default-image

৫০ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থনীতিতে। মহামারির আগ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বেশ কিছু সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ছিল উদাহরণ দেওয়ার মতোই। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশকে বাণিজ্যনির্ভর হতে সাহায্য করেছে তৈরি পোশাক খাত। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মিটিয়েছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা। বিপুল খাদ্যঘাটতি নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দেশের কৃষকেরা খাদ্য উৎপাদনে জাদু দেখিয়েছেন। বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হয়ে আছে বহু বছর ধরেই।

অর্থনীতির এই অর্জনে বিভিন্ন সময়ের সরকারের ভূমিকা ছিল কতটুকু? বলা হয়, সরকারের কাজ কেবল পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া, নীতি প্রণয়ন করা, যাতে বেসরকারি খাত ঠিকঠাক কাজ করে যেতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে সরকারের ঠিক কোন কোন নীতির কারণে অর্থনীতির আজকের অগ্রগতি?

প্রতিনিধিদল সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল, ‘বাংলাদেশের জন্য এই সমাজতান্ত্রিক কাঠামোটি আসলে কেমন?’ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সোশ্যালিজম এজ উই শ্যাল প্র্যাকটিস ইট ইন বাংলাদেশ।’
বিজ্ঞাপন

সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর অর্থনীতি

১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশে একটি বড় সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। ভারতের অশোক মিত্র ও অর্জুন সেনগুপ্ত, জাপানের সাবুরো ওকিতা, নরওয়ের ইউস্ট ফালান্দ, ব্রিটেনের পল স্ট্রিটেন, মাইকেল লিপটন, অস্টিন রবিনসন, যুক্তরাষ্ট্রের গুস্তাভ রেনিস, হলিস বি শেনারি, কিথ গ্রিফিন, তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার ব্রানকো হোরভার্টের মতো বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদেরা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সম্মেলনের বিষয়বস্তু ছিল এখনকার বিচারে অবশ্যই অভিনব, ‘দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ উইদিন এ সোশ্যালিস্ট ফ্রেমওয়ার্ক’।

প্রতিনিধিদল সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল, ‘বাংলাদেশের জন্য এই সমাজতান্ত্রিক কাঠামোটি আসলে কেমন?’ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সোশ্যালিজম এজ উই শ্যাল প্র্যাকটিস ইট ইন বাংলাদেশ।’ সম্মেলনে সমাজতান্ত্রিক কাঠামোয় বিশ্বাসী অর্থনীতিবিদেরা যেমন ছিলেন, তেমনি পুঁজিবাদের পক্ষের অর্থনীতিবিদেরাও ছিলেন। সম্মেলনে একমাত্র যুগোস্লাভিয়ার ব্রানকো হোরভার্ট (পরবর্তী সময়ে তিনি ক্রোয়েশিয়ার অর্থনীতিবিদ বলে পরিচিত, তাঁর নামে কসোভোর একটি সড়কের নামকরণ করা আছে) বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের পক্ষে ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। কারণ বাংলাদেশের আছে অব্যবহৃত সক্ষমতা।’ তবে অন্যরা যে এতটা আশাবাদী ছিলেন না, তা অস্টিন রবিনসন পরিষ্কারভাবেই লিখেছিলেন। কে জানত ব্রানকো হোরভার্টের কথাই একদিন ঠিক হবে, তবে তা হোরভার্টের পছন্দের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে নয়।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সরকার বৃহৎ শিল্প, ব্যাংক ও বিমা জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় জাতীয়করণ করা হয় বিদেশি ব্যাংকের শাখা বাদে বাকি সব ব্যাংক, সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানি (বিদেশি বিমা কোম্পানির শাখা বাদে), সব পাট, বস্ত্র ও সুতাকল, চিনিকল; অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযানের বড় অংশ এবং ১৫ লাখ টাকা মূল্যের বেশি সব পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকানাধীন সম্পত্তি। এ ছাড়া, বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে সরকারি সংস্থা হিসেবে ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশকেই ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এর মাধ্যমে আর্থিক ও শিল্প খাতের প্রায় ৯০ ভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এর কোনো বিকল্প নতুন সরকারের হাতে ছিল না। ছিল না পাকিস্তানি মালিকদের ছেড়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো সক্ষমতা। এর মাধ্যমে শুরুতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও পরে দেখা দেয় নানা সংকট। অর্থনীতিতে দেখা দেয় স্থবিরতা, কমে যায় উৎপাদন। ফলে সরকারকেও আগের নীতি থেকে সরে আসতে হয়। ১৯৭৪ সালেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেমন শুরুতে ব্যক্তি মালিকানা খাতে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা করা হয় ২৫ লাখ টাকা। ১৯৭৪ সালের ১৬ জুলাই এই সীমা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয়। এমনকি প্রথমবারের মতো বিদেশি বিনিয়োগকরীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। জানানো হয়, বিদেশি বিনিয়োগ এলে বিশেষ কর ছাড় দেওয়া হবে এবং ১৫ বছর পর্যন্ত সেই শিল্পকে জাতীয়করণ করা হবে না।

বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো বেশি দিন থাকেনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এর পুরোপুরি অবসান ঘটে। তারপরও ৫০ বছরে অর্থনীতিতে দেশের যে অর্জন, এতে শুরুর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রভাব কতটা ছিল, তা গবেষকেরাই খুঁজে দেখবেন।

মূলত জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই সরকারের ঘোষিত নীতি হিসেবে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া শুরু হয়। অবসান ঘটে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতির। এ সময় ব্যক্তি বিনিয়োগ সীমা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়। শুরু হয় শিল্পকারখানা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া

নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনীতি

মূলত জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই সরকারের ঘোষিত নীতি হিসেবে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া শুরু হয়। অবসান ঘটে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতির। এ সময় ব্যক্তি বিনিয়োগ সীমা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়। শুরু হয় শিল্পকারখানা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া। ১৯৮০ সালে বিদেশি বিনিয়োগ আইন পাস হয়। পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর উদার অর্থনৈতিক নীতির আওতায় নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয় জিয়াউর রহমানের সময়ই, যা অব্যাহত থাকে এরশাদ আমলেও।

এরশাদ আমলকে কেউ কেউ অর্থনীতির জন্য অন্ধকার দশক বলে উল্লেখ করেন। দুর্নীতি, অপশাসন, অপচয় ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অর্থনীতিতে দেখা দেয় নানা সংকট। এর মধ্যেও এমন কিছু নীতি সে সময় নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালের শিল্পনীতির কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৮২ সালের শিল্পনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির কথা বলা হয়। বেসরকারি মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় শিল্প–কলকারখানা। আর ১৯৮৬ সালের শিল্পনীতিতে সরকারের হাতে মাত্র সাতটি খাত রেখে বাকি সব বেসরকারি খাতের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পদ্ধতিও সহজ করা হয়। এমনকি জনসভা করেও ঋণ বিতরণের উদাহরণ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংক স্থাপনের রূপরেখা তৈরি করেছিল ১৯৮০-এর ডিসেম্বরেই, জিয়াউর রহমানের সময়। সে রূপরেখায় ব্যাংক স্থাপনে ১০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন ও ৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কথা বলা ছিল। নতুন ব্যাংক গঠনের আবেদনও চাওয়া হয় সে সময়। এরপর ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং বেসরকারি খাতে নতুন ব্যাংক দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এরশাদ আমলের আরেকটি বড় পদক্ষেপ ছিল ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি, যা দেশীয় ওষুধশিল্প বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

প্রাথমিকভাবে সরকারের নেওয়া এসব নীতি সাফল্যের মুখ দেখেছিল, তা বলা যাবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কলকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেও উৎপাদন খুব বাড়েনি। বরং ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলেও তা দিয়ে শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ঋণখেলাপির শুরু জিয়াউর রহমানের আমল থেকে, যা অনেক বেশি বৃদ্ধি পায় এরশাদ আমলে। এরশাদের সময় দেশ ছিল পুরোপুরি সাহায্যনির্ভর। সেখান থেকে অর্থনীতিকে টেনে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয় নব্বইয়ের দশক থেকে, এরশাদের পতনের পরে। তারপরও বেসরকারি খাতনির্ভর এখনকার অর্থনীতির যে অগ্রযাত্রা, তার শুরুটা ছিল জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলেই। এইটুকু কৃতিত্ব তাঁদের দিতেই হবে।

বিজ্ঞাপন

পোশাকশিল্পের অগ্রযাত্রার পেছনে

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট, যা মূলত কৃষিপণ্য। বিশ্বব্যাপী পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা কমতে থাকায় রপ্তানি বাণিজ্যে সংকট উত্তরোত্তর বাড়ছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করে পোশাকশিল্প। ১৯৭৮ সালের ২৮ জুলাই ফ্রান্সে প্রথম ১০ হাজার শার্ট রপ্তানি করে রিয়াজ গার্মেন্টস। আর একই বছর দেশে প্রথম ১০০ ভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা দেশ গার্মেন্টস গড়ে তুলেছিলেন নুরুল কাদের। ১৯৮০ সালের রপ্তানি নীতিতেই প্রথম পোশাক খাতকে বছরের রপ্তানি পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

