বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকেই মূলত ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। মে মাসজুড়ে ডলারের দাম বাড়ে আড়াই টাকা বা প্রায় ৩ শতাংশ। জুনেও এ ধারা অব্যাহত ছিল। তাতে জুন শেষে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সায়। ব্যাংকব্যবস্থায় গতকাল মঙ্গলবারও বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মে থেকে জুলাই—এ আড়াই মাসে ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়েছে ৭ টাকা বা ৮ শতাংশের বেশি। তার বিপরীতে গত ১৫ দিনের ব্যবধানে ইউরোর দাম প্রায় পৌনে ৪ টাকা বা ৪ শতাংশ কমেছে। তাতেই গত দুই দিনে ব্যাংকব্যবস্থায় ডলার ও ইউরোর দাম প্রায় সমান হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারেও গত মঙ্গলবার ডলার ও ইউরোর দাম সমান হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরো চালু হওয়ার পর থেকে গত ২৩ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম এ ঘটনা ঘটল। তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে এক ইউরো। ১৯৯৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর অভিন্ন মুদ্রা ইউরো চালু হয়।

ইউরোপের দেশগুলোতে ইউরোর ক্রমাগত দরপতন হতে থাকলে তাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। তখন তারা হয় পণ্যের দাম কম দিতে চাইবে, নয়তো আমদানি কমিয়ে দেবে। অথবা দুটিই হতে পারে
ফজলুল হক, সাবেক সভাপতি, বিকেএমইএ

ব্যাংকাররা বলছেন, এমনিতে করোনার কারণে ইউরোপের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলা চালায় রাশিয়া। তাতে পুরো ইউরোপের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে। কারণ, ইউরোপের দেশগুলোর গ্যাস–বিদ্যুতের বড় অংশই ছিল রাশিয়ানির্ভর। যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়া থেকে গ্যাস–বিদ্যুৎ কেনা কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি নানা ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয় রাশিয়ার ওপর। তাতে রাশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোও সংকটে পড়ে যায়। রাশিয়ার বদলে তাদের অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি শুরু করতে হয়। আমদানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় মুদ্রা তথা ইউরোর দরপতন ঘটে আর ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। এতে একদিকে ইউরোর মান কমতে থাকে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়তে থাকে ডলারের। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে একপর্যায়ে এসে এ দুটি মুদ্রার মান সমান হয়ে যায়।

বাংলাদেশের লাভ না ক্ষতি

বাংলাদেশেও ডলার ও ইউরোর মান সমান হয়ে যাওয়ায় তাতে বাংলাদেশের লাভ না ক্ষতি—এ প্রশ্নটি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরোর অব্যাহত দরপতন বাংলাদেশের জন্য কিছুটা উদ্বেগের। কারণ, বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলো। ইউরো ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকলে ইউরোপের দেশগুলো আমদানি কমিয়ে দিতে পারে। অথবা পণ্যের দাম কমিয়ে দিতে পারে। দুটির যেটিই হোক না কেন, তাতে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ইউরোর দাম কমে যাওয়াটা আমাদের জন্য উদ্বেগের খবর। কারণ, ইউরোপ আমাদের বড় ক্রেতা। এখন ইউরোপের দেশগুলোতে ইউরোর ক্রমাগত দরপতন হতে থাকলে তাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। তখন তারা হয় পণ্যের দাম কম দিতে চাইবে, নয়তো আমদানি কমিয়ে দেবে। অথবা দুটিই হতে পারে। তাই ইউরোর দরপতন আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ।’

একই শঙ্কার কথা জানান ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান। তিনি বলেন, রুশ–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলো মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ভিন্ন মুদ্রায় লেনদেনের দাবি ও বাস্তবতা

এদিকে ডলারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায় আমদানিকারকদের কেউ কেউ দাবি করছেন, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলার ছাড়াও অন্য কোনো মুদ্রায় লেনদেনব্যবস্থা চালুর। এ বিষয়ে সিমেন্টশিল্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি ও ক্রাউন সিমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি–রপ্তানির ক্ষেত্রে ডলারনির্ভরতার কারণে এখন আমরা আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কারণ, চাহিদা অনুযায়ী ডলার পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া গেলেও দাম বাড়তি। এমন পরিস্থিতিতে কিছু দেশের সঙ্গে আমরা অন্য মুদ্রায় লেনদেন করতে পারি কি না, সেটি ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে ভারত, চীনের সঙ্গে সেসব দেশের মুদ্রায় লেনদেনের বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। কারণ, এ দুই দেশের সঙ্গে আমাদের বড় ধরনের বাণিজ্য রয়েছে।’

তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ডলার ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তি করার মতো অবস্থায় বাংলাদেশ নেই। কারণ, বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপনির্ভর। ভারত, চীনের মতো দেশের সঙ্গে আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এ দুটি দেশ থেকে আমরা যতটা আমদানি করি, রপ্তানি করি তার তুলনায় সামান্য।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ভারত ও চীনের সঙ্গে আমাদের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ অসম। তাই ভারত কিংবা চীনের মুদ্রায় এই দুই দেশের সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেন নিষ্পত্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন