বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এদিকে ক্রেডিট কার্ড সেবাকে জনপ্রিয় করে তুলতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিচ্ছে নানা ছাড়। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম বছরে মাশুল ফ্রি, নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেনে প্রতিবছর মাশুল মওকুফ, রিওয়ার্ড পয়েন্ট সুবিধা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনাকাটায় ছাড়, হোটেলে থাকা ও খাওয়ায় নানা অফারসহ বিভিন্ন বাড়তি সুযোগ। এর ফলে দেশে এখন ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ লাখ। তাঁদের ওয়ালেটে (মানিব্যাগ) এখন নগদ টাকার পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে ক্রেডিট কার্ড। তাঁরা প্রতি মাসে মোট ২ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন করছেন।

ক্রেডিট কার্ডের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার সম্পর্কে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনের পরিবারটা একটু বড়। স্ত্রী ও দুই মেয়ে এবং বাবা-মা তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আবার ভাই বোনদেরও সহায়তা করতে হতো। মাঝেমধ্যে বেতন পেতেন একটু দেরিতে। সে জন্য বন্ধু–স্বজন বা সহকর্মীদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হতো তাঁকে। এ নিয়ে তখন কিছু কথাও শুনতে হতো তাঁকে।

একসময় পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বাধ্য হয়ে ধারকর্জ করা মোয়াজ্জেম হোসেন তিন বছর ধরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শখ করে ক্রেডিট কার্ড নিইনি। বিপদে পড়লে যাতে রক্ষা পাই, সে জন্য কার্ডকে সঙ্গী করেছি। এখন অনেকটা প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গী হয়ে গেছে। প্রয়োজনে কার্ড ব্যবহার করছি। সময়মতো শোধ দেওয়ায় সুদও দিতে হচ্ছে না। আবার নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেন করায় দুই বছর কার্ডের সেবা মাশুলও মওকুফ পেয়েছি। এতে ক্রেডিট কার্ডে নির্ভরতা বেড়ে গেছে।’

বিশ্বের সব উন্নত দেশে ক্রেডিট কার্ড এখন বহুল প্রচলিত একটি আর্থিক পণ্য। নগদ টাকার বিকল্প হয়ে ওঠায় এটাকে প্লাস্টিক মানিও বলা হয়ে থাকে। প্রতি দেড় মাস পর নির্দিষ্ট দিনে খরচের টাকা পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না। সে জন্য পৃথিবীজুড়ে দিন দিন ক্রেডিট কার্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় নগদ টাকার লেনদেন কমে আসছে। কমছে টাকা বহনের ঝুঁকিও।

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের বড় অংশই এখনো রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোর। ব্যাংকগুলো অবশ্য জেলা শহরগুলোতেও কার্ড ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জেলা শহরে শুধু ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক তৈরি করলেই হবে না, এ জন্য অবকাঠামোও উন্নয়ন করতে হবে। অর্থাৎ জেলা পর্যায়ে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ও হোটেল–রেস্তোরাঁয়ও কার্ড ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

এ সম্পর্কে প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাসান ও. রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশে এখনো ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক খুবই কম। এর কারণ কার্ড ব্যবহারের অবকাঠামো সেভাবে গড়ে তোলা যায়নি।

বাংলাদেশে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক (বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড) প্রথম ক্রেডিট কার্ড সেবা নিয়ে আসে। কাছাকাছি সময়ে তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভনিক বাংলাদেশ (এখন লংকাবাংলা ফাইন্যান্স) ও ন্যাশনাল ব্যাংক সেবাটি চালু করে। এরপর এক এক করে অন্য ব্যাংকগুলোও এই সেবায় মনোযোগী হয়।

বর্তমানে দেশে ৪০টির মতো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। প্রায় সব ব্যাংকেরই রয়েছে ভিসা ও মাস্টারকার্ড ব্র্যান্ডের কার্ড সেবা। তবে এর বাইরে কয়েকটি ব্যাংক কার্ড সেবায় অভিনবত্ব আনতে অন্য ব্র্যান্ডের কার্ডও নিয়ে এসেছে। যেমন সিটি ব্যাংক অ্যামেক্স, প্রাইম ব্যাংক জেবিসি, ইস্টার্ণ ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) ডিনার্স ক্লাব, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক নেক্সাস পে ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ইউনিয়ন পে ইন্টারন্যাশনাল কার্ড সেবা দিচ্ছে।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট পরিমাণ কেনাকাটা ও ঋণ নিতে পারেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ দেশের কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে বিদেশেও। তাই টাকার পাশাপাশি ডলারেও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। দেশে-বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে হোটেল বুকিং, থাকা-খাওয়া, ভ্রমণ, বিমানভাড়া, রেস্তোরাঁ ও কেনাকাটার বিল পরিশোধে মিলছে নানা ছাড় ও পয়েন্ট জেতার সুযোগ। অর্থাৎ কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বেশি। এর ওপর সময়মতো কার্ডের টাকা পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না।

বর্তমানে দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবসায়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে দেশীয় মালিকানাধীন দি সিটি ব্যাংক। মূলত দেশের বাজারে আমেরিকান এক্সপ্রেস বা অ্যামেক্স কার্ড প্রচলনের সুবাদেই এগিয়ে গেছে ব্যাংকটি। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ডে ভালো ব্যবসা করছে ব্র্যাক, ইস্টার্ণ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক, ইউসিবিএল, ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্স।

সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ড এখন আর ধনীদের সেবা পণ্য নয়। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরাও এখন ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। এখন সময় এসেছে সারা দেশে কার্ডের ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়ার। এ জন্য আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন করছি। লেনদেনে পিওএসের পরিবর্তে কিউআর কোডে কার্ড ব্যবহার করা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্ডের ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

অনেক গ্রাহকই একাধিক কার্ড ব্যবহার করে থাকেন। সব মিলিয়ে গত জানুয়ারি শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৯২৩। ওই মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। আর তখন ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৬৮ লাখ, আর লেনদেন হয় ২৪ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা।

এখন ১৬ বছরের ঊর্ধ্বের যেকোনো নাগরিক ক্রেডিট কার্ড সেবা নিতে পারেন। তবে তাঁর নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা থাকতে হয়। পরিবারের অন্য কেউ উপার্জনক্ষম হলেও তার বিপরীতে কার্ড দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। আর এ কার্ডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া যায়। কার্ডের ব্যবহার সহজ করতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে এখন ব্যবহার করা হয় নানা প্রযুক্তি। তাই সময় এখন ক্রেডিট কার্ড হাতে নেওয়ার। আপনিও ভেবে দেখতে পারেন, নেবেন কি না একটা কার্ড।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন