বিশ্লেষণ
অর্থনীতি কি গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে
দেশের অর্থনীতি এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমেনি, মানুষের আয় চাপে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না।
এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে? মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি।
বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়েছে। টানা তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। এতে অর্থনীতির পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার সক্ষমতা কমে গেছে।
সংকটে আছে দেশের আর্থিক খাত। কয়েকটি ব্যাংক চালু রাখতে সরকারকে তারল্যসহায়তা দিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে এখন সরকার চাইলেও অর্থনীতিকে চাঙা করতে অর্থের খরচ বাড়াতে পারছে না।
প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমলেও রপ্তানি আরও দুর্বল হয়েছে। এর মধ্যে আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির আরও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি দুর্বল হতে পারে, প্রবাসী আয় কমতে পারে, আর তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে টাকার আরও অবমূল্যায়নের আশঙ্কা আছে, যা মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়াবে। এখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়লে সরকারের আর্থিক জায়গা আরও সংকুচিত হবে।
সব মিলিয়ে, অর্থনীতি আগে থেকেই সমস্যায় ছিল, ছিল নানা ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। আর এখন সেই অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে আরও টেকসই রাখতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল দরকার, আর এর সঙ্গে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
১. প্রথম অগ্রাধিকার মূল্যস্ফীতি কমানো
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ শুরু হয়েছিল কোভিডের সময় থেকে। গত আওয়ামী লীগের সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদের হার বাড়ালেও তত দিনে অনেক বেশি দেরি হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার ক্রমে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমেছে। টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে দেশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী এখন মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি বাড়ছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলে সাধারণত তারা কম খরচ করে এবং সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে ব্যবসা ও শিল্পে এর প্রভাব পড়ে। এতে উৎপাদন হ্রাস পায়, নতুন বিনিয়োগও শ্লথ হয়। এর সবই ঘটেছে বাংলাদেশে।
বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন সরকারের ওপর সুদহার কমানোর চাপ আছে। তবে এখনই সুদহার বাড়ালে চাপ পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর। সরকারের অগ্রাধিকারই এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তা না হলে অর্থনীতি টেকসই হবে না।
২. কর্মসংস্থানে কী চাপ পড়বে
অর্থনীতি নিয়ে এখন উভয়সংকটে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নাকি বেকারত্ব কমানো—দ্বন্দ্বটা এ নিয়েই। সাধারণত সরকার যখন বেকারত্ব কমাতে চায়, তখন বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। এতে মানুষের হাতে টাকা যায়, চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা আবার পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতির হারকেই বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার কমানোর জন্য সুদের হার বাড়াতে হয়। এতে বিনিয়োগ কমে যায়, বাড়ে বেকারত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন পথ যাবে সরকার।
বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোনো একটি সমস্যাকে বেছে নেওয়া নয়; বরং কীভাবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়, সেই ভারসাম্য খুঁজে বের করা।
৩. এখনই প্রবৃদ্ধি নয়, আগে স্থিতিশীলতা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে তার পরই নজর দিতে হবে প্রবৃদ্ধির দিকে, তার আগে নয়। বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে ছিটকে পড়েছিল কোভিডের সময় থেকেই। মাঝখানে দুই অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উচ্চ প্রবৃদ্ধির তথ্য দেওয়া হলেও তা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকেই ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ টানা তিন অর্থবছর কমেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি।
করোনার পরে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ছিল, প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার প্রতি মনোযোগ দেওয়া। তবে প্রথমে কোভিড এবং পরে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি শুরুতে বিপাকে পড়লেও পরে বেশির ভাগ দেশই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এখন কেবল টিকে থাকা নয়, ঘুরে দাঁড়ানোরও সময়। বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর জন্যও উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। সুতরাং নতুন সরকারের জন্য এটিই প্রথম চ্যালেঞ্জ। ইরান যুদ্ধ এই চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
৪. দারিদ্র্য আবার আলোচনায়
মানুষের আয় কমে যাওয়ায় বেড়ে গেছে দারিদ্র্যের হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ করেছিল ২০২২ সালে, তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরে আর কোনো খানা ব্যয় ও আয় (এইচআইইএস) জরিপ হয়নি। তবে গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১ দশমিক ২ শতাংশ, এই হিসাবে এখন দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ
দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। দারিদ্র্য হারের এই পতন ঠেকাতে হলে মানুষের আয় বাড়াতে হবে।
দেখা গেছে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্যের হার হ্রাসের গতি কমে গেছে। প্রবৃদ্ধি আর আগের মতো একই গতিতে দারিদ্র্য কমাতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশে এখন ১ শতাংশ জিডিপি বাড়লে দারিদ্র্য গড়ে দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়; আর দক্ষিণ এশিয়ায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়লে দারিদ্র্য কমে প্রায় দেড় শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
৫. বৈষম্য অর্থনীতিকে দুর্বল করছে
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ। বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী ২০১০ সালে দেশের জিনি অনুপাত ছিল ০.৪৫৮ শতাংশ, ২০২২ সালে তা আরও বেড়ে হয়েছে ০.৪৯৯ শতাংশ। তত্ত্বগতভাবে জিনি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫০–এর কাছাকাছি পৌঁছানো মানে উচ্চ মাত্রার আয়বৈষম্য রয়েছে।
দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাত; আর সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষ এখন জাতীয় আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, জাতীয় আয়ে মধ্যবিত্তের অংশ কমেছে। এর অর্থ হচ্ছে ভোক্তাচাহিদা কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়াই এর প্রমাণ।
৬. প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কাজ কোথায়
বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেখা মিললেও তা ছিল কর্মসংস্থানহীন। অর্থাৎ জিডিপি বাড়ছে; কিন্তু বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের আয় বাড়ানোর মতো পর্যাপ্ত কাজ তৈরি হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছেছেন; কিন্তু এ সময়ে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক তরুণই কাজ পাননি। আবার যাঁরা কাজ পেয়েছেন, তাঁদের মধে৵ প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্ত হয়েছেন কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতে। উৎপাদনশীল শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে।
দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিল্প খাত বছরে গড়ে ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে; কিন্তু একই সময়ে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। আবার দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে এলেও এখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে মাত্র ৬ শতাংশের মতো। অর্থাৎ রপ্তানিতে সাফল্য এলেও তা পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি করতে পারেনি।
বিনিয়োগের এতটা দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও ছিল না। জ্বালানিসহ অবকাঠোমার সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল আস্থাহীনতা। সরকার বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাও করেনি; বরং কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানো।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নারীদের ক্ষেত্রে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতি পাঁচজন তরুণীর একজন কর্মসংস্থানে নেই। আবার শিক্ষিত তরুণীদের ক্ষেত্রে প্রতি চারজনের একজন কাজ পান না। শহরে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০১৬ সালে ৩১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক নারী এখন কৃষি খাতে কাজ করছেন, যেখানে তারা মূলত কম বেতনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত—এখন কৃষি খাতে কর্মীদের ৫৮ শতাংশই নারী। বিপরীতে শিল্প খাতে নারীর অংশ কমেছে, যা আগে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসারের কারণে বেড়েছিল। অর্থাৎ নারীরা চাকরি থেকে সরে যাচ্ছেন।
শ্রমশক্তিতে যুব অংশগ্রহণও কমেছে। ২০২৩ সালে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে ছিলেন ১৪ শতাংশ। পাশাপাশি ১৬ শতাংশ তরুণ ছিলেন, যাঁরা কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত নন। এই তরুণদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ নারী এবং ৬৩ শতাংশ শহরাঞ্চলের বাসিন্দা।
সুতরাং নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিবছর যে ২২ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তাঁদের কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
৭. এ জন্য চাই নতুন বিনিয়োগ
অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ; আর এখন সরকারি খাতের ঋণ বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ আরও কমে হয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। এমনকি জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগও অনেক কমে গেছে।
বিনিয়োগের এতটা দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও ছিল না। জ্বালানিসহ অবকাঠোমার সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল আস্থাহীনতা। সরকার বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাও করেনি; বরং কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানো।
৮. বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে কীভাবে
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেসরকারি খাতে বেশ কিছু ব্যবসায়ীর গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। এই অলিগার্ক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় নীতি ও অর্থনীতির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করত। এতে ভালো উদ্যোক্তাদের একটি অংশ পিছিয়ে গেছে, আরেকটি অংশ সরকারের কাছে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল সেই সব অলিগার্ক ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করা। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটি আস্থাপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। এ জন্য ব্যবসা পরিচালনার সময় ও ব্যয় কমাতে হবে।
৯. জ্বালানি খাত এখন বড় ঝুঁকি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট বিনিয়োগের বড় বাধা। গ্যাস–সংযোগের কারণে কারখানা চালু না করতে পারার উদাহরণও আছে। বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে (২০০১–০৬) এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বের ৩২টি দাতা দেশ ও সংস্থার পক্ষে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীত ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের কন্ট্রি ডিরেক্টর ক্রিস্টিন ওয়ালিচ।
আর এখন তো সংকট বহুমুখী। চলমান ইরান যুদ্ধ জ্বালানিসংকট আরও তীব্র করেছে। ফলে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে। সেই জ্বালানি দেশে নিয়ে আসতে হবে। জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে মূল্য সমন্বয় করতে সরকার এরই মধ্যে একটি কমিটি করেছে। এখন দাম বাড়ালে এর প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। আর তা না করলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়বে। সব মিলিয়ে জ্বালানি নিয়ে সরকার এখন উভয়সংকটে।
১০. এখনই সুদহার কমানো নয়
উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগের বাধা হিসাবে উচ্চ সুদহারকেও দায়ী করছেন। তবে বাংলাদেশে উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ কমার তথ্য প্রমাণিত নয়; বরং উচ্চ সুদহারের মধ্যেও বিনিয়োগ বেড়েছে—এমন উদাহরণই বেশি। তবে উদ্যোক্তারা সব সময়েই চান সুদহার কমুক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছিল মূল্যস্ফীতিকে আটকে রাখতে। সারা বিশ্ব এভাবেই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে; বরং বাংলাদেশ বিলম্বে এ পথে মুদ্রানীতি প্রয়োগ না করায় এর সুফল পায়নি।
বিএনপি সরকারের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এসেই সুদহার কমানোর কথা বলেছেন। এ জন্য মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক ডাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদহার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দেশে বিনিয়োগও প্রয়োজন। তবে আপাতত সুদহারে হাত না দিতেই পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। এখন সরকারের অর্থনীতির সিদ্ধান্ত রাজনীতির চাপে কতটা প্রভাবিত হয়, এটি হবে তারই বড় পরীক্ষা।
১১. প্রতিশ্রুতি মেটানোর টাকা কোথায়
বিএনপি সরকার অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেকার ভাতা দেওয়া ইত্যাদি। এর বাইরে অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে গেছে। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে; আর এখন শুরু হয়েছে ভর্তুকির চাপ।
সুতরাং সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাড়তি অর্থ আসবে কোথা থেকে। কেননা, সরকারের রাজস্ব আয় অনেক কমে গেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে কর–জিডিপির অনুপাত বিগত সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে রাজস্ব–জিডিপি অনুপাত কমপক্ষে ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার। অথচ রাজস্ব আদায়ের গতি সাম্প্রতিক সময়ে এতটাই কমেছে যে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার। যেমন চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেই শেষ পর্যন্ত রাজস্বঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে আবার রয়েছে ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপ।
সুতরাং সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আয় বাড়ানো। তা করতে না পারলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করা যেমন যাবে না, ঋণ করে সরকারকে চলতে হবে, বাজেট-ঘাটতি সীমা ছাড়াবে, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, মূল্যস্ফীতিও কমানো যাবে না।
১২. টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া নয়
সরকার বাজেট-ঘাটতি মেটাতে সাধারণত ব্যাংকিং-ব্যবস্থা থেকে দুই ভাবে ঋণ নেয়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে সরকার ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে, যা ব্যাংকগুলো কিনে নেয়। এতে মূলত ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকাই সরকারকে ঋণ হিসেবে দেয় এবং সরকার পরে সুদসহ তা পরিশোধ করে।
অন্যদিকে সরকার সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ঋণ নিতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সরকারের ট্রেজারি বিল বা বন্ড কিনে বা ওভারড্রাফট সুবিধা দেয়, তখন নতুন রিজার্ভ মানি তৈরি হয়। এ কারণেই এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় ‘টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া’ বলা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার টাকা ছাপিয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও একীভূত পাঁচ ব্যাংককে বাঁচাতে ২২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন। তত্ত্বগতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বাজারে টাকার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়।
