ঢাকার টিকিট কেন কাটবেন তাঁরা

বিজ্ঞাপন
>চীন থেকে কারখানা সরছে। অন্তত উৎপাদনক্ষমতার একাংশ নিয়ে একটি সম্মিলিত প্রস্থানের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। পরিযায়ী বিনিয়োগকারীদের ডাকতে দেশে দেশে নানা আয়োজন। প্রশ্ন হলো, বেইজিং ছেড়ে হ্যানয়, ব্যাংকক, দিল্লি, ইয়াঙ্গুন না ঢাকা—গন্তব্য কোন শহর।
default-image

বাংলাদেশ আর ভিয়েতনামের যাত্রা শুরু হয়েছিল কাছাকাছি সময়েই। আজ ব্যবধান যোজন-যোজন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল পলায়নরত মার্কিন সৈন্যদের শেষ দলটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে জাহাজে চড়ে বসে।

একই দিন উত্তর ভিয়েতনামের যোদ্ধাদের ট্যাংক সায়গনের (হো চি মিন সিটি) প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেসের সদর দরজা গুঁড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তখন মার্কিন সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারের প্রেসিডেন্ট বেরিয়ে এসে বলেন, তিনি ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত। উত্তরের বিজয়ীরা উত্তরে বলেছিলেন, ‘যা আপনার হাতে নেই, তা আপনি ছাড়বেন কী করে?’

১৯৭৭ সালে দুই ভিয়েতনাম এক হয়। পরিকল্পনা, কৌশল আর সংস্কার আজকে ভিয়েতনামকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পরিণত করেছে। শুধু একটা উদাহরণ দিই, বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচক বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে ভিয়েতনামের অবস্থান ৬৯তম, বাংলাদেশ ১৬৮।

ভিয়েতনাম সম্পর্কে এত কিছুর অবতারণা এই জন্য যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চীনের পরে এখন ভিয়েতনামকে তাদের পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, করোনাভাইরাস, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ঝুঁকি কমাতে চীন থেকে উৎপাদনক্ষমতার একাংশ নিয়ে যে সম্মিলিত প্রস্থান শুরু হয়েছে, তাতে সবচেয়ে লাভবান ভিয়েতনাম।

default-image

সর্বশেষ পরিসংখ্যানটি জেনে রাখুন। জাপান সরকার কারখানা স্থানান্তরে ৮৭টি জাপানি কোম্পানিকে ভর্তুকি দিচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ৫৭টি জাপানে ফিরছে। ৩০টি চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছে, যার ১৫টি-ই টিকিট কেটেছে হ্যানয়ের (ভিয়েতনামের রাজধানী)।

বিনিয়োগ আকর্ষণে যা যা দরকার, তিন দশকে তা করেছে ভিয়েতনাম। শুরুতে শিক্ষা, পরে অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে দেশটি। সঙ্গে করেছে প্রশাসনিক সংস্কার। যার সুফল এখন পাচ্ছে ভিয়েতনামের নাগরিকেরা। বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় প্রায় সাত গুণ। মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সবকিছুতেই এগিয়ে দেশটি।

এই লেখা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে। সেখানে ভিয়েতনামের প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেসে ট্যাংক ঢুকে পড়ার ইতিহাস টানা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। তবু টেনে আনলাম এই জন্য যে আমাদের যা নেই, তা আমরা ‘অফার’ করি কী করে, সেটা বোঝাতে।

