তিন বছর বয়সী ছেলে ঘুমের মধ্যে কান্না করে বলতে থাকে, ‘আম্মু পানিতে পলে যাচ্ছে’
‘আম্মু পানিতে পলে যাচ্ছে’, বলে প্রায় রাতে ঘুমের ভেতর কান্নাকাটি করে তিন বছর বয়সী শেহজাদ ইসলাম সোয়াইব। মায়ের চোখের সামনে তখন ঝড়ের মতো ভেসে ওঠে নদী, ডুবে যাওয়া বাস আর মানুষের চিৎকার। এমন পরিস্থিতিতে কান্না থামাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে হয়। মা আছে, জানার পর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে শেহজাদ। শুধু ছেলে নয়, পদ্মায় বাসডুবির ভয়ংকর স্মৃতি নিয়ে রাতে মা–বাবাও আর স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারছেন না।
শেহজাদের মা সুমা আক্তার হীরা গত বুধবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ছেলে এখন পানি দেখলেই ভয় পায়। পুকুর, বালতি বা মগের পানি দেখলেই অস্পষ্ট উচ্চারণে বলতে থাকে, ‘ধলো, আম্মু পানিতে পলে যাবে তো।’
সুমা বলেন, ছোট্ট ছেলে হয়তো পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না। কিন্তু পদ্মায় বাসডুবির পর বাবার কোলে চড়ে সে মাকে পানি থেকে উঠতে দেখেছে। চারপাশে সবার আলোচনা থেকে হয়তো বুঝতে পারছে, বাসে থাকা মা পানিতে পড়ে গিয়েছিল। এতে তার মনে ভয় ঢুকে গেছে।
গত ২৫ মার্চ বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস পন্টুন থেকে পড়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যায়। ঘটনার পর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা প্রায় সাত ঘণ্টার চেষ্টায় বাসটি টেনে পন্টুনে তোলে। এতে অন্তত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্যদের সঙ্গে এই বাসের যাত্রী ছিলেন সুমা, তাঁর স্বামী শাহরুখ ইসলাম ও শিশুসন্তান শেহজাদ।
পদ্মায় বাসডুবির আতঙ্ক
সুমার স্বামী শাহরুখ ইসলাম পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যাটালিয়নে (এসপিবিএন) উপপরিদর্শক। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে থাকেন। ঈদে রাজবাড়ীর পাংশায় বাড়ি গিয়েছিলেন তাঁরা। ঘটনার দিন ঈদের ছুটি শেষে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন।
সুমা বলেন, বাসে তাঁদের আসনের ওপর ফ্যান ছিল না। গরমে ছেলে অস্থির হয়ে গিয়েছিল। তাই শাহরুখ ইসলাম ছেলেকে নিয়ে বাস থেকে নেমেছিলেন। তিনি বাসে বসে ছিলেন। আর পন্টুনটি ছিল রেলিংবিহীন অরক্ষিত।
ঈদে স্বামীর দেওয়া সবুজ–নীলচে ফুল প্রিন্ট জামা পরে ঢাকায় ফিরছিলেন সুমা। বাসডুবিতে তাঁর জুতা, ওড়না, ব্যাগ, চশমা, মুঠোফোনসহ সবই পানিতে তলিয়ে যায়। সুমাকে উদ্ধারের পর স্থানীয় মানুষ তাঁকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে পোশাকের ব্যবস্থা করে দেন।
দুর্ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সুমা বলেন, ‘একটি ফেরি আসতেছে দেখলাম। ড্রাইভার নিচে ছিল। পরে ড্রাইভার এসে বাসস্টার্ট করামাত্র একটি ঝাঁকুনি দিল। ঝপ করে শব্দ হলো। বুঝলাম, বাস পানিতে ডুবে গেল। বাসে থাকা বাচ্চারা চিৎকার করছে। মায়েরা বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করছেন। সবাই বাঁচার চেষ্টা করছে। চোখের সামনে এখনো সব ক্লিয়ার ভাসে।’
