বাণিজ্যচুক্তির বাস্তবায়নসহ আরও যেসব বিষয়ে জোর দিয়ে গেলেন পল কাপুর

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। ৪ মার্চ, ২০২৬ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর প্রথম বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকা–ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশের নাগরিকদের দ্রুত ফেরানোর বার্তা দিয়ে গেছেন তিনি।

গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকায় দীর্ঘদিনের শাসক দল আওয়ামী লীগের বিদায়ের কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে রিপাবলিকানরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণ করার পর সরকারি দায়িত্বে পরিবর্তনের ঢেউয়ে এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর জায়গায় বসেন পল কাপুর। গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম ঢাকা সফর ঘিরে তাই কৌতূহল ছিল বেশি।

৩ মার্চ থেকে তিন দিনের এই সফরে পল কাপুর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ সরকারের মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি ঢাকা এসেছিলেন দিল্লি ঘুরে। সংগত কারণেই নির্বাচন পরবর্তী ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের মনোভাবের প্রসঙ্গ বাংলাদেশের আলোচনায় এসেছে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক মহলগুলোতে যোগাযোগ করে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গঠনমূলক থাকুক, এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা। ওয়াশিংটনের এই বার্তা পল কাপুর দুই দেশেই দিয়ে গেছেন।

পল কাপুর বলেছেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও চুক্তি বলবৎ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিধিবিধান অনুযায়ী শুল্ক ও বাণিজ্যের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেকগুলো বিকল্প সুযোগ আছে। তাই চুক্তিটি বহাল আছে। এখন বাংলাদেশ যেন যথাযথভাবে দ্রুত তা কার্যকর করে।

‘বাণিজ্যচুক্তি বহাল রয়েছে’

পল কাপুরের এই সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের করা বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন ঘিরে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এই শুল্ক কমানোর দর–কষাকষির ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে করা ওই চুক্তি নিয়ে এর মধ্যে সংশয় তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত এর মধ্যে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বাতিল করে দেওয়ার কারণে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় আসার পর বাংলাদেশে সরকারি পর্যায় থেকে নানা বক্তব্য দেওয়া হয়। এসব বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নজরে এসেছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ওই চুক্তি কার্যকর কি না, এমন প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ঢাকা সফরে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে গেছেন পল কাপুর। তিনি বলেছেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও চুক্তি বলবৎ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিধিবিধান অনুযায়ী শুল্ক ও বাণিজ্যের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেকগুলো বিকল্প সুযোগ আছে। তাই চুক্তিটি বহাল আছে। এখন বাংলাদেশ যেন যথাযথভাবে দ্রুত তা কার্যকর করে।  

দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলোতে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে যে চুক্তিটি পর্যালোচনার সুযোগ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। যদিও সংসদ ছাড়া এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা যাবে না। সংসদে চুক্তির পর্যালোচনা, প্রশ্ন উত্থাপন এবং মতামত দিতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এটি নির্বিঘ্নে পাস হোক।

দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি বোয়িং কেনা, দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনা, তৈরি পোশাক উৎপাদন করে বিনা শুল্কে সুবিধা নিতে তুলা আমাদনি এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গম, সয়াবিন কেনার বিষয়গুলো রয়েছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।

অবৈধ অভিবাসন

অবৈধ অভিবাসন বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ গুরুত্ব থাকবে বলে বার্তা দিয়ে গেছেন পল কাপুর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির ধারাবাহিকতায় বৈধ কাগজপত্রের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশের নাগরিকদের ফেরানোর প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন তিনি।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র থেকে লোকজনের তালিকা পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর লোকজনকে দেশে ফেরত আনে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে, সে দেশের আদালতে মামলা নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গেই যেন লোকজনকে ফিরিয়ে আনা হয়। এ ক্ষেত্রে সময় নেওয়া যাবে না।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ এসব লোকজনকে ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সম্মত হয়েছে। তবে যেসব লোককে ফেরত আনা হবে, তা যেন নিয়মতান্ত্রিক হয় এবং তাঁদের মর্যাদাহানি না হয়, সে বিষয়ে আশ্বাস চেয়েছে বাংলাদেশ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন পর্যন্ত যেসব লোককে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাঁদের কাউকে কাউকে হাতে-পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় সামরিক বিমানে করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাতে চায়। এখন পর্যন্ত ৩২৭ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে।

ভারত প্রসঙ্গ

পল কাপুরের সফরের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া ব্যুরো তাদের এক্স হ্যান্ডলারে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি, অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতা গভীরতর করার বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, পল কাপুরের সফরে ঢাকায় সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয়টি উঠে আসে। এই প্রেক্ষাপটে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের বিষয়টিও আসে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ইতিবাচকভাবে যুক্ত হতে চায়, ঢাকায় এই বার্তা দিয়েছেন পল কাপুর। বিশেষ করে দিল্লি সফরের সময় ভারতের এমন অবস্থানের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। বাংলাদেশকে প্রাধান্য দিয়ে পারস্পরিক মর্যাদা ও স্বার্থ সমুন্নত রেখে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় ঢাকা, এমন অবস্থানের কথাও জেনে গেছেন পল কাপুর।