সাক্ষাৎকার: এরশাদুল করিম

অনলাইনে একে অন্যকে ঘায়েলের তৎপরতা নির্বাচনের সময় ঠেকানো কঠিন হবে

মুহাম্মদ এরশাদুল করিম মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা-গোপনীয়তা, তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক আইন-নীতি ইত্যাদি পড়ানোর পাশাপাশি এসব বিষয়ে তিনি গবেষণা করেন। মালয়েশিয়া সরকারের জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য তিনি। বাংলাদেশের ডিজিটাল জগৎ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইন-নীতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী পর্যবেক্ষণ আছে। বিদ্যমান আইন-খসড়াসহ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময় অনলাইন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সুহাদা আফরিন

প্রথম আলো:

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে বিগত আওয়ামী লীগ আমলের ডিজিটাল জগৎ–সংক্রান্ত আইন-বিধি-নীতি-খসড়া নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এসব উদ্যোগে কি পরিবর্তন দেখছেন?

এরশাদুল করিম: সত্যি বলতে, গুণগত কোনো বড় পরিবর্তন দেখিনি। আগের মতোই বর্তমান প্রশাসন আইনের খসড়া করে তা দেখিয়েছে। তারপর যেভাবে মনে হয়েছে, সেভাবে পাস করেছে। অংশীজনের মতামত কতটুকু রাখা হলো বা বাদ হলো, তা পরিষ্কার নয়। আদর্শ হলো—আইন প্রণয়নের জন্য সমস্যা চিহ্নিত করা, গবেষণা করা ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে আমি এ ধরনের স্বচ্ছ বা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া দেখিনি, বিশেষ করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে।

প্রথম আলো:

সরকারের কোন আইন বা নীতি প্রণয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল?

এরশাদুল করিম: অগ্রাধিকারের কথা বললে এখন বাংলাদেশের আইসিটি আইন ও নীতি আধুনিক করা দরকার। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) পাঁচ প্রজন্মের মডেলে আমরা এখনো দ্বিতীয় প্রজন্মে আছি। সেখানে প্রতিবেশীরা অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের দরকার একটা বেঞ্চমার্ক স্টাডি। দেখতে হবে, বিদ্যমান আইন ঠিকমতো কাজ করছে কি না। কোথায় আপডেট দরকার, আর নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবসার জন্য কী করা যায়। ডিজিটাল বা সাইবার সুরক্ষা আইন আছে; কিন্তু সহায়ক আইন নেই। এতে অপরাধীরা অপরাধ করছেন আর নিরাপরাধীরা ভুগছেন। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, গিগকর্মী (ফ্রিল্যান্সার, চুক্তিভিত্তিক বা খণ্ডকালীন কর্মী) ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সুরক্ষা, এআই নীতি আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গাইডলাইন তৈরি জরুরি।

আগের মতোই বর্তমান প্রশাসন আইনের খসড়া করে তা দেখিয়েছে। তারপর যেভাবে মনে হয়েছে, সেভাবে পাস করেছে। অংশীজনের মতামত কতটুকু রাখা হলো বা বাদ দেওয়া হলো, তা পরিষ্কার নয়।
প্রথম আলো:

বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল হয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ হলো। মিল বা পার্থক্য কী দেখছেন?

এরশাদুল করিম: আমি বলব, এই আইনে যা যা সন্নিবেশিত হয়েছে, অন্য দেশে সাধারণত তা আলাদা আলাদা আইন থাকে। এখানে সমস্যা হয়েছে—মতপ্রকাশ, সাইবার সুরক্ষা, শিশু-নারী-বয়স্কদের নিরাপত্তা, সবকিছু একসঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আইনের ভাষা এত টেকনিক্যাল যে বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হিমশিম খাচ্ছেন। যৌন হয়রানি বা পর্নোগ্রাফি–সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে আগেই আইন ছিল। তাই নতুন করে সব একসঙ্গে করার প্রয়োজন ছিল না। আইসিটি বিভাগ যদি খসড়া নিয়ে একটু সময় নিত, সমস্যা অনেকটা কমে যেত।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ ৫৫ বছরে পা দিতে যাচ্ছে; কিন্তু এত দিনেও আড়িপাতা বা নজরদারি নিয়ে আমাদের মোটামুটি একটি গাইডলাইন করা যায়নি।
প্রথম আলো:

দুই বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ক্ষমতাসীনেরাও আড়িপাতার ভুক্তভোগী হতে পারেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আপনার সেই পর্যবেক্ষণকে এখন কীভাবে দেখবেন? টেলিযোগাযোগ আইনের খসড়ায় আইনসম্মত আড়িপাতার বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক বাস্তবতায় আড়িপাতার নীতি কেমন হওয়া উচিত?

এরশাদুল করিম: বাস্তবতা এখনো বদলায়নি। আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার আগে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে নাগরিকের সুরক্ষাও সরকারের দায়িত্ব। ধরুন, কেউ নিজের নিরাপত্তার জন্য একটু নজরদারির ছাড় দিতে রাজি, এটা ঠিক আছে; কিন্তু সেটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে, সঠিক ও আনুপাতিক হতে হবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ ৫৫ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। কিন্তু এত দিনেও আড়িপাতা বা নজরদারি নিয়ে আমাদের মোটামুটি একটা গাইডলাইন করা যায়নি। মজার ব্যাপার দেখেন, বিগত সরকারের সময়ে এই অবাধ নজরদারি নিয়ে তৎকালীন এক বিচারপতির আদালতে গিয়েছিলেন একদল আইনজীবী। তাঁরা নির্দেশনা চেয়েছিলেন; কিন্তু বিচারপতি সেটি গ্রহণ করেননি। ভাগ্যের কী পরিহাস দেখেন, এখন তাঁরাই এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন।

নতুন জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের খসড়া হয়েছে, যেখানে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যারা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিধান কার্যকর করবে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, পৃথিবীতে কোনো দেশে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই; কিন্তু আমরা কেন করলাম জানি না।
প্রথম আলো:

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশের প্রস্তাবে দেশদ্রোহসহ জননিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটায়—এমন কোনো পোস্টের কারণে ব্যক্তির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে দায়বদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। তাদের ৩০০ কোটি টাকা জরিমানাসহ বিধানটি অজামিনযোগ্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে আপসযোগ্য রাখা হয়েছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?

এরশাদুল করিম: এই যুগে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক দেশই এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়বদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। নেপালের উদাহরণ সামনেই আছে এবং এর পরিণতিও দেখেছি। ভারতের হিসাব আলাদা। তাদের বিশাল বাজার আর আইটি সক্ষমতার কারণে তারা নিজের মতো করে নীতি আরোপ করেছে। বাংলাদেশে করতে হলে নেপালের উদাহরণ আর দেশি কনটেন্ট নির্মাতাদের কথা ভাবতে হবে। ভবিষ্যতে বিদেশি বড় টেক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে দেশে নিবন্ধন ও অফিস খোলায় জোর দেওয়া উচিত।

প্রথম আলো:

যেকোনো আইন প্রণয়নে আপনি আইন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বলেন। বাংলাদেশে এই কমিশন বা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের কার্যকারিতা নিয়ে কী বলবেন?

এরশাদুল করিম: আইন কমিশনের কাজ হলো, আইন পর্যালোচনা ও সরকারকে পরামর্শ দেওয়া। আগে এই কমিশন ভালো কাজ করেছিল; কিন্তু বিগত সরকারের সময় কমিশনের তেমন ভূমিকা দেখা যায়নি। তাদের এখন বিচারকের পাশাপাশি গবেষক ও শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা উচিত।

বিশ্বের অনেক দেশে বার কাউন্সিল সরকারের খসড়া আইনে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের অধিকার রক্ষা করে। আমাদের দেশে তা হয়নি। এ ছাড়া বাইরে বার কাউন্সিলগুলো তরুণ আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ দেয়, যা ডিজিটাল যুগে জরুরি। এখন এআই দিয়ে মামলার সাক্ষ্য তৈরি হচ্ছে। অন্যান্য দেশে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশে কি তা হচ্ছে?

আগের সরকার একটি এআই নীতি প্রণয়ন করেছিল। বর্তমান সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমি আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। কারণ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এআইয়ের সম্ভাবনা কিছুটা বুঝলেও নীতিনির্ধারক ও লিগ্যাল কমিউনিটি এখনো এর গভীর চ্যালেঞ্জগুলো উপলব্ধি করতে পারছে না।
প্রথম আলো:

অনলাইন জগতের ব্যাপ্তি অনেক। এখন অপরাধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইস্যু অনলাইনভিত্তিক হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে আদালত, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কেমন হওয়া দরকার?