সেই পোশাক খাত থেকেই এখন রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ আসে, কর্মসংস্থানের দিক থেকেও পোশাক খাত শীর্ষে। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। তবে দুটি সরকারি নীতি না থাকলে পোশাক খাত আজকের এই অবস্থানে আসতে পারত কি না, সে প্রশ্ন করাই যায়। এই দুই নীতি হচ্ছে বিলম্বে দায় পরিশোধের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা এবং বিনা শুল্কে কাঁচামাল আমদানি করার বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই সুবিধা চালু ছিল। দেশ গার্মেন্টসের উদ্যোক্তা নুরুল কাদের চেয়েছিলেন বাংলাদেশেও তা চালু হোক। আর এই দুই সুবিধা সরকারি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার কৃতিত্ব সে সময়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. নুরুল ইসলামের। এই দুই সুবিধা পোশাক খাতে বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছিল। বড় অঙ্কের পুঁজি ছাড়াই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল পোশাক কারখানা।

পুরো নব্বইয়ের দশককে বলা যায় সংস্কারের দশক। এরশাদের পতনের পর এই সংস্কার শুরু করেছিলেন তৎকালীন বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। সংস্কারের ধারাবাহিকতা ছিল পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও। তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া।

পোশাক খাত অবশ্য এখনো সরকারি নীতি ও সহায়তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর হয়ে আছে। শুরু থেকেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ ছিল পোশাকমালিকদের বিরুদ্ধে। বিনা শুল্কে কাপড় এনে খোলা বাজারে বিক্রি করেছেন বড় বড় উদ্যোক্তারাই। ছিল কোটা বিক্রি ও কোটা জালিয়াতির নানা উদাহরণ। এর মধ্যেও পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা নানা ধরনের নীতি ও কর–সুবিধা পেয়ে শিল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

সংস্কারের দশক

পুরো নব্বইয়ের দশককে বলা যায় সংস্কারের দশক। এরশাদের পতনের পর এই সংস্কার শুরু করেছিলেন তৎকালীন বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। সংস্কারের ধারাবাহিকতা ছিল পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও। তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। মূলত, এ সময়ে বাণিজ্য উদারীকরণের দিকেই মনোযোগ ছিল সারা বিশ্বের। এর ঢেউ আসে বাংলাদেশেও, দাতাদের হাত ধরে। কাজ আগে শুরু হলেও মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আইন কার্যকর হয় এম সাইফুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৯১ সালেই পাস হয় ব্যাংক কোম্পানি আইন। আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতাও কমতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে আরেকটি বড় কৃতিত্ব হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তা ধরে রাখা। এরপর থেকে সব সরকারই এই নীতি বজায় রেখেছে, যার প্রভাব আছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সামষ্টিক অর্থনীতির ধারাবাহিক স্থিতিশীলতাই দেশের অর্থনীতির সাফল্যের বড় ভিত্তি।

এখন অবশ্য করোনা অনেক হিসাবই পালটে দিচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য দেখালেও করোনার কারণে বহুসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। মধ্যবিত্ত পরিচয় হারিয়ে ফেলছেন অনেকেই। আয় কমেছে ৬০ শতাংশ মানুষের।

গত দুই দশকের অগ্রযাত্রা

নব্বইয়ের দশকের পর অর্থনীতিতে আর তেমন সংস্কার হয়নি। তবে ২০০৫ সালে কোটা ব্যবস্থা উঠে গেলেও পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা শুরু হয়েছিল মূলত ২০০০ দশকের মাঝামাঝি থেকেই, যা আরও বেশি সংহত হয়েছে গত এক দশকে। সরকারের সহায়তা, তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা, সরকারি বিনিয়োগ, উদ্যোক্তাদের সামর্থ্য, মধ্যবিত্তের বিকাশে নতুন বাজার সৃষ্টি—এসব কারণে বাংলাদেশ পরিণত হয় উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে।

এখন অবশ্য করোনা অনেক হিসাবই পালটে দিচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য দেখালেও করোনার কারণে বহুসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। মধ্যবিত্ত পরিচয় হারিয়ে ফেলছেন অনেকেই। আয় কমেছে ৬০ শতাংশ মানুষের। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সূচকে অগ্রগতি—এসব সূচকের অর্জন কতটা টেকসই, তারও প্রমাণ হবে সামনের দিনগুলোতে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে সেই সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ নানা ধরনের বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে। আগামী দিনে তা-ও থাকবে না। সুতরাং সব দিক থেকেই কঠিন সময় সামনে।

শওকত হোসেন: প্রথম আলোর বিশেষ বার্তা সম্পাদক

[email protected]

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন