প্রথম আলোতে হামলার চার মাস
৩৮ জন গ্রেপ্তার, হামলাকারীদের অনেকে এখনো শনাক্ত হয়নি
হামলার সময়ের ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ।
প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী সংস্থা বলছে, হামলার সময়ের ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া লাইভ ভিডিও পর্যালোচনা করে এঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ও সরাসরি হামলাকারী অন্যদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা চালায় উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠী। তারা ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। একই রাতে তারা হামলা চালায় দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয় ও ছায়ানট ভবনে। প্রথম আলোতে হামলাকারীদের একটি অংশ পরে ডেইলি স্টার ভবনে হামলায়ও যোগ দেয় বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
শনাক্ত ও গ্রেপ্তার যাঁরা
গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ২৬ জনকে প্রথম আলোর মামলায় ও ১১ জনকে প্রথমে ডেইলি স্টার ভবনে হামলা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ডেইলি স্টার–এর মামলার ১১ জনসহ কারাগারে থাকা মোট ১২ জনকে আদালতের মাধ্যমে প্রথম আলোর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. সাইদুর রহমান, মো. মাইনুল ইসলাম, মো. কারী মুয়াজ বীন আবদুর রহমান, নাইম ইসলাম, মো. সাগর ইসলাম, মো. জাহাঙ্গীর, মো. সোহেল মিয়া, মো. হাসান, মো. আবদুল বারেক শেখ, আবুল কাশেম, মো. প্রান্ত সিকদার, মো. রাজু আহম্মেদ, নিয়াজ মাহমুদ ফারহান, মো. আমিনুল ইসলাম, আজাহার আলী, মো. হাসেম, মো. সোহেল রানা, মো. শফিকুল ইসলাম, নাজমুল হাসান, রিয়াজুল ইসলাম সুমন, মো. ইয়াসিন, মোহাম্মদ রাসেল, মো. নজরুল ইসলাম মিনহাজ, মো. রাশেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন শান্ত, মো. বিপ্লব, মো. আহাদ শেখ, মো. রুবেল হোসেন, জুলফিকার আলী সৌরভ, মো. আলমাস আলী, মো. জুবায়ের হোসেন, আয়নুল হক কাশেমী, আবদুর রহমান পলাশ, মো. জান্নাতুল নাঈম, মো. ফয়সাল আহম্মেদ, মো. আজমীর হোসেন আকাশ ও মো. স্বপন মণ্ডল।
এঁদের বাইরে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় ২৩ ডিসেম্বর থেকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক অবস্থায় কারাগারে থাকা আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকে ৩ এপ্রিল প্রথম আলোতে হামলা মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে শাহবাগে জমায়েত ও উসকানির অভিযোগ রয়েছে।
গ্রেপ্তার আসামিদের একজন মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম, যিনি এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রথম আলোতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চলাকালে জ্বলন্ত ভবনের সামনে কুড়াল হাতে উল্লাস করছিলেন। তাঁকে ২৩ ডিসেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাঁর গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ইসলাবাড়ি গ্রামে। থাকেন ঢাকার উত্তরায়।
আরেক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলার সময় ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ঘোষণা দিচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি বলছিলেন, ‘যেটা ৫ আগস্ট করার কথা ছিল, আমরা পারিনি। আজকে সেটা করেছি হাদি ভাইয়ের উসিলায়।’ পরে ডিবি তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে। তাঁর নাম কারী মুয়াজ বিন আবদুর রহমান। পুলিশ জানায়, তিনি যুব মজলিসের শরীয়তপুর জেলা শাখার নেতা। শরীয়তপুর সদর থানার পশ্চিম কান্দি গ্রামে তাঁর বাড়ি।
ঘটনাস্থল থেকে প্রথম আলো ভবনে হামলার ছবি ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে হামলায় যোগ দিতে অন্যদের আহ্বান জানান—এমন একজন নিয়াজ মাহমুদ ফারহানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়।
জাকির হোসেন শান্ত নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিটিটিসি। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মশাখালীর চকপাত্রা গ্রামে। থাকেন ঢাকার হাজারীবাগে। সিটিটিসি–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শান্ত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। তিনি ঘটনাস্থল থেকে লাইভ ভিডিও করে সেটা নিজের ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ারও করেছেন।
জামিন পেয়েছেন যাঁরা
গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে জামিন পেয়েছেন ১০ জন। তাঁরা হলেন নাজমুল হাসান, রিয়াজুল ইসলাম সুমন, মো. ইয়াসিন, মোহাম্মদ রাসেল, মো. নজরুল ইসলাম মিনহাজ, মো. রাশেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন শান্ত, মো. বিপ্লব, মো. আহাদ শেখ ও মো. রুবেল হোসেন।
এঁদের মধ্যে ছয়জনের জামিন করিয়েছেন বলে দাবি করে ২৪ এপ্রিল ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন আলতাফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে কোন ছয়জনের জামিন করিয়েছেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করেননি তিনি। ওই পোস্টে গ্রেপ্তার থাকা আরও চারজনের মামলাও দেখছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে আতাউর রহমান বিক্রমপুরীও রয়েছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার আসামিদের মুক্তির দাবিতে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন কারাগারের সামনে বিক্ষোভ ও ‘মব’ করার চেষ্টা হয়েছিল বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলনের ব্যানারে। এই ফেসবুক পেজে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচারও দেখা গেছে।
পরিচয় শনাক্ত হয়নি অনেকের
অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা
মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র বলছে, হামলার সময় ঘটনাস্থলে থাকা আরও অনেক ব্যক্তির পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের কেউ কেউ সরাসরি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছিল। আবার কেউ কেউ হামলাকারীদের সঙ্গে অবস্থান, স্লোগান, উত্তেজনা সৃষ্টি ও অগ্নিসংযোগের সময় আশপাশে সক্রিয় ছিল।
মামলার তত্ত্বাবধানে থাকা ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত চলমান। ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও ঘটনাস্থলের বিভিন্ন স্থিরচিত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের এবং পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।