সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান
দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা
সড়ক দুর্ঘটনায় নিয়মিত মানুষ মরছে। স্বজন হারাচ্ছে পরিবারগুলো। দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। দুর্ঘটনা বাড়ছে কেন এবং কমাতে করণীয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার হোসেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: বাংলাদেশের সড়ক ত্রুটিপূর্ণ এবং সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করে। চালকের দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে কথা হয়? এটা কী ব্যর্থতা নয়? এর দায় কার ওপর বর্তায়?
মো. হাদিউজ্জামান: চালকের লাইসেন্স ও যানবাহনের নিবন্ধন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তারা জানে যে চালকের চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। তারা এটা জেনেও চালক তৈরি না করে যানবাহন নিবন্ধন দিচ্ছে কোন বিবেচনায়? দেশে ভারী যানবাহন আছে সাড়ে তিন লাখ। আর চালক আছেন আড়াই লাখ। দেশে পেশাদার চালক হন ‘ওস্তাদের’ (মূল চালক) সেবা করে। আবার সেই চালকেরও সংকট। উৎসবে ছুটির সময় অনেক চালক টানা ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রাস্তায় থাকেন। তাঁদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নিয়োগপত্র ও বেতন ঠিক নেই। ক্লান্তি-চাপে তাঁরা ঝুঁকিকে ঝুঁকি মনে করেন না। এ জন্যই যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ে। এর দায় বিআরটিএ এড়াতে পারে না।
আর আমাদের দেশের মহাসড়কের কোনোটাই প্রকৃত মহাসড়ক নয়। এগুলো বিপুল টাকা খরচ করে মোটাতাজা করা হয়েছে। গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়নি। এ জন্য মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। উচ্চগতি আর ধীরগতির যান একসঙ্গে চলে। মহাসড়ক ঘিরে শত শত বাজার গড়ে উঠেছে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: জাতিসংঘের কাছে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে কার্যকর কোনো কার্যক্রম কি দেখছেন আপনি?
হাদিউজ্জামান: কাগজে-কলমে অনেক কর্মসূচি আছে। সড়ক নিরাপদ করতে প্রধানমন্ত্রীর ছয় দফা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৭ দফা, বিআরটিএর ১১১ দফা আছে। দেশে সড়ক আইন, নীতি, সিদ্ধান্ত অনেক হয়েছে। এখন দরকার বাস্তবায়ন। কদিন পরপর নতুন নতুন সিদ্ধান্ত দেয় সরকার। এর অর্থ হচ্ছে আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এর জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না। এমনটা হলে তো কেউ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে না।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: সড়ক দুর্ঘটনা কমবেশি সব দেশেই হয়। সুইডেন, সিঙ্গাপুরসহ কিছু দেশ দুর্ঘটনা কমিয়ে এনেছে। তারা কীভাবে কমিয়েছে?
হাদিউজ্জামান: শুধু উন্নত দেশ নয়, ভারতের হরিয়ানা রাজ্যও দুর্ঘটনা কমিয়ে এনেছে। এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হয়, চাপের ঊর্ধ্বে থেকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হয়। বাংলাদেশে মহাসড়ক থেকে নছিমন, করিমন, ভটভটি তোলা যাচ্ছে না। কারণ, এর সঙ্গে রাজনীতি জড়িত আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনীতি নয়, বিজ্ঞানকে প্রাধান্য দিতে হবে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তিনবার রাস্তায় নেমেছে। ভুক্তভোগী, নাগরিক সমাজ সোচ্চার। কাজ হচ্ছে না কেন?
হাদিউজ্জামান: সমস্যা সব আমাদের জানা আছে। এখন সমাধানে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করাই মূল বিষয়। কাউকে না কাউকে দায়িত্বটা নিতে হবে। শুধু কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে টোটকা সমাধান দিয়ে সড়ক নিরাপদ হয় না। দেশে সবার আগ্রহ প্রকল্পে। কারণ, এতে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে। পথচারী ও চালকদের সচেতন ও প্রশিক্ষিত করার দিকে মনোযোগ কম।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: আপনার কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কোন বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি, আপনি কী বলবেন?
হাদিউজ্জামান: আমি রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা বলব। এটাই বেশি জরুরি। এর জন্য কোনো টাকা লাগবে না।