নতুন করে অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে

শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর ২০২১–২২। কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়েছে অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে। শিল্পকারখানা খোলা থাকলেও বন্ধ রয়েছে বিপণিবিতান, দোকানপাট। ব্যবসা–বাণিজ্যে আবারও স্থবিরতা নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছর ও অর্থনীতিতে কঠোর বিধিনিষেধের প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মনজুর হোসেন। অনুলিখন করেছেন আরিফুর রহমান।

নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার যে হারে বাড়ছে, তাতে এটা বোঝা যাচ্ছে, করোনার সঙ্গে আমাদের আরও অনেক দিন বসবাস করতে হবে। যত দিন সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারছি, তত দিন করোনা থেকে মুক্তি মিলবে না। আগামী এক বছরের মধ্যে সবাইকে টিকা দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে আমাদের করোনাভাইরাসের সঙ্গেই থাকতে হবে।

ভবিষ্যতে করোনার আরও ঢেউ আসবে। আবারও বিধিনিষেধ দেওয়া হবে। বারবার এমন বিধিনিষেধের একটা অর্থনৈতিক প্রভাব থাকবেই। জনগণ আয় হারাবে। নতুন করে আবার অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকবে। অর্থনীতির গতি শ্লথ হবে।

এমন একটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাজেটে সেটা দেখা যায়নি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় কোনো পরিবর্তন নেই। বাজেটে টিকা কেনার জন্য টাকা রাখা হয়েছে। টিকা আসবে। কিন্তু কতটুকু টিকা মিলবে, তার একটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে যদি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষের টিকার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। সেটি করতে না পারলে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে। তাই প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত টিকার জোগান দেওয়ার দিকে।

একটি ইতিবাচক দিক হলো পোশাক খাত চালু আছে। বিশ্বে রপ্তানির বাজার ধীরে ধীরে খুলছে। কারণ, ওই সব দেশে টিকার ব্যবস্থা হচ্ছে। রপ্তানি বাজার ঠিক রাখতে সরকার বেশ কিছু সুযোগ দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যদি পোশাকের উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়, সেটা অবশ্যই স্বস্তি দেবে। প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের ধারা ইতিবাচক রয়েছে। অর্থনীতির এই দুই সূচক আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক।

কিন্তু সমস্যা হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁদের অবস্থা খারাপ যাচ্ছে। তাঁদের ব্যবসা বন্ধ। ফলে অনেকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবেন। নতুন করে যাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবেন, তাঁদের একাধিকবার নগদ সহায়তা দেওয়া উচিত। সেটি করতে না পারলে তাঁদের অবস্থার উন্নতি হবে না। নতুন করে যাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, তাঁদের জন্য এই সময় বেশ ভয়ের।

করোনার প্রভাবে অনেকের আয় কমে গেছে। ফলে রাজস্ব আদায়ের ওপর চাপ পড়বে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিষয় জরুরি, সেটি হলো যাঁদের কর দেওয়ার সক্ষমতা আছে, তাঁদের করের আওতায় আনতে পারছি না। করোনার সময়ে যাঁরা কর দিতে সক্ষম, তাঁদের কাছ থেকে কর আদায় করতে হবে। কারণ, সরকারের আয় আরও বাড়াতে হবে, যাতে বাজেট ঘাটতি কমে আসে। সরকার ব্যয়ের যেসব প্রক্ষেপণ করেছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। আয় বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সরকারের কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। যেসব খাতে এখন টাকা খরচের দরকার নেই, সেসব খাতে খরচের চিন্তা বাদ দিয়ে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে খরচ করা দরকার। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে, যাতে দ্রুত প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করা যায়।

নানা সমালোচনার মুখে নিম্ন আয়ের মানুষকে নগদ সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা আবারও চালু করা জরুরি। পাশাপাশি গরিবদের জন্য খাদ্যসহায়তা দিতে পারে সরকার। যেসব জায়গায় নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করে, সেখানে ১০ টাকা দরে চাল দেওয়া যেতে পারে।

এসএমই খাতে যাঁদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে মাঝারি খাতের ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হয়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রণোদনা থেকে সুফল পাচ্ছেন না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে আরও প্রণোদনা বাড়ানো দরকার। এ টাকা বিতরণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো উচিত। এনজিও দিয়ে প্রণোদনার টাকা বিতরণ না করলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা টাকা পাবেন না।

বাংলাদেশে বিধিনিষেধ চূড়ান্ত সমাধান নয়। দীর্ঘ মেয়াদে বিধিনিষেধ টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এখন শুধু মনোযোগী হওয়া উচিত টিকার দিকে। তবে মনে রাখতে হবে, টিকার একটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি আছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে যদি ৮ থেকে ৯ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে চলমান অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। টিকার জন্য বিভিন্ন উৎসে যোগাযোগ করতে হবে। তবে অবশ্যই দেশের মধ্যে টিকা উৎপাদন করা উচিত। সে জন্য দলমত-নির্বিশেষে টিকা উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে। টিকা উৎপাদন করতে না পারলে আগামী তিন–চার বছরেও করোনা সমস্যার সমাধান হবে না।