শিল্পের স্পর্শে জাতির মানসকে রাঙিয়ে তোলার পথিকৃৎ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার
শিল্পের সুষমায় দেশ, জাতি ও সমাজের মন-মানস রাঙিয়ে তোলার একনিষ্ঠ সাধক, বহুমাত্রিক গুণের অনন্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে ফুলেল শ্রদ্ধায় চিরবিদায় জানানো হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। গতকাল সোমবার ৯০ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে। গতকাল রাতে মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছিল। আজ সকাল নয়টায় মরদেহ তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বিটিভি ভবনে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিটিভির মহাপরিচালক মাহবুবুল হকসহ শিল্পী ও কলাকুশলীরা।
এরপর সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ আনা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শুরু হয় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নিয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে। এরপর বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেকে শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের ফাঁকে ফাঁকে শিল্প-সংস্কৃতি ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেরা মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানের প্রতি আলোকপাত করেন। বরেণ্য শিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক হাশেম খান বলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সৃজনশীল মানুষ। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর এই প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল।
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, তাঁর মতো বহুমাত্রিক শিল্পস্রষ্টা দেশে আর নেই। ঐতিহ্যবাহী পাপেটকে তিনি পুনর্জন্ম দিয়েছেন। টিভি নাটককে তিনি উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। বিশেষত শিশুতোষ অনুষ্ঠানে তাঁর জুড়ি ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, শিল্পের স্পর্শে জাতির মানসকে রাঙিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। সমাজকে আলোকিত করতে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। দেশবাসীর মন ও মননে তাঁর অবদান খোদিত হয়ে থাকবে।
বরেণ্য এই শিল্পী সম্পর্কে নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, শিল্প ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে তিনি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না বটে; কিন্তু ছিলেন জীবনের শিক্ষক। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস তাঁকে ছাড়া অপূর্ণ থেকে যাবে।
বিশিষ্ট নাট্যকার ও অভিনয় শিল্পী মামুনুর রশীদ বলেন, শিল্পী হিসেবে তিনি বড় ছিলেন নিঃসন্দেহে; কিন্তু অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। টেলিভিশনের নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্তের শিল্পরুচি উন্নত করেছিলেন তিনি।
বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, চারুকলার শিক্ষক হিসেবে তিনি খুব বেশি দিন কাজ করেননি; কিন্তু প্রথম থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন প্রথম থেকেই। শিল্পের অনেক মাধ্যমে কাজ করেছেন। পাপেটসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।
গুণী এই শিল্পী সম্পর্কে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন শিবিরে ঘুরে ঘুরে পাপেট শো করে তাঁদের উজ্জীবিত করতেন। পরে দেশে সাংস্কৃতিক চর্চার যে ব্যাপ্তি ঘটিয়েছিলেন, তা অনন্য। তিনি আমাদের আরও অনেক কিছু দিতে পারতেন।’
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আরও অনেকে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শিল্পী কেরামত মওলা, তারিক আনাম খান, শহীদুজ্জামান সেলিম, সংগীতশিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রমুখ।
পরিবারের পক্ষে শিল্পীর ছেলে সাদাত মনোয়ার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করতে অনুরোধ করেন।
এরপর ছায়ানট ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার শিল্পীদের পরিবেশনায় মুস্তাফা মনোয়ারের প্রিয় গান ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ পরিবেশন এবং এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।
শোকমঞ্চ থেকে শিল্পীর মরদেহ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এনে আচ্ছাদিত করা হয় জাতীয় পতাকায়। রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) শেখ আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার মো. আশরাফুল ইসলামের পরিচালনায় পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়।
শহীদ মিনারে যেসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, সেগুলোর মধ্যে ছিল বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার, গ্রাম থিয়েটার ফেডারেশন, প্রাচ্যনাট, নাগরিক নাট্যাঙ্গন, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উভয় অংশ, মাল্টিমিডিয়া পাপেট থিয়েটার, চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী, নজরুলসংগীত সংস্থা, নৃত্যাঞ্চল, কণ্ঠশীলন, কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, ডিরেক্টরর্স গিল্ড, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, গ্রিন ভয়েস, চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি, বঙ্গ রঙ্গ নাট্যদল, পাঠশালা সাউথ এশিয়া মিডিয়া ইনস্টিটিউট, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, আবদুল্লাহ আল মামুন থিয়েটার স্কুল, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, গণতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি আন্দোলন। এই পর্ব পরিচালনা করেন মানজার চৌধুরী।
শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। বাদ জোহর এখানে দ্বিতীয় জানাজার পর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষবারের মতো আনা হয় তাঁর প্রথম কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে। এখানে অনুষদ ও বিভিন্ন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, কসমস ফাউন্ডেশন, স্টুডিও ৪৮সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এবং শিল্পীরা ব্যক্তিগতভাবেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে কফিন।
এরপর বেলা সাড়ে তিনটায় বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় আজীবন শিল্পের নিবেদিত এই সাধককে।