বাংলাদেশ ব্যাংকে হেনস্তার শিকার আরও যত গভর্নর

  • ১৯৯৬ সালে আটকে রাখা হয়েছিল গভর্নর খোরশেদ আলমকে।

  • ২০০৯ সালে অবরুদ্ধ ছিলেন গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ।

  • গভর্নরের কলার চেপে ধরেছিলেন সালমান এফ রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকছবি: বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক থেকে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে বিশৃঙ্খলা, বিক্ষোভ ও মব তৈরি করে দাবি আদায়ের ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিন্তু একটি ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এর প্রধান কারণ। ফলে এসব ঘটনা অব্যাহত রয়েছে এবং মাত্রাও তীব্র হচ্ছে।

সর্বশেষ গত বুধবার মব তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেওয়া হয়। তৌহিদুল ইসলাম নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত পরিচালক উপদেষ্টার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলায় নেতৃত্বও দেন। এর আগে গভর্নর পরিবর্তনের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর উত্তেজনা বাড়তে থাকলে আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে চলে যান।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা
ছবি: প্রথম আলো

জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সারা বিশ্বেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। এমনকি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে—এই আশঙ্কায় গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষের পাঁচ ধরনের সেবা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজবন্ড বিক্রি, ছেঁড়া-ফাটা নোট বিনিময় ইত্যাদি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছিল, ‘কেপিআই প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকসংশ্লিষ্ট এসব সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ অথচ এখানেই বছরের পর বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির একশ্রেণির কর্মচারী-কর্মকর্তা বিক্ষোভ ও মব তৈরির মতো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেই যাচ্ছেন।

সর্বশেষ গত বুধবার মব তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেওয়া হয়। তৌহিদুল ইসলাম নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত পরিচালক উপদেষ্টার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলায় নেতৃত্বও দেন। এর আগে গভর্নর পরিবর্তনের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর উত্তেজনা বাড়তে থাকলে আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে চলে যান।

সমিতি ও ক্লাবের ছড়াছড়ি

বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন নানা ধরনের আন্দোলন, দাবি উত্থাপনের জন্য অনেকগুলো সমিতি ও ক্লাব রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ইস্যুতে এসব সমিতির ব্যানারে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করে থাকেন। তাঁদেরই একটি অংশ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর নেতৃত্বে ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব মিলিয়ে ৯টি ক্লাব ও সমিতি থাকার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে সহকারী পরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। ক্যাশ অফিসারদের জন্য রয়েছে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। এ ছাড়া সব ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব। প্রতিবছর বা দুই বছরে একবার এসব সমিতির নির্বাচন হয়ে থাকে।

এ ছাড়া রয়েছে হলুদ, সবুজ ও নীল দল। এসব মূলত রাজনৈতিক দল–সমর্থিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নীল দল পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কর্মকর্তারা, সবুজ দল চালান বিএনপি–সমর্থিত কর্মকর্তারা। আর হলুদ দলে জামায়াত ছাড়াও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত কর্মকর্তারাও আছেন। তাঁরা দলের ব্যানারে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ক্লাবের নির্বাচনে অংশ নেন। এ ছাড়া কর্মচারীদের জন্য রয়েছে জাতীয়তাবাদী ফোরাম। আরও রয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও জিয়া পরিষদ।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর খোরশেদ আলম
ছবি: সংগৃহীত

গভর্নর হেনস্তা শুরু ১৯৯৬ সালে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে হেনস্তা করার উদাহরণটা বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সদ্য ক্ষমতাসীন হয়েছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন খোরশেদ আলম। তিনি গভর্নর পদে এসেছিলেন ১৯৯২ সালের সালের ২০ ডিসেম্বর। তৎকালীন বিএনপি সরকার তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিল।

খোরশেদ আলমের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস আগে, ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর তাঁর নিয়োগ বাতিল করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই দিন লুৎফর রহমান সরকারকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া রয়েছে হলুদ, সবুজ ও নীল দল। এসব মূলত রাজনৈতিক দল–সমর্থিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নীল দল পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কর্মকর্তারা, সবুজ দল চালান বিএনপি–সমর্থিত কর্মকর্তারা। আর হলুদ দলে জামায়াত ছাড়াও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত কর্মকর্তারাও আছেন।

২২ নভেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাক–এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ নভেম্বর সকাল থেকে খোরশেদ আলমকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঘেরাও করে রেখেছিলেন। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগানও দেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ ছিল, খোরশেদ আলম বেতনসংক্রান্ত অসংগতি দূর করার আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু এ ব্যাপারে কিছুই করেননি।

বেলা ১১টার দিকে লুৎফর রহমান সরকার যখন দায়িত্ব নিতে আসেন, তখনো সাবেক গভর্নর অবরুদ্ধ। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নতুন গভর্নরকে স্বাগত জানালেও সাবেক গভর্নরকে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন থেকে বের হতে দেবে না বলে জানিয়ে দেন। ইত্তেফাক–এর খবর অনুযায়ী, ‘লুৎফর রহমান সরকার এ সময় বিপর্যস্ত সাবেক গভর্নরকে নিরাপদে অফিস ত্যাগে কোনো বাধা না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।’ নতুন গভর্নর অভিযোগের বিষয়গুলো দেখবেন—এই আশ্বাস দেওয়ার পরেই বিদায় নিতে পারেন সাবেক গভর্নর।

ওই দিনই অর্থ মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। তখন হঠাৎ করে গভর্নরকে বিদায় দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘হঠাৎ করে গভর্নর পরিবর্তন করা হয়েছে, এটা ঠিক নয়। দেশ ও জাতির স্বার্থেই সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’

সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

রেহাই পাননি সালেহউদ্দিন আহমেদও

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ২০০৯ সালের ১ মে পর্যন্ত। তিনি শেষ অফিস করেছিলেন ৩০ এপ্রিল। পরদিন দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘বিদায়কালে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কবলে ড. সালেহউদ্দিন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যেই গভর্নরের কার্যালয় মূল ভবনের চতুর্থ তলায় লোকজন নিয়ে অবস্থান নেন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন খান, সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান ও সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক মঞ্জু। তাঁরা গভর্নরকে আটক করে দাবি আদায়ের প্রস্তুতি নেন এবং গভর্নরের রুমে ঢুকে সবার জন্য ইনক্রিমেন্ট দাবি করেন। একপর্যায়ে ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের ডেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি করে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করেন বিদায়ী গভর্নর। তবে কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্টের সুপারিশ না করায় ক্ষুব্ধ হন অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। তাঁদের ইন্ধনে ব্যাংকের নিচে অবস্থান নেন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁরা বের হওয়ার গেটে অবস্থান নেন। পাঁচটার পর বিদায়ী গভর্নর নিচে নেমে বের হওয়ার গেটে ভিড় দেখে অন্য পাশে থাকা প্রবেশ গেট দিয়ে বের হন।’

ফখরুদ্দীন আহমদ
ফাইল ছবি

ব্যবস্থা নেওয়া হয় একবারই

বাংলাদেশ ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে একবারেই। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন সরকার–সমর্থিত ইউনিয়নের নেতারা। তাঁদের দাবি ছিল, এক দিনের মধ্যে ১০০ জন কর্মকর্তাকে সহকারী পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দিতে হবে। তখন ক্ষমতায় বিএনপি সরকার। ২৯ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ‘সরকার–সমর্থক বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয়তাবাদী কর্মচারী সমিতির (নির্বাচিত সিবিএ) নেতৃত্বে ৪০০-৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই কর্মসূচি পালন করেছিলেন। এ সময় গভর্নরের বিরুদ্ধে তাঁরা নানা ধরনের স্লোগান ও গালাগাল করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একপর্যায়ে ৪০-৫০ বিক্ষোভকারী জোর করে গভর্নরের কক্ষেও প্রবেশ করেন।’

এই একটি ঘটনাতেই মবকারীরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য শাস্তি পাওয়ার আর কোনো উদাহরণ নেই।

এই ঘটনায় ৩০ অক্টোবরই ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বিএনপি-সমর্থিত অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সিবিএর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চাকরিচ্যুত সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী হওয়ায় সরকারের একটি অংশ নমনীয় হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সমর্থন পেয়েছিলেন গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ। এই একটি ঘটনাতেই মবকারীরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য শাস্তি পাওয়ার আর কোনো উদাহরণ নেই।

ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন সালমান এফ রহমানও

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের আরেকটি বিখ্যাত ঘটনা আছে। ১৯৯৭ সালের ২৭ জুলাই বহুল আলোচিত বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার দুই ভাই সোহেল এফ রহমান এবং সালমান এফ রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের সঙ্গে দেখা করে ধমক দিয়েছিলেন। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন প্রয়াত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি ২০২০ সালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে সালমান এফ রহমান গভর্নরের কলার চেপে ধরেছিলেন। এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এ জন্য দুই ভাইকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। কারণ, তাঁরা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন।

সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন প্রয়াত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি ২০২০ সালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে সালমান এফ রহমান গভর্নরের কলার চেপে ধরেছিলেন। এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এ জন্য দুই ভাইকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। কারণ, তাঁরা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন।

জিএমকে মারধর, গভর্নরকে গালি

এই লুৎফর রহমান সরকারের সময়েই ১৯৯৮ সালের ১৯ জানুয়ারি সরকারি দল আওয়ামী–সমর্থিত সিবিএ নির্বাচনে পরাজিত বাংলাদেশ ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বদলি ঠেকাতে একজন মহাব্যবস্থাপককে (জিএম) মারধর করেছিলেন। সেই জিএম প্রাণের ভয়ে গভর্নরের রুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেও ঢুকে এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা গভর্নরকে গালিগালাজ করেছিলেন। এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক আটজনকে সাসপেন্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সে সময় ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত একটি টাস্কফোর্স বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব ব্যাংকে ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অভিযুক্ত সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হওয়ায় তাঁরা চাকরিকে ফিরে আসেন, ট্রেড ইউনিয়ন আবার চালু হয় এবং টাস্কফোর্সের রিপোর্টও হিমাগারে চলে যায়।

৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে অস্থিরতা
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

৭ আগস্টের মব

শেখ হাসিনার পতনের পর ‘মব’ সন্ত্রাস নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, চার ডেপুটি গভর্নর, উপদেষ্টা ও আর্থিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে মিছিল করেন। পরে তাঁরা একজন ডেপুটি গভর্নরকে সাদা কাগজে সই করতে বাধ্য করেন এবং আরও চারজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে ‘পদত্যাগে রাজি’ করান।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে নতুন গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়। নতুন ডেপুটি গভর্নর পদেও নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন বিক্ষোভ ও আন্দোলন দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। পৃথিবীর কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এমনটা ঘটেছে কি না, তা জানা যায়নি। তাই এটা একটা বিরল ঘটনা। রাজনৈতিক বিক্ষোভে বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এর বাইরে ছিল।

মুস্তফা কে মুজেরি আরও বলেন, এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে। বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা যায় না। নতুন সরকার ও নতুন গভর্নরকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। না হলে বারবার এমন ঘটনা ঘটবে। এই মব থেকে মুক্তি মিলবে না।