জ্বালানির দাম ও সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। আজ বুধবার ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলনকক্ষেছবি: বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের উচ্চমূল্য বাজারে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ জন্য নীতি সুদহার আগের মতো রেখেই প্রথম ত্রৈমাসিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রৈমাসিক এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। এ সময় ডেপুটি গভর্নর সরোয়ার হোসেন, আনিছুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আগের মতোই সাড়ে ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সাড়ে ৭ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এসএলএফের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংককে এক দিনের জন্য টাকা ধার দেয়। আর এসডিএফের মাধ্যমে বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য তুলে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

দুচিন্তায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চলতি বছরের জুনে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। সেটি কিছুটা কমে আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মূল্যস্ফীতি কমেছে মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমে আসায়। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি পাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। কারণ, বাজারে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এটি বাজারের স্থায়ী বা অন্তর্নিহিত মূল্যস্ফীতির চাপকে নির্দেশ করছে, যা সহজে নামছে না।

শুধু ঋণ দিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যাবে না। এ জন্য জ্বালানি ও অবকাঠামো–সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে স্বস্তি দিতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
হাবিবুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতির প্রধান ঝুঁকি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে, তবে এই কমার গতি বা প্রক্রিয়া অনিশ্চিত বরং মূল্যস্ফীতিকে আবার উসকে দিতে পারে, এমন বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য বিঘ্ন হলে তা সরাসরি আমদানিতে আঘাত হানবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও সারের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা দেশের ভেতরের বাজারকেও উত্তপ্ত করবে। দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় একযোগে বেড়ে গেছে। এ ছাড়া নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া রাজস্ব খাতের ওপর চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো বাজারে টেকসই মূল্যহ্রাসের পর্যাপ্ত প্রমাণ দেয় না। তাই এ সময়ে মুদ্রানীতি শিথিল বা নীতি সুদহার কমানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া নীতি সুদহার কমানো হলে তা মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ কারণে মুদ্রানীতিতে আগের মতোই সংকোচনশীল ধারা বজায় রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

* মুদ্রানীতিতে আগামী তিন মাসের জন্য এসএলএফ ১১ শতাংশ ও এসডিএফ সাড়ে ৭ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
* বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও সারের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা দেশের ভেতরের বাজারকেও উত্তপ্ত করবে।
* জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া কোনোভাবেই ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারের নমনীয়তা সুশৃঙ্খলভাবে বজায় রাখা হবে, যা আমদানিজনিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হলেও ওই অর্থবছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে শিল্প উৎপাদন দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, জ্বালানি–ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রবৃদ্ধির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি ও সিএমএসএমই খাতের পুনঃ অর্থায়ন প্রকল্প চালু রয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধারকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গটিও উঠে আসে। মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে। এই বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন ও মূলধন পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিনিয়োগের গতি মন্থর। উচ্চ ঝুঁকির কারণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের গতিও বেশ কম। গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। সার্বিক পরিস্থিতিতে তাই বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, দেশের অর্থনীতি দ্রুত নয়, ধীরগতিতে পুনরুদ্ধার হবে।

আসছে ১৮ মাসের পথনকশা

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপ কাজে দেয়নি। সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে এই উদ্যোগ কাজে আসেনি। এ জন্য নতুন করে ১৮ মাসের পথনকশা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা হবে। এতে কীভাবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে ও খেলাপি ঋণ কমবে, তার পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘শুধু ঋণ দিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যাবে না। এ জন্য জ্বালানি ও অবকাঠামো–সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে স্বস্তি দিতে হবে। এ জন্য সরকারের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আশা করছি, দ্রুত সেই পরিবেশ তৈরি হবে।’

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই ব্যাংক থেকে যাঁরা টাকা তুলে নিতে চান, সবাইকে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে আমরা আশাবাদী, ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াবে।’