সুমা বলেন, যেহেতু স্বামী ও সন্তান তখন বাসে ছিলেন না, তাই চট করে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন, যে করেই হোক বাঁচতে হবে। পানি থেকে মাথা তুলতেই স্বামী ও সন্তানের মুখ দেখতে পেয়েছিলেন। একজন পন্টুন থেকে গামছা এগিয়ে দিলে, সেটিই ধরে নদী থেকে পন্টুনে ওঠেন সুমা।
উদ্ধার ও বেঁচে ফেরা
ঘটনার পর সুমা পরিবারসহ ট্রেনে করে ঢাকায় ফিরেছিলেন। তবে মানসিক ধাক্কার কথা বিবেচনা করে কর্মস্থল থেকে তাঁর স্বামীকে ছুটি দিয়েছে। তাই সুমা আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানে তাঁরা সেখানেই আছেন।
সুমা বলেন, তাঁর বাবার বাড়ি খুলনায়। খুলনার বিএল কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি বিএনসিসির একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেট। ২০১২ সাল থেকে তিন বছর ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর ও সুন্দরবন রেজিমেন্টে ক্যাডেট করপোরাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছোটবেলায় সাঁতার শেখা ও সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা বাসডুবির ঘটনায় বেঁচে ফিরতে সহায়তা করেছে। এ ছাড়া বাঁচার ইচ্ছা আর সেদিন গামছা এগিয়ে দেওয়া ব্যক্তির সহায়তাও অনেক কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ছোট্ট ছেলে হয়তো পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না। কিন্তু পদ্মায় বাসডুবির পর বাবার কোলে চড়ে সে মাকে পানি থেকে উঠতে দেখেছে। চারপাশে সবার আলোচনা থেকে হয়তো বুঝতে পারছে, বাসে থাকা মা পানিতে পড়ে গিয়েছিল। এতে তার মনে ভয় ঢুকে গেছে।সুমা আক্তার, বাসডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা যাত্রী
সুমা বলেন, ‘বাস যখন ডুবে গেল, সে সময় কোনো অনুভূতি কাজ করছিল না। শুধু বুঝতে পারছিলাম, ভয় পেলে চলবে না, বাঁচতে হবে।’
ঈদে স্বামীর দেওয়া সবুজ–নীলচে ছাপা জামা পরে ঢাকায় ফিরছিলেন সুমা। বাসডুবিতে তাঁর জুতা, ওড়না, ব্যাগ, চশমা, মুঠোফোনসহ সবই পানিতে তলিয়ে যায়। সুমাকে উদ্ধারের পর স্থানীয় মানুষ তাঁকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে পোশাকের ব্যবস্থা করে দেন। এ কারণে সুমা উদ্ধারকারী ও স্থানীয় মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
বাস থেকে সুমার বড় লাগেজটি উদ্ধার করা হয়েছে। পানিতে ব্যাগে থাকা জামা–কাপড় প্রায় সবই নষ্ট হয়ে গেছে। ঈদে ছেলে যে সালামি পেয়েছিল, তা দিয়ে কেনা একটি স্টিলের প্লেট ও গ্লাস ব্যাগ থেকে বের করে তিনি স্মৃতিস্বরূপ রেখে দিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, যাতে উদ্ধারকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
সুমার পোস্ট করা ওই ভিডিওতে মোহাম্মদ মামুন শেখ নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করে জানিয়েছেন, তিনিই সেদিন গামছা এগিয়ে দিয়ে সুমাকে পন্টুনে তুলেছিলেন।
পরে মুঠোফোনে কথা হয় মোহাম্মদ মামুন শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, ৩ নম্বর ফেরিঘাটে তাঁর বাড়ি। তিনি মাটি কাটার কাজ করেন। ঘটনার সময় নদীতে গোসল করতে গিয়েছিলেন। গোসল শেষে দেখেন, একটি বাস নদীতে ডুবে গেল। পন্টুন থেকে লক্ষ করেন, একজন নারী (সুমা) ভেসে উঠেছেন। তখন তিনি দৌড়ে গিয়ে তাঁকে উদ্ধারের জন্য গামছা এগিয়ে দিয়েছিলেন।
