ডেঙ্গু আক্রান্ত তিন বোনই হাসপাতালে ছিল, একজনের ফেরা হলো না

ডেঙ্গুতে বড় মেয়ে সাফিয়া হাসিন আরোশীকে হারিয়েছেন। ছোট দুই মেয়ের সঙ্গে হাসানুজ্জামান ও শারমীন দম্পতি। গতকাল রাজধানীর মাটিকাটা এলাকায়ছবি: মানসুরা হোসাইন

সাফিয়া হাসিন আরোশী আইসিইউতে তার বাবাকে বলেছিল, সে শেষ পর্যন্ত ফাইট করবে। চেষ্টাও করেছিল। দন্ত চিকিৎসক বাবা হাসানুজ্জামান বললেন, ‘আমার ফাইটার, চ্যাম্পিয়ন মেয়েটা কথা রাখেনি। হাসপাতালে যাওয়ার দিনও বলেছিলাম, আমরা পাঁচজনই বাসায় ফিরব। কিন্তু একজনকে ছাড়াই বাসায় ফিরতে হলো।’

হাসানুজ্জামান-শারমীন আক্তার দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া আরোশী ছিল বড়। সায়রা হাসিন সরোশী ষষ্ঠ ও সাকেরা হাসিন রোদশী প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। তারা তিন বোন একাডেমিয়ার মিরপুর ক্যাম্পাসে পড়ত। ১৯ অক্টোবর প্রথমে আরোশীর জ্বর আসে। সেদিনই পরীক্ষায় জানা যায়, তার ডেঙ্গু পজিটিভ। এরপর ছোট দুই বোনেরও জ্বর ও ডেঙ্গু পজিটিভ হয়।

হাসানুজ্জামান জানালেন, প্রথমে বাসাতেই মেয়েদের তরল খাবার খাওয়ানো, প্রতিদিন প্লাটিলেটসহ অন্যান্য পরীক্ষা করা হচ্ছিল। আরোশী খেতে পারলেও বমি হচ্ছিল। পরে তার অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ২২ অক্টোবর তিন মেয়েকেই ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন মেয়ের শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে। সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে বিআরবি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার পর ২৫ অক্টোবর বেলা ১টা ২৬ মিনিটে আরোশী মারা যায়।

বাবা বললেন, ‘মেয়ের প্লাজমা লিকেজ হচ্ছে। কিডনি কাজ করছে না। তখনো মেয়েকে যখন বলেছি, তুমি আমার ফাইটার গার্ল, ফাইট করো। মেয়ে বলেছে, বাবা, আমি হাল ছেড়ে দেব না। আমি ফাইট করব।’
মায়ের সঙ্গে তিন মেয়ে। এখন একজন নেই
ছবি: পরিবারের কাছে পাওয়া

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মাটিকাটা, বাগানবাড়ি এলাকায় এসিওরেন্স সিটিতে চিকিৎসক হাসানুজ্জামানের নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসে কথা হয়। ২০১৪ সালে সাফিয়া হাসিন আরোশী তিন বছর বয়স থেকে এখানেই বড় হয়েছে। মারা যাওয়ার পর প্রথম জানাজা এখানেই হয়েছে। পরে নোয়াখালীর মাইজদীতে দাদা চিকিৎসক নুরুজ্জামান চৌধুরী ও দাদি আনোয়ারা বেগমের কবরের পাশে আরোশীকে দাফন করা হয়েছে।

বাবা বললেন, ‘মেয়ের প্লাজমা লিকেজ হচ্ছে। কিডনি কাজ করছে না। তখনো মেয়েকে যখন বলেছি, তুমি আমার ফাইটার গার্ল, ফাইট করো। মেয়ে বলেছে, বাবা, আমি হাল ছেড়ে দেব না। আমি ফাইট করব।’

মেয়ের অবস্থা দেখে বাবা বুঝতে পারছিলেন, হাতে আর বেশি সময় নেই। তখন মেয়ের কাছে মাফ চান, মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না বলে। মেয়ের অনেক শখ পূরণ করতে পারেননি। অনেক সময় বকা দিয়েছেন। মেয়ে তখনো মুখে হাসি এনে উল্টো সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বাবাকে।

