হামে আক্রান্ত যমজ শিশুর লড়াই, শেষ পর্যন্ত হেরে গেল ফাতেমা

সাত মাস বয়সী যমজ বোন খাদিজা ও ফাতেমা (হাসিমুখে)ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলছিলেন শাহানা বেগম। কোলে যমজ দুই শিশু—খাদিজা আর ফাতেমা। সঙ্গে ছিল অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর এক মায়ের টানা উদ্বেগ। সাত মাস বয়সী দুই মেয়েকে সুস্থ করে ঘরে ফেরানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর।

কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। হাম-পরবর্তী জটিলতায় থেমে গেছে ফাতেমার হাসি। গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। যমজ বোন খাদিজা বেঁচে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ নয়। জ্বর-কাশির সঙ্গে লড়াই করছে এখনো। তাই এক মেয়েকে হারিয়ে আরেক মেয়েকে নিয়ে শঙ্কা কাটছে না মায়ের।

যমজ মেয়ে খাদিজা ও ফাতেমার মা শাহানা বেগম গতকাল সোমবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কল্পনাও করি নাই, ফাতেমা মইরা যাইব। হাসপাতালেও হাসি দিছে। খেলনা দিয়া খেলছে।’

খাদিজার অক্সিজেন লাগবে, তাই শেষমেশ তাকে ভর্তি করতে চাইলেও ফাতেমাকে ভর্তিই করতে চাননি চিকিৎসকেরা। অনেক অনুরোধে দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও এক দিন পরেই ফাতেমাকে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। তখন শুরু হয় নতুন দুশ্চিন্তা—একজন হাসপাতালে, আরেকজন বাড়িতে। কে কাকে দেখবে?

হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শুরু। জ্বর, ঠান্ডা আর কাশি নিয়ে একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ে খাদিজা ও ফাতেমা। প্রথমে নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়। পরে তাদের নিয়ে ঢাকায় আসেন মা শাহানা, নানি সোনিয়া আক্তার ও বাবা মোজাম্মেল হক।

কল্পনাও করি নাই, ফাতেমা মইরা যাইব। হাসপাতালেও হাসি দিছে। খেলনা দিয়া খেলছে।
শাহানা বেগম, যমজ কন্যা খাদিজা ও ফাতেমার মা

প্রথম ধাক্কা আসে ভর্তি নিয়েই। এ জন্য তাঁদের ঘুরতে হয় রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালসহ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে। এক হাসপাতালে বলা হয় সিট নেই, অন্য হাসপাতালে অক্সিজেন নেই, কোথাও আবার শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) দরকার—কিন্তু সেটি খালি নেই। তখন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘুরে পিআইসিইউ খুঁজে বের করতে হয়েছে।

খাদিজার অক্সিজেন লাগবে, তাই শেষমেশ তাকে ভর্তি করতে চাইলেও ফাতেমাকে ভর্তিই করতে চাননি চিকিৎসকেরা। অনেক অনুরোধে দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও এক দিন পরেই ফাতেমাকে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। তখন শুরু হয় নতুন দুশ্চিন্তা—একজন হাসপাতালে, আরেকজন বাড়িতে। কে কাকে দেখবে?

গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুত্যু হয় তার। যমজ বোন খাদিজা বেঁচে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ নয়। জ্বর-কাশির সঙ্গে লড়াই করছে এখনো। তাই এক মেয়েকে হারিয়ে আরেক মেয়েকে নিয়ে শঙ্কা কাটছে না মায়ের।

বাড়িতে ফেরার ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে ফাতেমা। তখন শুরু হয় ভর্তির জন্য নতুন করে ছুটে চলা—এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে একবার হাম ওয়ার্ড, একবার ডেঙ্গু ওয়ার্ড, একেকবার একেক ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয় তাকে। চিকিৎসকেরাও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি—হাম হয়েছে কি হয়নি। এর মধ্যে খাদিজার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। তবে ফাতেমার আর ছুটি হয়নি।

আরও পড়ুন
যমজ সঙ্গী হারানো খাদিজা কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও জ্বর-কাশি এখনো আছে
।ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

তিন সন্তান তিন ওয়ার্ডে—এক মায়ের অসহায়তা

শুধু যমজ দুজনই নয়, একই সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে শাহানার বড় মেয়ে তিন বছর বয়সী আয়েশাও। জ্বর হলেই খিঁচুনি হয় তার।

নিয়ম নেই বলে যমজ হলেও খাদিজা আর ফাতেমাকে হাসপাতালের এক বিছানায় ভর্তি করা হয়নি। একসময় এমন অবস্থাও তৈরি হয়—আয়েশাসহ তিন সন্তান তিন জায়গায় ভর্তি। সন্ধ্যার পর হাসপাতালের ওয়ার্ডে পুরুষ স্বজনদের থাকতে না দেওয়ায় মা ও নানিকেই একা সামলাতে হয়েছে সব। এক শিশুকে কোলে রেখে আরেকজনকে বিছানায় শুইয়ে রেখে ডাকতে হয়েছে নার্স। ওষুধ আনতে দৌড়াতে হয়েছে। এক নার্স যা বলেন, তা করলে আরেকজন এসে বকাবকি করেন—এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে বলে অভিযোগ শাহানার।

শাহানা বেগম বলেন, ‘সিস্টার দিদি’দের কাছে কিছু জানতে চাইলেই ধমক দিতেন। বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও অপমানসূচক কথা শুনিয়েছেন। আর চিকিৎসায় অবহেলা ও গাফিলতি ছিল বলেই মনে করেন এই মা।

আরও পড়ুন

মুছে গেল ফাতেমার হাসি

ফাতেমার চিকিৎসাতেই খরচ হয়েছে এক লাখ টাকার বেশি। পিআইসিইউতে এক দিনের খরচ ৩০ হাজার টাকা—এই বোঝা বইতে গিয়ে শাহানাকে বিক্রি করতে হয়েছে বিয়ের সময়ে পাওয়া সাড়ে তিন আনার সোনার দুল।

শাহানা বলেন, ‘এখন তো এক মেয়ে মইরাই গেল। ফাতেমাকে বিভিন্ন হাসপাতালের আইসিইউ-পিআইসিইউতে বেশি সময় থাকতে হয়েছে। তাই তার চিকিৎসায় বেশি টাকা খরচ হয়েছে।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা ছোট্ট ফাতেমা
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

নানি সোনিয়া আক্তার যতটুকু সম্ভব হিসাব কষে জানালেন, শুধু ফাতেমার পেছনেই খরচ হয়ে গেছে এক লাখ টাকার বেশি। বিপদের সময় হাসপাতালে শয্যা বা পিআইসিইউ পেতে অনাত্মীয় কেউ কেউ সহায়তাও করেছেন বলে উল্লেখ করে তিনি নারী সাংবাদিক সাজিদা ইসলাম পারুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

মসজিদের ইমাম বাবা মোজাম্মেল হক তারাবিহর নামাজ পড়িয়ে পাওয়া টাকা ও বোনাসও খরচ করেছেন মেয়েদের চিকিৎসায়। এরপরও হাসপাতালের বিল দিকে শেষ পর্যন্ত অন্যের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছে। কেউ কেউ সাহায্য করেছেন, আবার কেউ সাহায্যের পর দিয়েছেন খোঁটা।

এসবের মাঝেই ফাতেমা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। শেষে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ফাতেমা। এক মাসের দৌড়ঝাঁপ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাঁদের সঙ্গে ছিল না আর কোনো কান্নাহীন শিশু—ছিল শুধু ছোট্ট একটি লাশ।

আরও পড়ুন

খাদিজাকে নিয়ে নতুন শঙ্কা

ফাতেমা ও খাদিজা অসুস্থ হওয়ার পর এবং অসুস্থ হওয়ার আগের কিছু ছবি প্রথম আলোর কাছে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছেন মা শাহানা বেগম। যমজ মেয়েদের মধ্যে ফাতেমার ছবি কোনটা, তা বোঝানোর জন্য লিখে দিয়েছেন, ‘ছবিতে বেশি হাসছে যে, সে–ই হলো ফাতেমা।’ সেই ফাতেমাই এখন আর নেই।

হাসপাতাল থেকে দেওয়া ফাতেমার মৃত্যুর প্রমাণপত্র
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

যমজদের মধ্যে বড় ছিল খাদিজা। যমজ সঙ্গী হারানো এই শিশু হাম ও নিউমোনিয়া থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও জ্বর-কাশি এখনো আছে। শরীরে হামের মতো নতুন করে র‍্যাশও দেখা যাচ্ছে। তাই এক মেয়ে হারানো মায়ের ভয় যেন কিছুতেই কাটছে না। বাক্য শেষ করার আগেই থেমে যান তিনি—‘ফাতেমার মতো যদি...।’

আরও পড়ুন