বিনিয়োগকারীদের দরকার সহজে ব্যবসার পরিবেশ, আমাদের নেই। বিনিয়োগকারীদের দরকার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, সেখানে আমরা পিছিয়ে। বিনিয়োগকারীদের দরকার বাণিজ্যের জন্য রাস্তা, নৌযোগাযোগ, বন্দর ও পণ্য সহজে খালাস করার ব্যবস্থা, আমাদের সেখানে ঘাটতি। বিনিয়োগকারীদের দরকার অবকাঠামো, সেখানে আমরা যথেষ্ট উন্নতি করতে পারিনি। বিনিয়োগকারীদের দরকার দক্ষ জনবল, আমাদের জনবল আছে, তবে মোটা দাগে অদক্ষ। সব মিলিয়ে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে, সেটা বলা যাবে না। বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট।

default-image

বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচকের কথা আগেই বলেছি। এতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম। বিপরীতে ভারত ৭৭, ইন্দোনেশিয়া ৭৩, মালয়েশিয়া ১৫, ভিয়েতনাম ৬৯ ও থাইল্যান্ড ২৭তম অবস্থানে। এমনকি মিয়ানমারও বাংলাদেশের চেয়ে তিন ধাপ এগিয়ে, ১৬৫তম।

যেকোনো বিনিয়োগকারী একটি দেশে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচকে অবস্থানটি দেখে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সহজে ব্যবসা সূচকে উন্নতির জন্য কী করতে হবে, তা চিহ্নিত করে বিডা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনেক আগেই পাঠিয়েছে। কিন্তু সংস্কারের গতি ধীর। কোনো সংস্থাই যে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না, তা অনেকটা স্পষ্ট।

সব মিলিয়ে বিডার যাত্রা শুরুর পর বিশ্বব্যাংকের তিন বছরের সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি মাত্র আট ধাপ। ২০২১ সালের মধ্যে এ ক্ষেত্রে অন্তত ৯৯তম দেশ হওয়ার লক্ষ্য আছে সরকারের। ওদিকে ভারত ২০১৬ সালের ১৩০তম অবস্থান থেকে গেল বছর ৬৩তম অবস্থানে চলে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে (২০১৮) বাংলাদেশের অবস্থান ১০০তম। ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। পিছিয়ে শুধু মিয়ানমার, ১৩৭তম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকেও অবস্থা মোটামুটি একই রকম। বাংলাদেশ ১০৫তম। প্রতিযোগীরা অনেক এগিয়ে।

বৈশ্বিক পরামর্শক সংস্থা প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডব্লিউসি) সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে কোম্পানিগুলোর চীন ছাড়ার বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক ইউবিএসের এক জরিপ তুলে ধরে বলা হয়, বেশির ভাগ কোম্পানি পরিবেশগত মানরক্ষায় শিথিলতা ও ব্যয় কমানো, শ্রমের ব্যয় কমানো, বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো, জমির ব্যয় কমানো, ভালো অবকাঠামোর খোঁজ ও সরকারি নীতিসহায়তার মতো কারণে চীন ছাড়তে চায়।

এদিকে বাংলাদেশ চীন থেকে স্থানান্তরিত বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ কিছু বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে। অবশ্য সুবিধা কী কী দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করতে সময় লাগছে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ বলছেন, ‘বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ কী কী নীতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জানানোর দরকার ছিল গত এপ্রিলেই। আমরা চার মাস পিছিয়ে আছি। অন্যরা কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।’ তিনি বলেন, চীন থেকে কারখানা স্থানান্তর যে সুযোগ তৈরি করেছে, তা থাকবে দুই বছরের মতো। এ সময়ের মধ্যেই কোম্পানিগুলো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে যে তারা কোন দেশে যাবে।

পিডব্লিউসির প্রতিবেদন বলছে, থাইল্যান্ড যেসব খাতে বিনিয়োগ চায়, সেখানে ৩ থেকে ১৩ বছরের জন্য কর ছাড় দিচ্ছে। হার ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ। বিভিন্ন হারে কর ছাড় ও অবকাশ আছে ভিয়েতনামেও। অবশ্য সেগুলো বাংলাদেশেও আছে। ভারত চীন থেকে সরে যাওয়া কারখানা ধরতে ছাড় শ্রম আইন শিথিল করেছে। কঠোর শ্রম আইনকেই ভারতে বিনিয়োগ অন্যতম বাধা হিসেবে গণ্য করা হতো। জমির ব্যবস্থা করে রেখেছে সব দেশই। যেমন ভারত ৪ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর জমি চিহ্নিত করেছে চীন থেকে আসা বিনিয়োগ ধরতে।

তাহলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণে কী আছে। জরিপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে শ্রমের মূল্য কম। জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। ফলে একদিকে শ্রমিকের অভাব নেই, অন্যদিকে এ খাতে বিনিয়োগকারীদের ব্যয় কম।

জেট্রোর জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের পেছনে মাসিক মজুরি ব্যয় ১০৪ মার্কিন ডলার। এটা চীনে ৪৯৩ ডলার। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। ভিয়েতনামে মজুরি বাংলাদেশের দ্বিগুণের বেশি, ২৩৬ ডলার। ভিয়েতনামে জনসংখ্যা সাড়ে ৯ কোটির মতো। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে শ্রমঘন শিল্পে কম খরচে শ্রমিক জোগান দেওয়া তাদের জন্য সহজ হবে না।

মিয়ানমারে শ্রমিকের মজুরি মাসে ১৫৯ ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে ৫৩ শতাংশ বেশি। জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) মহাসচিব তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেন, মিয়ানমারে গত কয়েক বছরে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ গেছে। ফলে সেখানে মজুরি বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘যদি মিয়ানমার আর বাংলাদেশের তুলনা করেন, তাহলে জাপানিরা বাংলাদেশকেই এগিয়ে রাখবে বলে আমার মনে হয়।’

জেট্রোর জরিপে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো কী, তা–ও জানতে চাওয়া হয়েছিল। সেই প্রশ্নের জবাবে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে মজুরি বৃদ্ধি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়। বাংলাদেশে শীর্ষ পাঁচ সমস্যা হলো কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ কেনায় সমস্যা, পণ্য খালাসে বাড়তি সময়, বিদ্যুৎ ঘাটতি, অবকাঠামোর অভাব ও মানসম্মত কর্মীর অভাব।

জেট্রোর জরিপে জাপানি ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারা আগামী এক থেকে দুই বছরে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কী চিন্তা করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কর্মরত বেশির ভাগ কোম্পানি বলেছে, তারা সম্প্রসারণ করবে। প্রধান পাঁচটি কারণ হলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি বৃদ্ধি, উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি, ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক ও সহজলভ্য শ্রমিক। ফলে দেখা যাচ্ছে, শ্রমঘন শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী ব্যবসার জন্যই বাংলাদেশ বেশি উপযোগী।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শ্রমশক্তি, তুলনামূলক কম মজুরি, অভ্যন্তরীণ বাজার ও দেশীয় বাজারে মুনাফার সম্ভাবনার দিকটি আকর্ষণীয়। তিনি বলেন, এ দেশে যারা ইতিমধ্যে এসেছে, তাদের পরিবেশ চেনা। ফলে তারা সম্প্রসারণে আগ্রহী। আর যারা নতুন আসতে চায়, তাদের জন্য ঢোকা একটু কঠিন।

কিন্তু চীন থেকে সরিয়ে নেওয়া যে বিনিয়োগ আকর্ষণের আশা করছি, তা তো নতুনই। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এত দিন বিদেশি বিনিয়োগ বেশি এসেছে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতির তুলনায় সেখানে ব্যবসা করা একটু সহজ। এখন অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত তৈরি করে ফেলতে হবে।

শ্রমিক, বাজার, মুনাফার সম্ভাবনা—এসবের সঙ্গে বৈশ্বিক সূচকগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান যদি ভালো হতো, তাহলে কী হতো, জবাবে গোলাম মোয়াজ্জেম বললেন, ‘উত্তরটি একটু উল্টোভাবে দিই। বিনিয়োগকারীরা কোনো একক দেশের চিন্তা করে এগোয় না। আর এই অঞ্চলে বাংলাদেশ একমাত্র গন্তব্য নয়। যেখানে বিনিয়োগকারীরা ভালো দেখবে, সেখানেই যাবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন