বড় স্বপ্ন, বিশাল বাজেট, বিপুল ছাড়
বড় স্বপ্ন দেখিয়ে ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। মানুষ তাকিয়ে ছিলেন বাজেটের দিকে। সবার স্বপ্নপূরণে বিশাল বাজেটও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সব পক্ষকে খুশি করতে করের ক্ষেত্রে বিপুল ছাড়ও দিয়েছেন। একই সঙ্গে এই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও বিরাট।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় বাজেটের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে। অনেক বেশি হারে কর আদায় করতে হবে। এরপরও ঘাটতি থাকবে অনেক। এ জন্য অর্থমন্ত্রী বেশি ভরসা করেছেন বৈদেশিক ঋণের ওপর। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ঋণ পেতে হবে। আর সংস্কারের ওপরই নির্ভর করবে বিপুল বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তি।
ব্যাংক খাত দুরবস্থায়। মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগ আরও কমেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তো আছেই। এ রকম এক অবস্থায় অনেক স্বপ্নপূরণের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
এমনকি আগামী পাঁচ বছরে দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, সে কথাও বলেছেন। কিন্তু কাজটি কীভাবে হবে, সংশয় এ নিয়েই। স্বপ্নের কথা আছে, সেই স্বপ্নপূরণ কীভাবে হবে—সেই কাঠামো এখনো অস্পষ্ট। তার ওপর বিশ্ব অর্থনীতি এখনো নানা অনিশ্চয়তায় ভরা।
টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশের মানুষ। বাজেট বড় না ছোট—এতে সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না। বরং তাঁরা এখন স্বস্তি চান। আর এ জন্য তাঁরা ভরসা করে আছেন নতুন সরকারের ওপর। সবার আশা, সরকার কেবল স্বপ্নের কথাই শোনাবে না, কাজও করবে।
রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছিলেন, ‘এবার ফিরাও মোরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে/ হে কল্পনে, রঙ্গময়ী! দুলায়ো না সমীরে সমীরে/ তরঙ্গে তরঙ্গে আর, ভুলায়ো না মোহিনী মায়ায়।’ অর্থাৎ এখন আর কথায় বা মায়ায় ভুলতে চাইবেন না দেশের মানুষ।
১০ অগ্রাধিকার
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট দিয়েছেন, তার নাম দিয়েছেন, ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। বক্তৃতাটি আগের বাজেটগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সুলিখিত এবং যা বলার সরাসরি বলেছেন। তিনি নতুন অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ করার লক্ষ্যের কথা বলেছেন। এই দুই লক্ষ্যই যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য অর্জনে অবশ্য ১০টি অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন। এর ওপর ভিত্তি করেই বাজেটটি তৈরি করেছেন অর্থমন্ত্রী। যেমন
সবার জন্য উন্নয়ন; সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা;
সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা;
বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি;
বিনিয়ন্ত্রণকরণ, সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ;
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা;
জ্বালানি নিরাপত্তা;
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিকাশ;
প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা
স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
এর পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সৃজনশীল বা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতির মতো খাতগুলোকেও জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসার কথা বলেছেন। এ জন্য নানা ধরনের কর ছাড়ও দিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরের জন্য বেশ কিছু লক্ষ্যের কথাও বলেছেন। যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশ করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১১ শতাংশ ও কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশ করা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এত বড় স্বপ্নপূরণে মহাকর্মযজ্ঞ দরকার। অর্থমন্ত্রী ও সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ এটাই।
টাকা কোথা থেকে আসবে, কোথায় যাবে
অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের জন্য অনুদানসহ মোট আয় ধরেছেন ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়। সরকারের মোট আয়ের ৮৬ দশমিক ১ শতাংশই আসবে এনবিআরের কর রাজস্ব থেকে, করবহির্ভূত অন্যান্য উৎস থেকে আসবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজেটের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে সরকার নির্ধারিত কর আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে কি না, তার ওপর।
