উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্য অফিস হলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে: বিআইপি

‘উপজেলা পরিষদে এমপি অফিস: বিকেন্দ্রীকরণ না কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিআইপি। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলামোটরে বিআইপি কনফারেন্স হলেছবি: বিআইপি

উপজেলা পরিষদের ভেতরে সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য ‘পরিদর্শনকক্ষ’ স্থাপনের উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসনে ‘দ্বৈত নেতৃত্ব’ সৃষ্টি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।

সংগঠনটি বলছে, এ ধরনের উদ্যোগ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু স্থানীয় সরকারকে দুর্বল নয় বরং জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলামোটরে বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। ‘উপজেলা পরিষদে এমপি অফিস: বিকেন্দ্রীকরণ না কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ ও নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি করা। অন্যদিকে উপজেলা পরিষদ একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে। এই দুই কাঠামোর মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য অপরিহার্য।

উপজেলা পরিষদের অভ্যন্তরে সংসদ সদস্যদের জন্য অফিস স্থাপন করা হলে এই প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা ধীরে ধীরে ক্ষয় হবে, নজরদারি নিরপেক্ষ না থেকে নিয়ন্ত্রণে রূপ নেবে বলেও মন্তব্য করা হয়।

বিআইপির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংসদ সদস্যদের সরাসরি উপস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বাড়াতে পারে। এতে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও পরিষদের ভূমিকা প্রান্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। ফলে একধরনের ‘দ্বৈত নেতৃত্ব’ সৃষ্টি হবে। যেখানে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা একদিকে, আর কার্যকর ক্ষমতা অন্যদিকে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন, বাস্তবায়ন ও ঠিকাদার নির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বাড়ছে। এতে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ দুর্বল হচ্ছে।

বিআইপির মতে, উপজেলা চেয়ারম্যান সরকারি দলের এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে, যা নাগরিক সেবায় প্রভাব ফেলবে। দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে পড়ে সাধারণ নাগরিক সেবা পেতে বিড়ম্বনার শিকার হতে পারেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান বিরোধী দলের এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য সরকারি দলের হলে পরিদর্শনকক্ষ স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য আরও জটিল রূপ নিতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় মূল প্রবন্ধে।

এতে বলা হয়, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য রাজনৈতিক প্রভাব ও কেন্দ্রীয় সংযোগের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। প্রশাসনও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গেই বেশি সমন্বয় রাখে, ফলে বিরোধীদলীয় চেয়ারম্যানরা কার্যকরভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়েন। এতে উন্নয়নকাজে বিলম্ব, সমন্বয়ের ঘাটতি ও দ্বন্দ্ব বাড়ে, নাগরিক সেবাও ব্যাহত হতে পারে।

বিআইপি জানায়, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্য অফিস স্থাপন সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংগঠনটির মতে, কার্যকর স্থানীয় সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেয়ে পেশাদার পরিকল্পনাবিদের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উন্নয়নের মূল সমস্যা বরাদ্দ বা সমন্বয়ের অভাব নয়, বরং সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ঘাটতি। একজন পরিকল্পনাবিদ থাকলে ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, অবকাঠামো ও নগর-গ্রাম সংযোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনা সম্ভব, যা খণ্ডিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রকল্পের পরিবর্তে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।

বিআইপির সুপারিশ

উপজেলা পরিষদে পরিদর্শনকক্ষ স্থাপন বিষয়ে বিআইপি পাঁচটি সুপারিশ দিয়েছে। এগুলো হলো—সংসদ সদস্যের অফিস থাকতে পারে কিন্তু স্থানীয় সরকারের ভেতরে নয়; প্রয়োজনে সংসদ সদস্যদের জন্য স্বতন্ত্র কনস্টিটুয়েন্সি অফিস (উপজেলা/জেলা পর্যায়ে) স্থাপন করা যেতে পারে, তবে প্রাথমিকভাবে ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা যেতে পারে; স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংসদ সদস্যের সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভূমিকায় না থাকা; সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো তৈরি করা এবং সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট জনসেবা প্ল্যাটফর্ম চালু করা।

এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি শক্তিশালী ও কার্যকর উপজেলা পরিষদ গঠন ও পরিকল্পিত উন্নয়নবিষয়ক ১০টি সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো—দ্রুত স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন; উপজেলা পরিষদকে প্রকৃত স্থানীয় শাসন কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা; পেশাদার পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ; উপজেলা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা; এই পরিকল্পনার আওতায় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী ইমারত নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন; উপজেলা পরিকল্পনাকে জেলা ও জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয়; স্বতন্ত্র বাজেট ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা; কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কমানো, নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রতিবেদন পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটা সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন, সেই কমিটিতে পেশাজীবী ও বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা।

আরও পড়ুন

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কাজগুলো স্থানীয় সরকারের সঙ্গে জড়িত। এগুলো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের কাজ নয়। সংসদ সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে সময় দিয়ে, সারা দিনরাত স্থানীয় সরকারের এসব কাজ পর্যবেক্ষণ করবেন, এটা অবাস্তব প্রক্রিয়া। তবে সংসদ সদস্যরা এই কাজে আগ্রহ প্রকাশ করলে স্থানীয় সরকারে কোনো ভ্যালু যোগ হবে কি না, স্থানীয় সরকারের কাজগুলো বাদে নতুন করে কোনো কাজ করা হবে কি না, সেটি স্পষ্ট করা দরকার।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, উপজেলা পরিষদে পরিদর্শনকক্ষ হলে ৩০০ জন সংসদ সদস্যের জন্য শুধু ৩০০টি কক্ষ তৈরি হবে না, কালক্রমে এসব রুমের সঙ্গে অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ ভবন ব্যস্ত ভবনে পরিণত হলে অন্য অনেক কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় এসব কার্যালয়ের জন্য বিশাল স্থাপনা নির্মাণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভব কি না, তা–ও ভেবে দেখতে হবে।

সংবাদ বিআইপির জ্যেষ্ঠ সদস্য মেহেদী হাসান উপস্থিত ছিলেন।