ফুটফুটে ফাতেমা নেই, এবার খাদিজাকে নিয়ে মা–বাবার ছোটাছুটি 

ফাতেমা মারা গেছে। শিশু খাদিজা ভর্তি আছে নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে।

সাত মাস বয়সী যমজ বোন খাদিজা ও ফাতেমা (ডানে)। গত ২৩ এপ্রিল হামে আক্রান্ত হয়ে ফাতেমার মৃত্যু হয়েছে। খাদিজা এখন চিকিৎসাধীন নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালেছবি: পরিবারের সৌজন্যে

হামে আক্রান্ত যমজ মেয়েকে নিয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে ছুটেছেন হাসপাতালে। দুই মেয়ের একজন ফাতেমা মারা গেছে গত ২৩ এপ্রিল। আরেক মেয়ে খাদিজার অবস্থার উন্নতি হওয়ায় বাসায় নিয়েছিলেন। তবে জটিলতা দেখা দেওয়ায় তাঁকে নিয়ে আবার হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটছেন শিশুটির পরিবারের সদস্যরা।

বর্তমানে খাদিজা ভর্তি আছে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে। এ হাসপাতালে নেওয়ার আগে ভর্তি করা হয়েছিল মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফাতেমা ও খাদিজাকে নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। এক মেয়ে মারা যাওয়ার পর থেকেই আরেক মেয়েকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন পার হচ্ছে পরিবারটির।

বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ফাতেমার। তবে খাদিজা হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফিরেছিল। বাড়িতে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ ছিল না শিশুটি। জ্বর-কাশিসহ অন্যান্য জটিলতা ছিল। তাই এখন তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খাদিজা
ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

নবজাতক হাসপাতালে গত শুক্রবার রাত তিনটার দিকে নেওয়া হয় সাড়ে সাত মাসের খাদিজাকে। গতকাল শনিবার খাদিজার মা সায়মা বেগম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার একটা বাবু মারা গেছে। ডাক্তারেরা বলছেন, আর রিস্ক (ঝুঁকি) নেওন যাইব না। ভালো চিকিৎসা লাগব।’

সায়মা জানান, খাদিজার জ্বর-কাশি-শ্বাসকষ্ট আছে। সাপোজিটরি দিলে জ্বর কমে। আবার জ্বর ওঠে। তবে এখন আপাতত অক্সিজেন দিতে হচ্ছে না। অল্প করে বুকের দুধ খাওয়াতে বলেছেন চিকিৎসকেরা। অন্যান্য পরীক্ষা–নিরীক্ষা চলছে।

প্রতিবেদকের সঙ্গে ভিডিও কলে খাদিজা

‘শরীর নীল হইয়া যায়’

৫ মে প্রথম আলোতে ‘হামে আক্রান্ত যমজ শিশুর লড়াই, শেষ পর্যন্ত হেরে গেল ফাতেমা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন মা সায়মা বলেছিলেন, ‘কল্পনাও করি নাই, ফাতেমা মইরা যাইব। হাসপাতালেও হাসি দিছে। খেলনা দিয়া খেলছে।’

১ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি ছিল খাদিজা। হাসপাতালের নথিতে খাদিজার হাম ও নিউমোনিয়ার কথা লেখা ছিল।

সায়মা বেগম বলেন, হাসপাতালের বিছানায় বসিয়ে দিলে খাদিজা কিছুক্ষণ বসে খেলে। ডাকলে একটু হাসে। তবে মেয়েকে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন, তা জোর দিয়ে বলতে পারছেন না এই মা। সায়মা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ফাতেমার মতোই খাদিজার শরীর ঠান্ডা হইয়া যায়, শরীর নীল হইয়া যায়।’

বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটির হাম–পরবর্তী নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি খুব একটা খারাপ হয়নি। মনে হচ্ছে যথাযথ চিকিৎসায় শিশুটি বেঁচে যাবে।

এপ্রিলের শুরুতে এক সঙ্গেই জ্বর, ঠান্ডা আর কাশি নিয়ে ফাতেমা ও খাদিজাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খাদিজারই অবস্থা প্রথমে খারাপ হয়েছিল। অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সে তুলনায় ফাতেমা ভালো ছিল। তবে পরে ফাতেমাই মারা যায়। ওদের প্রথমে নবজাতক হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। পরে তাদের নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে আসেন মা সায়মা, নানি সোনিয়া আক্তার ও বাবা মোজাম্মেল হক।

তখন ঘুরেছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে। কোনো হাসপাতালে বলা হয় শয্যা নেই, আরেক হাসপাতালে অক্সিজেন নেই, কোথাও আবার পিআইসিইউ দরকার—কিন্তু সেটি খালি নেই।

জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা

ফাতেমার অবস্থা খারাপ হলে তখন খাদিজার শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো থাকায় তার ছুটি হয়েছিল হাসপাতাল থেকে। তখন সায়মার বড় মেয়ে তিন বছর বয়সী আয়েশাকেও হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। জ্বর হলেই খিঁচুনি হয় তার। তখন সায়মা বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তিনজনকে নিয়ে লড়াই করেছেন। আয়েশাকে বাড়িতে দেখার কেউ নেই বলে হাসপাতালে খাদিজার পাশেই ওকে রাখতে হয়েছে। আয়েশারও ঠান্ডা-কাশি লেগেই আছে।

মা সায়মা জানান, শুধু ফাতেমার চিকিৎসাতেই তখন এক লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছিল। তিন মেয়ের হিসাব করলে সংখ্যাটি আরও বেশি হবে। এবার আবার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে খাদিজাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যাওয়া, অ্যাম্বুলেন্সভাড়া, পরীক্ষার খরচ—সব মিলে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলেও তা খরচের তুলনায় খুব বেশি নয়। নবজাতক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কিছু ছাড় দিচ্ছে।

খাদিজার বাবা মোজাম্মেল হক স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে তিনি ইমামতি করতে পারছেন না। চাকরি নিয়েও একধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে জানান সায়মা।

সায়মা বলেন, তাঁর নিজের শারীরিক অবস্থাও খারাপ। শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। খাদিজাকে বেশিক্ষণ কোলেও নিতে পারেন না। এখন মেয়ের রিপোর্টগুলো যাতে ভালো আসে সে দোয়া চাইলেন সবার কাছে। এই মায়ের এখন একটাই চাওয়া, খাদিজাকে হাসিমুখে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে চান।

হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু

হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও দুই শিশু মারা গেছে। নতুন করে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ৯৬১টি শিশুর। এ ছাড়া ১০৮টি শিশুর হাম শনাক্তের হয়েছে।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত শুক্রবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা) হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া দুই শিশু সিলেটের। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৩৭৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭৪ শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৬ হাজার ৫৭২ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪১ হাজার ২৮ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৩৬ হাজার ৬৪৫ শিশু বাড়ি ফিরেছে। হাম শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৫২৪ শিশুর।