এবার ব্যয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, আগামী অর্থবছরে সরকার মোট ব্যয় করবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা বা মোট ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ যাবে পরিচালন বা চলতি ব্যয়ে। আর উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার প্রতি ১০০ টাকা খরচ করলে প্রায় ৬৫ টাকা যাবে চলতি ব্যয়ে এবং ৩৪ টাকা যাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে।
আবার সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ব্যয়ের প্রায় ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। সহজ ভাষায় বললে, সরকার প্রতি ১০০ টাকা খরচ করবে, কিন্তু নিজে আয় করবে ৭৪ টাকা। বাকি প্রায় ২৬ টাকা জোগাড় করতে হবে ঋণ নিয়ে।
তবে পরিচালন ব্যয়ের ভেতরে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে ঋণের সুদ। আগামী অর্থবছরে সরকারকে শুধু সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
আবার সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ব্যয়ের প্রায় ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। সহজ ভাষায় বললে, সরকার প্রতি ১০০ টাকা খরচ করবে, কিন্তু নিজে আয় করবে ৭৪ টাকা। বাকি প্রায় ২৬ টাকা জোগাড় করতে হবে ঋণ নিয়ে।
বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, এর সফলতা নির্ভর করবে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর। যেমন সরকার নির্ধারিত রাজস্ব কতটা আদায় করতে পারবে ও সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করতে পারবে। এই রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে কিংবা বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে চাপ পড়বে ব্যাংক–ব্যবস্থার ওপর। তখন সরকারকে ব্যাংক–ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটাতে হবে।
এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশ-বিদেশ উভয় উৎস থেকেই ঋণ নিতে হবে। মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ আসবে বিদেশি ঋণ থেকে এবং ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে। সরকার আগামী অর্থবছরে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতর থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংক–ব্যবস্থা থেকে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রায় ৮৮ শতাংশই আসবে ব্যাংক খাত থেকে। অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে, যার মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের অবদান থাকবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী সরকার বৈদেশিক ঋণ পাচ্ছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নতুন অর্থবছরে এর লক্ষ্য হচ্ছে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশি ঋণ বাড়াতে হবে।
সুতরাং বলা যায়, বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, এর সফলতা নির্ভর করবে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর। যেমন সরকার নির্ধারিত রাজস্ব কতটা আদায় করতে পারবে ও সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করতে পারবে। এই রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে কিংবা বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে চাপ পড়বে ব্যাংক–ব্যবস্থার ওপর। তখন সরকারকে ব্যাংক–ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটাতে হবে। এতে ঋণ পাবে না বেসরকারি খাত। বিনিয়োগও বাড়বে না, মূল্যস্ফীতিও কমবে না।
রাজস্ব কার্যক্রম
করের হার নয়, বরং করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয় প্রতিবারেই। কিন্তু করের আওতা তেমন বাড়ে না। এবার অর্থমন্ত্রী করের হার অনেক ক্ষেত্রে কমিয়েছেন, আর বাড়িয়েছেন করের আওতা। এতে করছাড় পেয়েছেন প্রায় সবাই, তবে করের আওতায় বেশি পড়েছেন ছোটরাই।
এবারের বাজেটে সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত আয়করে স্বস্তি। সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আগামী পাঁচ বছরের একটি রোডম্যাপও ঘোষণা করেছে সরকার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে। নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বেশি রাখা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মধ্যবিত্ত কিছুটা স্বস্তি পাবে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো আগামী পাঁচ বছরের আয়কর–কাঠামো আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সহজে করতে পারবে।
বাজেটে চাল, গম, আলু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, তেল, চিনিসহ ৬১টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানো হয়েছে। লক্ষ্য বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। তবে কর কমানোর এই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কারণ, দেশে কর কমলেও পণ্যের দাম একই থাকে এবং সুবিধার বড় অংশ ব্যবসায়ীদের কাছেই থেকে যায়।
ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে সরকার ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় ধরনের করসুবিধা দিয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং আয় করমুক্ত রাখা হয়েছে, কনটেন্ট নির্মাতাদের আয়েও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং স্টার্টআপের টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য করা হয়েছে। এতে ইউটিউবার, ফেসবুক কনটেন্ট নির্মাতা, গ্রাফিক ডিজাইনার ও ফ্রিল্যান্সাররা সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। তরুণেরা নিশ্চয়ই এ প্রস্তাবে খুশি হবেন।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বড় প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টারের মতো পণ্যের ওপর কর কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাগুলো এর সুফল পাবে।
তবে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আমদানি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এ খাতে অনেক বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইভি চার্জার আমদানিতেও কর কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য করহার বজায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি।
যা আলোচনায় থাকবে
বাজেটের ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ করব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করতে পারবেন। তাঁদের ভ্যাটের হিসাবপত্র সংরক্ষণ বা রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন হবে না। ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজে কর পরিশোধ করা যাবে। এতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে।
একই সঙ্গে করের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের করব্যবস্থার আওতায় আনতে পণ্য সরবরাহের সময় ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি এক হাজারে ২ টাকা কর দিতে হবে। হারটি খুবই কম হলেও এর মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসাকে করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবের জন্য ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিন নিবন্ধন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন প্রয়োজন হবে। আবার বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, ইউটিলিটি সেবা ও সম্পত্তির তথ্যকে একটি সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার এ থেকে কর ফাঁকি কমাতে পারবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
এটাই কি সবচেয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা
প্রথা অনুযায়ী, গতকাল সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন করা হয়। বেলা পৌনে তিনটার দিকে অর্থ বিলে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর বেলা তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর প্রথম বাজেট উপস্থাপনে সময় নেন পৌনে চার ঘণ্টা। মাঝখানে আসর ও মাগরিবের নামাজের বিরতি দিয়ে অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শেষ হয় রাত ৮টা ১০ মিনিটে। ফলে বিরতিসহ বাজেট বক্তৃতার মোট সময় ছিল পাঁচ ঘণ্টা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা।
তবে ইতিহাসের দীর্ঘতম বিরতিহীন বাজেট বক্তৃতা দিয়েছিলেন ব্রিটেনের একসময়ের অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম ইউয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোন। ১৮৫৩ সালের ১৮ এপ্রিল তাঁর বক্তৃতা স্থায়ী হয়েছিল ৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। তবে এর আগের বছর আরেক অর্থমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বক্তৃতা দিলেও মাঝখানে বিরতি নিয়েছিলেন। সেই অর্থে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীও এবার ইতিহাসে স্থান পাবেন।
অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শেষ হয় রাত ৮টা ১০ মিনিটে। ফলে বিরতিসহ বাজেট বক্তৃতার মোট সময় ছিল পাঁচ ঘণ্টা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা।
এত ধৈর্য নিয়ে দেশের অনেকেই হয়তো অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনেছেন। তাঁরাই পাঁচ বছর ধরে ভালো দিনের আশায় ধৈর্য ধরে আছেন। অর্থমন্ত্রী অনেক আশার কথা শুনিয়েছেনও। এখন নতুন সরকার ও নতুন অর্থমন্ত্রী এই আশা বাজেটের মাধ্যমে কতটা পূরণ করতে পারবেন, সেটাই দেখার বিষয়।
‘বাক্য অপেক্ষা কার্য্য ভাল’ শিরোনামে উনিশ শতকের অন্যতম কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি কবিতা আছে। সেই কবিতার প্রথম দুই পঙ্ক্তি হচ্ছে, ‘কাজে যদি করা হয় করো তবে ভাই,/ মিছামিছি মুখে বলে কোনো ফল নাই।’ তবে আজকের লেখাটা শেষ করছি কবিতাটির শেষের দুই পঙ্ক্তি দিয়ে, ‘অতএব কর ভাই সাধ্য হয় যত/ কল্পনা না হয় যেন রাবণের মত।’