সুমার স্বামী শাহরুখ ইসলাম পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যাটালিয়নে (এসপিবিএন) উপপরিদর্শক। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে থাকেন। ঈদে রাজবাড়ীর পাংশায় বাড়ি গিয়েছিলেন তাঁরা। ঘটনার দিন ঈদের ছুটি শেষে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন।
মামুন শেখ বলেন, পন্টুন এবং পরে নৌকায় দাঁড়িয়ে পানিতে ভেসে ওঠা মোট ছয়জনকে তিনি টেনে তুলেছিলেন। ফেসবুকে সুমার পোস্ট করা ভিডিওটি দেখে তাঁকে চিনতে পেরেছেন। সেই পোস্টে তিনি মন্তব্য করলে সুমা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
মামুন শেখ আরও বলেন, সেদিন তাঁর সঙ্গে অন্যরাও হাত মিলিয়েছেন। কয়েকজনকে হলেও তিনি সাহায্য করতে পেরেছেন ভেবে তাঁর খুব ভালো লেগেছে।
মানসিক ট্রমা
দুর্ঘটনায় বেঁচে ফিরলেও ভীষণ ট্রমায় আছে সন্তানসহ সুমার পরিবার। তিনি বলেন, ফেসবুকে বাসডুবির ওই ঘটনার ভিডিও–রিলসে ভরে গেছে। এসব দেখার সময় ছেলে কাছে থাকলে সেই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা মনে পড়ে কুঁকড়ে যায়। তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর জন্য পার্কে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া বা অন্যভাবে ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে।
স্বামী শাহরুখও ঘটনার পর থেকে ট্রমার মধ্যে আছেন জানিয়ে সুমা বলেন, তিনি এ নিয়ে কারও সঙ্গেই কথা বলছেন না। তাঁর নিজেরও সেই দিনের পর থেকে দিন–তারিখ মনে থাকছে না। এ ছাড়া প্রথমে ভেবেছিলেন, তাঁর তেমন কিছু হয়নি। কিন্তু এখন দেখেন, জানালা দিয়ে বের হওয়ায় তাঁর সারা শরীরেই জখম হয়েছে।
আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি। আমার স্বামী-সন্তান বেঁচে আছে। বাসের কত মানুষ মরে গেল! ঠিক করেছি, আমরা আর কোনো দিন বাসে উঠব না। এই ট্রমা থেকে বের হতে অনেক সময় লাগবে।সুমা আক্তার, বাসডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা যাত্রী
রমজান মাসে দেখা একটি স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে সুমা বলেন, স্বপ্নে একটি বড় নদীর সেতু থেকে তাঁর স্বামীর হাত ধরে থাকা ছেলে পানিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। ছেলেকে বাঁচাতে পেরেছিলেন কি না, তা আর মনে নেই তাঁর। তবে ঘুম থেকে জেগে স্বপ্নটিকে খুব বাস্তব মনে হচ্ছিল।
সুমা বলেন, ‘বাস্তবেই যখন পানিতে ডুবে গেলাম, তখন আর আমার কোনো অনুভূতি কাজ করছিল না। এটাকেই স্বপ্ন মনে হতে থাকে। বাসে থাকা বাচ্চাদের চিৎকারের কথা মনে হলে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। তখন কান্নাকাটি করি।’
সুমার যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তখন একবার এক হোটেলের চারতলার কার্নিশে আটকে পড়েছিলেন বলে বড়দের কাছে গল্প শুনেছিলেন। তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০১১ সালে খুলনায় নিজের কলেজের সামনে তেলের লরির সঙ্গে বড় আরেকটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। সেই ট্রমা থেকে বের হতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল। আর এবার বাসডুবি থেকে বেঁচে ফিরলেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি। আমার স্বামী-সন্তান বেঁচে আছে। বাসের কত মানুষ মরে গেল! ঠিক করেছি, আমরা আর কোনো দিন বাসে উঠব না। এই ট্রমা থেকে বের হতে অনেক সময় লাগবে।’