু অর্থসহায়তা দেন।’

আইএলডিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান গত বছর ২৫ জন রোগীর সব খরচ বহন করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি এ বছরও ৫০ জন রোগীর যাবতীয় খরচ বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রয়াত বিচারপতি আমিরুল ইমলাম অপারেশন থিয়েটারের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওটি লাইট কিনে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করতেন। একটি সিরামিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হাসপাতালের মেঝেতে টাইলস লাগিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সময় রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হয়, সেই রক্ত সরবরাহ করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানে যেসব চিকিৎসক প্রশিক্ষণ নিতে আসেন, তাঁদের অনেকেও নানা ধরনের সহায়তা করেন। এমনই একজন চিকিৎসক হাসপাতালের চিকিৎসক–নার্সদের পোশাক দিয়েছিলেন, একজন দিয়েছিলেন স্যান্ডেল। অধ্যাপক সায়েবা আখ্‌তার বলেন, ‘এভাবে বিন্দু বিন্দু সহায়তায় চলছে এই হাসপাতাল।’ তিনি নিজে দিনের একটি সময় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় ব্যয় করেন। সেখান থেকে উপার্জিত অর্থের কিছুটা প্রয়োজনে এখানেও ব্যয় করেন।

‘এটা ভাববার কোনো কারণ নেই যে আমরা ওটিতে কম দামি জিনিস ব্যবহার করি। অথবা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় আমরা তারতম্য করি। একদম না’—অধ্যাপক সায়েবা আখ্তারের স্পষ্ট কথা। হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও নার্স যে খাবার খান, সেই একই খাবার রোগীদেরও দেওয়া হয়।

চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা

প্রলম্বিত প্রসবজনিত ফিস্টুলা, অস্ত্রোপচারজনিত ফিস্টুলা, প্রল্যাপসসহ ১৩ ধরনের স্ত্রীরোগের অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা হয় এই হাসপাতালে। হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মকর্তা–কর্মচারী ২৫ জন। দুজন ছাড়া বাকি চিকিৎসক এখান থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেন না। হাসপাতালের প্রধান সার্জন অধ্যাপক সায়েবা আখ্তার নিজে। অবেদনবিদ হিসেবে তাঁকে সহায়তা করেন তাঁর ভাই। চিকিৎসক স্বামীও প্রয়োজনের সময় সহায়তা করেন।

রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি ফিস্টুলা, প্রল্যাপসসহ বেশ কিছু রোগের অস্ত্রোপচার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় হাসপাতালটিতে। স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখানে প্রশিক্ষণের জন্য আসেন। এ পর্যন্ত ৪৭টি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ থেকেও কিছু আয় হয়।

অধ্যাপক সায়েবা আখ্তার বলেন, ‘গবেষণা আমরা তেমন করে উঠতে পারি না। জনবলের সংকট আছে, অর্থেরও সংকট আছে। তবে গবেষণার ইচ্ছা আমাদের প্রবল।’ তিনি জানালেন, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সঙ্গে গবেষণার বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। শিগগিরই ফিস্টুলা নিয়ে এই গবেষণা শুরু হবে।

বয়স বাড়ছে। পরিচিতি আছে, জ্ঞান আছে, চিকিৎসায় দক্ষতা আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে বড় করার, টেকসই করার বুদ্ধি বা কৌশল যেন জানা নেই। এ নিয়ে কিছুটা হতাশাও হয়তো আছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে একাধিকবার অধ্যাপক সায়েবা আখ্তারের কথা হয়েছে। সর্বশেষ কথা হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে। ওই দিন তিনি বলেন, ‘এখন এটি ২২ শয্যার হাসপাতাল। সরকার ৫০ শয্যার অনুমোদন দিয়েছে। হাসপাতালের জন্য, প্রশিক্ষণের জন্য, গবেষণার জন্য আরও জায়গা দরকার। আরও জনবল, অর্থ ও নিজস্ব জায়গা দরকার। কিন্তু কীভাবে এসব হবে বুঝে উঠতে পারি না।’

আছে অন্য সহায়তা

চিকিৎসা নিতে আসা সব নারীর ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংরক্ষিত আছে প্রতিষ্ঠানে। শুধু ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তাঁদের ফোন করা হয় না; সার্বিক অর্থে তাঁরা কেমন আছেন, তা জানার চেষ্টা করা হয়। ফোন করে জানা যায়, কেউ অর্থকষ্টে আছেন। কারও–বা কাজ নেই। তাই মাঝেমধ্যে সাবেক রোগীদের বাড়িতে টাকা পাঠানো হয়। কাউকে কিনে দেওয়া হয়েছে ছাগল, কেউ পেয়েছেন গরু।

এভাবে চরম দুর্গতিতে পড়া বহু নারীর জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছেন অধ্যাপক সায়েবা আখ্তার ও তাঁর প্রতিষ্ঠান মামস্‌ ইনস্টিটিউট। এমনই আর একজন নেত্রকোনার আশামনি। তাঁর কিছু জন্মগত ত্রুটি ছিল। সব সময় প্রস্রাব ঝরত। এ অবস্থা নিয়ে স্কুল, কলেজ শেষ করে স্নাতক পাস করেছেন। আশামনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার চাচাতো বোনের গৃহকর্মীর মেয়ে এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়েছে। ওর কাছে সবকিছু শুনি। ২০২১ সালের শেষ দিকে আমি এখানে আসি।’

২০২১ সালের নভেম্বরে আশামনির অস্ত্রোপচার হয়। জন্ম থেকে যে সমস্যা ছিল, তার সমাধান করেছে এই প্রতিষ্ঠান। তাই এই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আশামনি যেতে চান না। এখানেই এখন কাজ নিয়েছেন। আশামনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে আমার, নতুন জন্ম।’