আয় কমে যাওয়ায় নতুন সরকারকেও ব্যাংক–ব্যবস্থা থেকেই বেশি হারে ঋণ নিতে হচ্ছে। দেখা গেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের অংশও কমে যায়। সুতরাং আয় বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে তেমন কোনো বিকল্প নেই।
রাজস্ব প্রশাসন নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ থেকে নতুন সরকার পিছিয়ে এসেছে। দাতাদের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রভাব কতটুকু পড়বে সেটিও হবে দেখার বিষয়। বর্তমান সংকট মেটাতে সরকারের নজর এখন বৈদেশিক ঋণের ওপরই বেশি।
১৩. ব্যাংক সংস্কার ছাড়া পথ নেই
ঋণের নামে অর্থ তুলে ফেরত না দেওয়া এবং অর্থ পাচার করার জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাংক খাতকে কিছু মানুষের হাতে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে ব্যাংক খাতে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। বিএনপি সরকারও নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাত নিয়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে, সুদহার যৌক্তিক করা, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন প্রদান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা ও তদারকির ভার বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দেওয়া, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ ও পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করা, উচ্চ খেলাপি ঋণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যাংকার ও করপোরেট নেতাদের সমন্বয়ে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে নানা বিতর্কও দেখা দিয়েছে। এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কবে বিলুপ্ত হবে; আর কখন কাদের সমন্বয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে, বাকি প্রতিশ্রুতি পূরণ কবে হবে—সেটিই দেখার বিষয়।
১৪. বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে খেলাপি ঋণ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতার শিকড় অত্যন্ত গভীরে। প্রভাবশালী, ওপর মহলে ভালো যোগাযোগ আছে ও ধনী—এমন কিছু ব্যবসায়ী ঋণ ফেরত দেওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করেন না। এমনকি বাংলাদেশে আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এখন নিচ্ছেন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান এসব ঋণগ্রাহক।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়, প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার তুলনায় অনেক বেশি।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সেই লুকানো খেলাপি ঋণই প্রকাশ্যে এনেছিলেন। যেমন দেশের মোট খেলাপি ঋণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরে নির্বাচন সামনে রেখে বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনঃ তফসিল করার সুযোগ দেওয়া হয়। এতে খেলাপি ঋণ কমে হয়েছে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই হার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।
১৫. নতুন গভর্নরের ওপর যত চাপ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নিয়োগ পান গত ২৫ ফ্রেব্রুয়ারি। তাঁর নিয়োগ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়েছে। আর যেভাবে সাবেক গভর্নরকে বিদায় দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও আছে তীব্র সমালোচনা।
দায়িত্ব পেয়েই গভর্নর সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন। প্রথম উদ্যোগটি সফল হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মূল্যস্ফীতি কমানোকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। এখন মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ না বাড়িয়ে তিনি সুদহার সমন্বয় কীভাবে করবেন, সেটিই হবে তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আহসান এইচ মনসুরের ওপর অখুশী ছিল বেশ কয়েকটি মহল। যে পাঁচটি ব্যাংককে তিনি একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, এর মালিকপক্ষ তাদের মধ্যে অন্যতম। সেই সব মালিকের বড় অংশ এখনো পলাতক, কেউ জেলেও আছেন। তাঁদের কেউ কেউ ফিরে আসারও চেষ্টা করছেন। পাঁচ ব্যাংককে সঠিকভাবে একীভূত করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর তা বর্তমান গভর্নরকেই করতে হবে।
সাবেক গভর্নর পাচার করা অর্থ ফেরত আনার একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। এ জন্য বড় ১১টি গ্রুপের আর্থিক অনিয়ম তদন্ত শুরু হয়েছিল। এই অর্থ ফেরত আনাও অত্যন্ত কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদি কাজ। যাঁরা অর্থ পাচার করেছেন, তাঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বিপুল সম্পদের মালিক। তাঁদেরও একটি অংশ আবার সক্রিয় হয়েছেন। এসব চাপও সামলাতে হবে নতুন গভর্নরকে। এ জন্য কতটা রাজনৈতিক সমর্থন তিনি পাবেন, সেটিও বড় প্রশ্ন। সর্বশেষ খবর হচ্ছে, প্রথম পর্যায়ে ছয়টি বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নের কথা বলা আছে। আরও বলা হয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা ও তদারকির ভার থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। এর প্রথম পরীক্ষা হবে সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পরিষদ পুনর্গঠনের সময়। গত আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছিল। বেসিক ব্যাংক, হলমার্কসহ অসংখ্য আর্থিক কেলেঙ্কারি ছিল তারই ফল। বিএনপি সরকার নতুন করে কাদের নিয়োগ দেয় এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কেমন হবে, সেটিও হবে দেখার বিষয়।
১৬. আর কোনো নতুন ব্যাংক নয়