আরও পড়ুন

আরোশী যেদিন মারা যায়, সেদিন ছোট মেয়ে রোদশীর শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল। তাই তাকে বোনের মৃত্যুর খবরটা জানানো হয়নি। তাকে হাসপাতালে দেখাশোনা করেন তার এক মামা ও মামি। সেদিন মেজ মেয়ে সরোশীর অবস্থা ভালো থাকায় তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দিলে সে বোনের মরদেহের সঙ্গে নোয়াখালীতে যায়।

তখন মেয়ের কাছে মাফ চান, মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না বলে। মেয়ের অনেক শখ পূরণ করতে পারেননি। অনেক সময় বকা দিয়েছেন। মেয়ে তখনো মুখে হাসি এনে উল্টো সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বাবাকে।
সমুদ্র সৈকতের ছবিটা আঁকা শেষ হয়নি আরোশীর
ছবি: মানসুরা হোসাইন

হাসানুজ্জামান বলেন, ‘বড় মেয়ে যখন আইসিইউতে, তখন দুই মেয়ে অন্য হাসপাতালে। আমরা দুই হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছি। নোয়াখালী যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে বড় মেয়ের লাশ, গাড়িতে আমার হাত ধরে আছে মেজ মেয়ে। আর এক মেয়ে হাসপাতালে, সে জানেই না তার বোন মারা গেছে। এ অবস্থার মধ্যে আমাদের দিন-রাত পার করতে হয়েছে।’

দুই মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে বড় মেয়ের দাফন শেষ করেই দ্রুত ঢাকার পথে রওনা দিতে হয়েছে বাবা-মাকে। বড় বোন মারা যাওয়ার পর থেকে ছোট দুই বোন কথা বলাই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ে। নিজেদের আলাদা রুম থাকলেও ওরা একসঙ্গেই সময় কাটাত, খুনসুটি করত।

বিআরবি হাসপাতালের আইসিইউতে যাওয়ার আগে আরোশী নিজের মুঠোফোনে হোয়াটসঅ্যাপে মা, প্রিয় বন্ধু, চাচাতো বোনদের দু-একজনকে খুদে বার্তা পাঠিয়েছে। মায়ের কাছে লেখা খুদে বার্তাতেও আদরের দুই প্রিয় বোনের কথা লিখেছে।

হাসানুজ্জামান বললেন, মেয়েটার জন্ম হলো ২০১১ সালের ১১ জুলাই, আর মারা গেল ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর। ক্যানসার হলেও মানুষের হাতে চিকিৎসা করানোর জন্য কিছুটা সময় থাকে, মশার কামড় ডেঙ্গুতে সে সুযোগও পাওয়া যায় না।

দুই মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে বড় মেয়ের দাফন শেষ করেই দ্রুত ঢাকার পথে রওনা দিতে হয়েছে বাবা-মাকে। বড় বোন মারা যাওয়ার পর থেকে ছোট দুই বোন কথা বলাই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ে। নিজেদের আলাদা রুম থাকলেও ওরা একসঙ্গেই সময় কাটাত, খুনসুটি করত।
হাত ছেড়ে চলে গেল একজন
ছবি: মানসুরা হোসাইন

মেয়ে মারা যাওয়ার পর অনেকেই বলছেন, বাবা চিকিৎসক, তারপরও মেয়েকে বাঁচাতে পারলেন না। এ কথা উল্লেখ করে হাসানুজ্জামান বলেন, তাঁর বাবা, ভাইসহ পরিবারের চিকিৎসক আছেন প্রায় ১৪ জন। আসলে ডেঙ্গু তো চিকিৎসক বা অন্য কিছু বিচার করে না। ডেঙ্গুর চারটি ভেরিয়েন্ট বা ধরনের মধ্যে কোনটাতে আক্রান্ত হয়েছে বোঝা কঠিন। একসঙ্গে তিন মেয়ের ডেঙ্গু হয়। শারীরিক ও বয়স বিবেচনায় ছোট দুই মেয়ের সুস্থ হওয়া নিয়ে সবাই চিন্তিত ছিল, অথচ বড় মেয়েটাই মারা গেল।

আরোশীকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার আগে মা শারমীন আক্তার আইসিইউতে মেয়ের কাছে গিয়েছিলেন। তখন মাকে দেখে মেয়ে বলেছে, ‘মা, তুমি আসছ। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে। মা, আমাকে ফেলে যেয়ো না।’ মেয়েটি কী বলতে চেয়েছিল, মায়ের আর জানা হলো না।

আরও পড়ুন

৪ অক্টোবর মায়ের জন্মদিনে দরজায় লাগানোর জন্য একটি ঝুলন্ত শোপিস উপহার দিয়েছিল মেয়ে। বাতাসে নড়লে শোপিস থেকে মিষ্টি আওয়াজ হয়। মেয়ে বলেছিল, এ শোপিস থেকে আওয়াজ হলেই আরোশীর কথা মনে হবে। এখন একটু আওয়াজ হলেই মা চমকে যান। আইসিইউতে একটি বালিশ রেখে নার্সদের বলেছিল, মা এখানে শুয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। মারা যাওয়ার আগে মেয়ের নাক-মুখ দিয়ে যখন রক্ত বের হচ্ছিল, তখন মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন।

তখন মাকে দেখে মেয়ে বলেছে, ‘মা, তুমি আসছ। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে। মা, আমাকে ফেলে যেয়ো না।’
নিজের মনেই বানিয়েছিল গিটারটি। ঝুলছে এখনো। নেই আরোশী
ছবি: মানসুরা হোসাইন

শারমীন আক্তার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বিবিএ পড়ছিলেন, তখন মেয়ের আগমনী বার্তা পান। আরোশীর জন্মের পর মেয়েকে সময় দেবেন বলে আর পড়াশোনা করেননি। এখন সেই মেয়েই তাঁকে ফেলে চলে গেল।

পুরো বাসায় আরোশীর স্মৃতি। আরোশীর রুমে পড়ার টেবিলটি গোছানো। টেবিলের তাকে পড়াশোনা, নাচ, ড্রয়িং, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল খেলাসহ নানা কাজের স্বীকৃতির ক্রেস্ট ও সনদ সাজানো। পড়ার টেবিলের পাশেই সমুদ্রসৈকতের একটি অসমাপ্ত ছবি, আঁকা শেষ করতে পারেনি।

নানা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল হক, খালা নাজনীন আক্তার—সবার মুঠোফোনে অসংখ্য ছবি। একেকজন একেকটা ছবি বের করছিলেন, আর কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সরোশী বড় বোনের জামা গায়ে দিয়ে বোনকে অনুভব করছে।

বাবা বললেন, আমরা আমাদের আবাসিক এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছি। বাইরে তো আর আমাদের কিছু করার নেই। ডেঙ্গুতে যে স্বজন হারাচ্ছে, শুধু তারাই হাহাকার করে যাচ্ছে। এটি শুধুই ব্যক্তি পর্যায়ের বা ভুক্তভোগীর হাহাকার।

বাবা হাসানুজ্জামান বলেন, মেয়ের চিকিৎসায় তাঁরা কোনো গাফিলতি করেননি। দুটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা কোনো অবহেলা করেছেন, তা-ও বলার উপায় নেই। যখন মেয়েকে বাঁচাতে না পারার জন্য মেয়ের কাছে মাফ চাইছিলেন, তখন শুধু মেয়ের দুই চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। তার তো তখন আর কিছু বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

হাসানুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আমাদের আবাসিক এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছি। বাইরে তো আর আমাদের কিছু করার নেই। ডেঙ্গুতে যে স্বজন হারাচ্ছে, শুধু তারাই হাহাকার করে যাচ্ছে। এটি শুধুই ব্যক্তি পর্যায়ের বা ভুক্তভোগীর হাহাকার। সরকারি পর্যায়ে তো কোনো হাহাকার নেই। করোনার সময় যে রকম তৎপরতা ছিল, ডেঙ্গু নিয়ে তেমন কিছু নেই। ডেঙ্গুকে আমরা এখনো কন্ট্রোল করতে পারলাম না।’

আরও পড়ুন