এরশাদুল করিম: বর্তমান সরকার কিছু উদ্যোগ নিতে পারত। বেসরকারি সংস্থা কিছু কাজ করছে। কিন্তু আদালত ও আইনশিক্ষার ক্ষেত্রে ডিজিটাল বা সাইবার আইন নিয়ে ঘাটতি আছে। ফলে আইনের জগতে বড় শূন্যতা রয়ে গেছে।

আরও সমস্যা হলো, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায় খুঁজতে সমস্যা হচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ায় দেশের বাইরে থেকে রায় পাওয়া কঠিন। ডেটা তৈরি হচ্ছে; কিন্তু কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সাইবার জগতের জন্য প্রশিক্ষিত আইনজীবী তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রথম আলো:

সরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের খসড়া করেছে। খসড়ায় আইনটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সময় দেওয়া হয়নি। এই খসড়া নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এরশাদুল করিম: খসড়া অনেকটাই আগের সরকারের কাজের ধারাবাহিকতায় হয়েছে। এখনো ঘাটতি আছে। খসড়া ইংরেজিতে, বাস্তবায়নের সময়সীমা নেই, সাধারণ মানুষের বোঝার সুযোগ কম।

বাইরের দেশগুলো যেমন চীন, যুক্তরাষ্ট্র—ডেটা ট্রান্সফার ও লোকালাইজেশন নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম দিয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের খসড়ায় তা নেই। এ ছাড়া মূল আইন দিয়ে হবে না। সহায়ক আইনও দরকার। বিদ্যমান আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সহায়ক কাঠামো তৈরি করা যেত; কিন্তু হয়নি।

নতুন জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের খসড়া হয়েছে, যেখানে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যারা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিধান কার্যকর করবে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, পৃথিবীতে কোনো দেশে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই; কিন্তু আমরা কেন করলাম জানি না। আমার মনে হয়, এটি হয়েছে সেই গবেষণা ছাড়া প্রশাসনিক বা নির্বাহীভাবে আইন তৈরি করার ইচ্ছা থেকে।

আমার মনে হয়, নতুন কিছু আবিষ্কার করার দরকার নেই। বিশ্বের ভালো আইন ও প্র্যাকটিস কাস্টমাইজ করলেই চলবে। যেকোনো আইন করার আগে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে, সেটি যাচাই করা।
প্রথম আলো:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের চরিত্রহানি, মিথ্যা প্রচারণা ও মব তৈরির মতো উসকানি দেওয়া হয়, সেসব নিয়ন্ত্রণে সুসংগঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলো কী করে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় কী করা যেতে পারে?

এরশাদুল করিম: গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ, তবে সীমাহীন নয়। অধিকার থাকলেও নাগরিকের কিছু কর্তব্য আছে। যখন পর্যন্ত মতপ্রকাশ অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়, ততক্ষণ তা গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছে, সেগুলো অন্য দেশেও আছে। অধিকারের পাশাপাশি নাগরিকের কর্তব্যও মনে করিয়ে দিতে হবে। আর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সরকার এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করলে কার্যকর সমাধান পাওয়া যাবে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

এআই ব্যবহার এবং এর নীতি নিয়ে বাংলাদেশে কী পরিস্থিতি দেখছেন?

এরশাদুল করিম: আগের সরকার একটি এআই নীতি প্রণয়ন করেছিল। বর্তমান সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমি আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। কারণ, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এআইয়ের সম্ভাবনা কিছুটা বুঝলেও নীতিনির্ধারক ও লিগ্যাল কমিউনিটি এখনো এর গভীর চ্যালেঞ্জগুলো উপলব্ধি করতে পারছে না। আমরা এআইয়ের হাইপ বা সুবিধার দিকটাই বেশি দেখি; কিন্তু সমস্যার জায়গাগুলো উপেক্ষা করি।