বর্তমানে দেশে তফসিলি ব্যাংক ৬২টি। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সংখ্যা ৬টি এবং বেসরকারি ব্যাংক আছে ৪৩টি। দেশে প্রথম বেসরকারি ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এরশাদের আমলে (১৯৮২-৯০)। সে সময় মোট ৯টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরশাদ পতনের পরে বিএনপির প্রথম দফায় (১৯৯১-৯৬) দেওয়া হয়েছিল আটটি ব্যাংক। এরপর ক্ষমতায় এসে ( ১৯৯৬-০১) আওয়ামী লীগ ১৩টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বিএনপির দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা থাকার সময়টি (২০০১-০৬)। সে সময় অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বাজেটেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে আর কোনো নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হবে না। তখন প্রবল রাজনৈতিক চাপ থাকলেও কোনো নতুন ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে আওয়ামী লীগ এসে আবার ১৩টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়।
দেশে প্রায় সব ব্যাংকই দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। আবার একটি রাজনৈতিক সরকার এসেছে। আবারও চাপ আসবে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার। আবার অনেক দিন ধরে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে। শেষ পর্যন্ত কারা ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পাবেন, তা থেকেও রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
১৮. সামষ্টিক অর্থনীতি ধরে রাখাই হবে আসল পরীক্ষা
তবে সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় ফেলেছে ইরান যুদ্ধ। এর অনেক কিছুই সরকারের হাতের আওতায় নেই। এমনিতেই ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল এখনো কাটাতে পারেনি বাংলাদেশ। এখন তো ইরান যুদ্ধ কেবল বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বকেই কঠিন সংকটে ফেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় অর্থনীতির কৌশলী ব্যবস্থাপনা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, জ্বালানির বর্ধিত দাম, আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময়হারের ওপর চাপ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী থাকা, আপাতত প্রবাসী আয় বাড়লেও মধ্যমেয়াদ কমে যাওয়ার আশঙ্কা—এসবই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেবে। সব মিলিয়ে নতুন সরকার কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ভাগ্য।
প্রশ্নোত্তর
১. এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একসঙ্গে কয়েকটি চাপ সামাল দেওয়া—মূল্যস্ফীতি কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, ব্যাংক খাত সংস্কার করা এবং জ্বালানি খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা।
২. কেন মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, ব্যয় তার চেয়ে বেশি বাড়ছে। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমছে, বাজারে চাহিদা দুর্বল হচ্ছে।
৩. মূল্যস্ফীতির হার কমানো আর কর্মসংস্থান বাড়ানোর মধ্যে দ্বন্দ্ব কোথায়?
মূল্যস্ফীতির হার কমাতে সাধারণত সুদহার বাড়িয়ে রাখা হয়। এতে ঋণ ব্যয়বহুল হয়, বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। আবার কর্মসংস্থান বাড়াতে অর্থের জোগান বাড়ালে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। তাই সরকারের সামনে বড় কাজ হলো দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য আনা।
৪. প্রবৃদ্ধি নিয়ে এখন উদ্বেগ কেন?
কারণ, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। টানা তিন অর্থবছর ধরে প্রবৃদ্ধি কমেছে। এ অবস্থায় শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঘোষণা করলেই হবে না, আগে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে।
৫. দারিদ্র্য আবার কেন বড় আলোচনায় এসেছে?
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া বাস্তব আয় এবং দুর্বল কর্মসংস্থানের কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আবার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে।
৬. আয়বৈষম্য কেন অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের?
বাংলাদেশে জিনি অনুপাত বেড়ে ০ দশমিক ৪৯৯ হয়েছে। দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এর মানে, প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
৭. কর্মসংস্থানের সংকট কতটা গভীর?
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছেছেন; কিন্তু এ সময় চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। আবার ২০২৩ সালে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৮ শতাংশ; আর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে ছিল ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হলেও পর্যাপ্ত কাজ তৈরি হচ্ছে না।
৮. বিনিয়োগ বাড়ছে না কেন?
বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আস্থার ঘাটতি। এর সঙ্গে আছে জ্বালানিসংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা।
৯. ব্যাংক খাত এখন কেন এত বড় উদ্বেগের জায়গা?
কারণ, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল তদারকি এবং অর্থ পাচার—সব মিলিয়ে এটি এখন অর্থনীতির বড় দুর্বলতা।
১০. ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে?
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, টাকার ওপর চাপ বাড়তে পারে, মূল্যস্ফীতি আবার উসকে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি, প্রবাসী আয়, ভর্তুকি ব্যয় এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি—সব ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই এই যুদ্ধ নতুন সরকারের জন্য বড় এক বাহ্যিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।










