হামে ৬০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ
হাসপাতালে ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে ৪০%
মারা যাওয়া ৬০ জনের তথ্য
তিন মাস থেকে আট মাস বয়সী শিশু মারা গেছে ২৯টি।
মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১, মেয়ে ২৯টি।
ঢাকায় মারা গেছে ৪৮টি শিশু। বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে।
হামে খুব কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হতে দেখা যাচ্ছে। তিন মাস, চার মাস বয়সী শিশুরও মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে ছেলেশিশু মেয়েশিশুর সংখ্যায় তেমন কোনো তারতম্য সেই। দেখা যাচ্ছে, ৪০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে হাসপাতালে আসার দুই দিনের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) থেকে পাওয়া ৬০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, এ শিশুরা হামে আক্রান্ত ছিল বলে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে মারা যাওয়া শিশুরা কেউ টিকা পেয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে (সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত) সারা দেশে হামের উপসর্গে ৬ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৩ জনের অর্থাৎ এক দিনে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫৬ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করেন, এই ৪২৪ মৃত্যুই হামে।
তারিখ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির দিনই পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছে ৯ শিশু। ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে আরও ৯ শিশু। দেখা যাচ্ছে, ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কোন বয়সের শিশু মারা যাচ্ছে
এতকাল ধারণা করা হয়েছিল, খুব অল্প বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হয় না। শিশুরা মায়ের গর্ভ থেকে হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় এবং জন্মের পর মায়ের বুকের দুধও তাকে হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে এবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর জানা গেছে, ১৯ দিনের নবজাতক, ২৪ দিনের নবজাতক হামে আক্রান্ত হয়েছে।
ঢাকার একটি ছেলেশিশু রাজধানীর মহাখালী এলাকার ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮ এপ্রিল ভর্তি হয়। সেদিনই সে মারা যায়। শিশুটির বয়স ছিল তিন মাস। এ রকম আরও তিনটি শিশু মারা গেছে তিন মাস বয়সে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে বয়স বিভাজনে দেখা যায়, তিন মাস থেকে আট মাস বয়সী শিশু মারা গেছে ২৯টি। অর্থাৎ মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেক টিকা পায়নি। কারণ, আগের নিয়মে তাদের তখন টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি।
৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশু ২১টি। ১৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুই বছর থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সাত শিশু মারা গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাঁদপুরের একটি মেয়েশিশু মারা যায় এপ্রিলের ৯ তারিখে। মেয়েটির বয়স ছিল ৯ বছর। এই ৩১ শিশু টিকা পেয়েছিল কি না, সেই তথ্য নেই এমআইএসের কাছে। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ ও মেয়ে ২৯টি।
৬০টি শিশুর মৃত্যু তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ১৮টি শিশু ঢাকা জেলার। ৩০টি শিশু দেশের অন্যান্য জেলা থেকে এসে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল। অর্থাৎ ঢাকার হাসপাতালে মারা গেছে ৪৮টি শিশু। বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে মারা গেছে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কত দিন পর শিশুরা মারা যাচ্ছে—এই তথ্য সব শিশুর ক্ষেত্রে নেই। বরিশালে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ আছে, তবে তারা কবে ওই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছিল, সেই তারিখ নেই।
তারিখ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির দিনই পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছে ৯ শিশু। ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে আরও ৯ শিশু। দেখা যাচ্ছে, ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে ভর্তির পর ৪০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে প্রথম দুই দিনে।
দুই সপ্তাহ ধরে জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাংবাদিকেরা হামে মারা যাওয়া শিশুদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করার দাবি ও অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কিন্তু এমআইএস যে তথ্য সংগ্রহ করছে, তাতে অনেক ঘাটতি আছে।
১০ দিন বা তার চেয়ে বেশি দিন থেকে মারা গেছে ১৭ শিশু। একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে ভর্তি হওয়ার ৩৭ দিন পর।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এখানে ১৫টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি শিশু এসেছিল ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে। এরপর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। এই হাসপাতালে মারা যাওয়া ১০ শিশুর ৬টি এসেছিল ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানে ছয়টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এখানে টিকার তথ্য না থাকা খুবই দুঃখজনক। মারা যাওয়া শিশুদের অন্তত ৩১ জনের টিকা পাওয়ার কথা ছিল। এদের কতজন টিকা পেয়েছিল, কতজন পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পেয়েছিল, টিকা পাওয়ার পর কতজন মারা গেছে, সেটি জানার কোনো রাস্তা নেই। এটা শুধু সঠিকভাবে মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করলেই জানা সম্ভব। সেটাই হওয়া দরকার।’অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ, জনস্বাস্থ্যবিদ ও সিডিসির সাবেক পরিচালক
৬০টি শিশুর মৃত্যু তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ১৮টি শিশু ঢাকা জেলার। ৩০টি শিশু দেশের অন্যান্য জেলা থেকে এসে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল। অর্থাৎ ঢাকার হাসপাতালে মারা গেছে ৪৮টি শিশু। বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে মারা গেছে।
দুই সপ্তাহ ধরে জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাংবাদিকেরা হামে মারা যাওয়া শিশুদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করার দাবি ও অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কিন্তু এমআইএস যে তথ্য সংগ্রহ করছে, তাতে অনেক ঘাটতি আছে। মারা যাওয়া শিশুরা আগে অন্য কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা পেয়েছি কি না, টিকা পেয়েছি কি না, মারা যাওয়ার সময় তারা আইসিইউতে ছিল কি না—এমন তথ্য নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে টিকার তথ্য না থাকা খুবই দুঃখজনক। মারা যাওয়া শিশুদের অন্তত ৩১ জনের টিকা পাওয়ার কথা ছিল। এদের কতজন টিকা পেয়েছিল, কতজন পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পেয়েছিল, টিকা পাওয়ার পর কতজন মারা গেছে, সেটি জানার কোনো রাস্তা নেই। এটা শুধু সঠিকভাবে মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করলেই জানা সম্ভব। সেটাই হওয়া দরকার।’