ডিপফেক এখন শুধু ছবি বা ভিডিওতে সীমাবদ্ধ নয়। কণ্ঠস্বরও হুবহু নকল হচ্ছে। এটি ব্যক্তির সুনামহানির পাশাপাশি আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। অথচ আমাদের সাক্ষ্য আইন, সাইবার আইন বা বিচারক-আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ—কোনোটাই এখনো এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়।

এআই শুধু ব্যবসায়িক বা জনপ্রিয়তার বিবেচনায় নয়; বরং আইনি কাঠামো, মানবসম্পদ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—সব দিক নিয়েই এখনই গভীরভাবে চিন্তা ও কাজ শুরু করা দরকার। তা না হলে বাংলাদেশের জন্য সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

ডিপফেক ও এআইভিত্তিক ভিডিও ছড়াচ্ছে প্রচুর। আসন্ন নির্বাচনে এআই ব্যবহার করে কোনো ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাশাপাশি আগামী নির্বাচন ঘিরে তারা ডিপফেক ও এআই নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সময় অনলাইন প্রচারে কী ঘটতে পারে?

এরশাদুল করিম: বর্তমানে অনলাইনে যে ধরনের কার্যক্রম বা এক পক্ষের আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার নানা উপায়, তাতে একটি বিপর্যয় ঘটতেই পারে। সামনের পরিস্থিতি ঠেকানো কঠিন হবে। এআই ব্যবহার করা যাবে না—এই কথা বললেই হবে না। নীতি ভঙ্গ করলে কী হবে, কীভাবে প্রমাণিত হবে বা প্রতিকার কীভাবে মিলবে—এগুলো ঠিক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইসিটি মন্ত্রণালয় চাইলে ডিপফেক চেনার টুল, যাচাইয়ের উপায় ও রিপোর্ট করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারত। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা ছিল, তা দেখা যেতে পারে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বা সার্চ ইঞ্জিনের মধ্যে কনটেন্ট শেয়ারিং নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। মালয়েশিয়ায় এ বিষয়টি কীভাবে দেখা হয়?

এরশাদুল করিম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে মূল সমস্যা হলো, কনটেন্টের মালিকানা নির্ধারণ করা। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া আরও জটিল। যেমন গুগল ধীরে ধীরে গণমাধ্যমের মূল খবরকে এআই-জেনারেটেড সামারি হিসেবে দেখায়। ফলে ব্যবহারকারী সরাসরি মূল খবরে ঢুকছে না।

মালয়েশিয়ার মিডিয়ার পরিবেশ বাংলাদেশের মতো ভাইব্রেন্ট নয়। সেখানে শত শত গণমাধ্যম নেই। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো দেশটির সরকারের সঙ্গে কাজ করছে, সরকারের নীতি মেনে নিচ্ছে। তাদের অফিস আছে। এ ছাড়া সেখানে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সমস্যা এতটা না।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

টেক জায়ান্টগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করে। তারা ভ্যাট দেয়; কিন্তু আয়কর দেয় না। মালয়েশিয়ায় কীভাবে তা আদায় হয়?

এরশাদুল করিম: বাংলাদেশে আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা না থাকার কারণ হচ্ছে স্থানীয় আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অভাব। মালয়েশিয়ান কোম্পানিগুলোর অফিস ও নিবন্ধন থাকায় আয়কর দেওয়াসহ বাকি নিয়ম তারা মেনে চলে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার স্টারলিংকের মাধ্যমে এক্সের (সাবেক টুইটার) অফিস বাংলাদেশে করার আলোচনায় যেতে পারত।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

আপনার আর কী কী পর্যবেক্ষণ আছে?

এরশাদুল করিম: আমার মনে হয়, নতুন কিছু আবিষ্কার করার দরকার নেই। বিশ্বের ভালো আইন ও প্র্যাকটিস কাস্টমাইজ করলেই চলবে। যেকোনো আইন করার আগে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে, সেটি যাচাই করা।

আজকাল সবাই ভিডিও বানাচ্ছে; কিন্তু সেটি কতটা সাংবাদিকতা, কতটা ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ—এটি দেখার সময় এসেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সংবিধান শুধু অধিকার দেয় না, দায়িত্বও দেয়। তাই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, গোপনীয়তা ও সামাজিক নৈতিকতা মেনে চলার জন্য প্রযুক্তি-সাক্ষরতাও বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

আপনাকে ধন্যবাদ।

এরশাদুল করিম: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন