অর্থমন্ত্রী প্রায় দুই সপ্তাহ পর গত ২০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার কার্যালয়ে এলে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়। কেন নিয়মিত অফিসে আসছেন না—জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অফিসে আসি তো। এই যে আজ এলাম। তা ছাড়া আমার বাসাটাও একটা অফিস।’

এরপর ২৫ অক্টোবর মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে আসেন অর্থমন্ত্রী। মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, এটা হচ্ছে এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে কার্যালয়ে আসা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি দল এখন ঢাকায়। প্রথা অনুযায়ী দলটির সঙ্গে সমাপনী বৈঠক করতে তিনি আগামী ৮ বা ৯ নভেম্বর সচিবালয়ে আসবেন বলে জানা গেছে।

কেবল দুটি বৈঠক করেন অনলাইনে

কোভিড-১৯ শুরু হয় ২০২০ সালের শুরু থেকে। পরিস্থিতির এখন অনেক উন্নতি হয়েছে। অন্য মন্ত্রীরা সশরীর নিয়মিত অফিস করছেন। কেবল আ হ ম মুস্তফা কামাল দুটি বৈঠক করছেন ভার্চ্যুয়ালি (অনলাইন), যা এক বসাতেই অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি তিনি। ক্রয় কমিটির বৈঠকে হাজার কোটি টাকারও কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নেওয়া হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত।

সপ্তাহের প্রতি বুধবার অনুষ্ঠিত হয় এই বৈঠক। বৈঠক শেষে অনলাইনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার একটা রেওয়াজ আছে। সব অর্থমন্ত্রীর মতো আ হ ম মুস্তফা কামাল নিজেও এত দিন তা করে আসছিলেন। কিন্তু ইদানীং তিনি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি কথা বলার দায়িত্ব দিচ্ছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। ক্রয় কমিটির ১৯ অক্টোবরের সভাসহ আগের তিনটিই হয়েছে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে। কিন্তু একবারও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি তিনি।

এখনো কেন অনলাইনে বৈঠক করছেন এবং বৈঠক করতে পারলেও ব্রিফিং করতে অসুবিধা কোথায়—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অনলাইনে বৈঠকই ভালো। এতে সময় বাঁচে। বৈঠক শেষে ব্রিফিং আর করতে চাই না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ১০-১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায়ও যাননি অর্থমন্ত্রী। দেশে এমন ঘটনা এর আগে আর কোনো অর্থমন্ত্রীর আমলে ঘটেনি বলে জানা গেছে। সভায় বিশ্বের প্রায় সব দেশের অর্থমন্ত্রীই যোগ দিয়ে থাকেন। অর্থমন্ত্রীর বদলে এতে এবার নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘ফিলিপাইনের ম্যানিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সদর দপ্তরে গিয়ে বৈঠক করে এলাম। তাই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে নেতৃত্ব দিতে দায়িত্ব দিলাম গভর্নরকে। চিন্তা করলাম, এতে আমার না গেলেও কোনো অসুবিধা হবে না।’ তিনি এ নিয়ে আরও বলেন, ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তা ছাড়া বিশ্বব্যাংক–আইএমএফের সভা করতে ওয়াশিংটন গেলে লম্বা জার্নি (ভ্রমণ) করতে হবে।’

যাচ্ছেন না একনেকের বৈঠকেও

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকেও অনুপস্থিত থাকছেন অর্থমন্ত্রী। ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি গঠিত বর্তমান একনেকের চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর বিকল্প চেয়ারপারসন আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাঁর কাজ করতে হচ্ছে এখন অন্য মন্ত্রীদের।

যেমন ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সামনে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সামনে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছি। বৈশ্বিক অবস্থাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেসব আভাস দিচ্ছে, তা–ও তুলে ধরা হয়েছে। আমরা একটা দুঃসময়ের মতো পার করছি।’

অথচ অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত ও বিভিন্ন সূচক তুলে ধরে এ দুঃসময় পার করার কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে অর্থমন্ত্রীরই তুলে ধরার কথা।

কেন একনেক বৈঠকে যান না—এ বিষয়ে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আগে একনেক বৈঠকে যেতাম। এখন যাওয়া হচ্ছে না। তবে পরিকল্পনামন্ত্রী সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা কোনো সমস্যা নয়। পরিকল্পনামন্ত্রী থাকার সময় আমি নিজেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতাম।’

তবে ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী সশরীর অংশ নিয়েছিলেন এবং তার আগের যেগুলো অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলোতেও অংশ নিয়েছিলেন বলে জানান অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা গাজী তৌহিদুল ইসলাম।

সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে নানা আলোচনা

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশও নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত ৫ আগস্ট শুক্রবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কারণে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে গেছে। ডলার–সংকট মেটাতে হিমশিম খেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন কিছুটা তা বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। সুদহার বাড়ানো নিয়েও আছে নানা মতামত। সব মিলিয়ে অর্থনীতি নিয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এতে অর্থমন্ত্রীর দৃশ্যমান তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

২০১২ সালে মোহাম্মদ তারেক যখন অর্থসচিব ছিলেন, তখন অর্থ বিভাগ একটি কার্যতালিকা তৈরি করেছিল। কার্যতালিকায় বলা আছে, ‘সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংশ্লেষ এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করবে অর্থ বিভাগ। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কেও বিশ্লেষণ করবে এ বিভাগ।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, অর্থনীতিসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্তই হচ্ছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। আর এর সঙ্গে জড়িত আছেন দুজন শীর্ষ আমলা। মূলত, অর্থনীতিসংক্রান্ত যা কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সবই আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞদের কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে কোনো ধরনের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে না।

কারও পরামর্শ না নেওয়া বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আর কার সঙ্গে আলাপ করব, কী আলাপ করব, কে, কী সমাধান দেবেন?’

নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন

চিকিৎসার জন্য বছরের ভালো একটা সময় অর্থমন্ত্রীকে বিদেশের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এ জন্য খরচও হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও খরচ করছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় একসময় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য অর্থমন্ত্রীর বিদেশ যাওয়ার কথা জানাত।

চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে একবার দেড় মাস পর ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে ফিরেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এটা ছিল বিজ্ঞপ্তিরই তথ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পাসের পর ৬ মাস ১০ দিনের মধ্যে অর্থমন্ত্রী চিকিৎসার উদ্দেশে তিন দেশ মিলিয়ে প্রায় তিন মাসই বিদেশে ছিলেন। তা–ও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছিল। এর পর থেকে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য আর জানাচ্ছে না অর্থ মন্ত্রণালয়।

সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আছে নানা ধরনের আলোচনা ও গুজব। গত কয়েক দশকের মধ্যে অর্থনীতির কঠিন একসময়ে তাঁর এই নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। সংকটের এ সময়ে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্ব যখন প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সে সময় তাঁর প্রায় অনুপস্থিতিতে দেখা দিয়েছে নানা জিজ্ঞাসা।