আবরার হত্যার ৭ বছর আজ, আপিলের শুনানি শুরুর অপেক্ষায় পরিবার

  • ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন।

  • পলাতক রয়েছেন ৪ আসামি।

  • আসামিরা সবাই তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী।

আবরার ফাহাদফাইল ছবি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার সাত বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বুধবার। এ ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হাইকোর্টেও বহাল রয়েছে। তবে আপিল বিভাগে এখনো শুনানি শুরু হয়নি। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও সাজার রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে আবরারের পরিবার।

আবরারের বাবা মো. বরকতউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই মামলাটি যেন আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসে এবং যেন দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা হয়। দ্রুত নিষ্পত্তি করে আসামিদের সাজার রায় কার্যকর চাই।’

একটা ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরারের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। পরদিন সকালে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হত্যায় জড়িত সবাই ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা-কর্মী। ছাত্রলীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে তখন দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

হাইকোর্টের রায় হয়েছে। আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি শুরু হয়নি। বিচারে কিছুটা অগ্রগতি হলেও আশানুরূপ অগ্রগতি এখনো পাইনি। সাত বছর হয়ে গেছে, আর কত দিন?
আবরার ফাইয়াজ, আবরার ফাহাদের ছোট ভাই

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা সব আসামি আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন বলে জানিয়েছেন মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামির আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আসামিপক্ষের অন্যতম জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা আপিল করেছেন। আপিলের সারসংক্ষেপ এখনো জমা হয়নি। আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

আবরারের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বিকেলে বাড়ি থেকে হলে ফিরে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন।

মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করব। যেহেতু আপিলকারী হচ্ছে অভিযুক্ত আসামিরা, সুতরাং মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাটর্নি জেনারেল
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন
ছবি: প্রথম আলোর ই–পেপার থেকে নেওয়া

অভিযোগপত্র ও মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, রাত আটটার পর আসামিরা আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে কয়েক দফায় বেধড়ক মারধর করেন। একপর্যায়ে আবরার বমি করেন। বাঁচার জন্য ইশারা-ইঙ্গিতে আকুতি জানান। রাত আড়াইটার দিকে আসামিরা তাঁকে তোশকে করে একতলা ও দোতলার মাঝের সিঁড়িতে রাখেন। পরে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনেন। চিকিৎসক জানান, আবরার মারা গেছেন।

৭ অক্টোবর আবরারের বাবা মো. বরকতউল্লাহ চকবাজার থানায় মামলা করেন। ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এতে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ছাত্রশিবিরের কর্মী সন্দেহে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, আবরার ফাহাদ শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, শুধু এমন অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেন। শুধু এমন সন্দেহে এ ধরনের নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।
আরও পড়ুন

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায় দেন। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সব আসামির দণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। কারাগারে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পরে আপিল এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা লিভ টু আপিল করেন বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান।

হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতের ২০ আসামিকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ আসামিকে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, আবরার ফাহাদ শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, শুধু এমন অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেন। শুধু এমন সন্দেহে এ ধরনের নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি মুনতাসির আল (জেমি) ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালিয়ে যান।
আরও পড়ুন

কার কী দণ্ড, পলাতক চার

হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামি হলেন মেহেদী হাসান (রাসেল), মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান (রবিন), ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল (জেমি), মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ। তাঁদের মধ্যে শেষ তিনজন বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকে পলাতক।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি মুনতাসির আল (জেমি) ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালিয়ে যান।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।

আরও পড়ুন

আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় হয়েছে। আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি শুরু হয়নি। বিচারে কিছুটা অগ্রগতি হলেও আশানুরূপ অগ্রগতি এখনো পাইনি। সাত বছর হয়ে গেছে, আর কত দিন?’ আপিল বিভাগে দ্রুত বিচারকাজ শুরু ও রায় কার্যকরের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা ন্যায়বিচার চাই।’

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করব। যেহেতু আপিলকারী হচ্ছে অভিযুক্ত আসামিরা, সুতরাং মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। দ্রুত শুনানির জন্য উদ্যোগ নিতে আমাদের দিক থেকে চেষ্টার কমতি থাকবে না। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো ধরনের মুলতবি চাওয়া হবে না এবং কোনো বিলম্ব ঘটানো হবে না।’