বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সুদহার কিছুটা কম। মানুষের হাতেও টাকা জমেছে। সামনে মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কায়ও অনেকে এখনই ফ্ল্যাট কিনছেন। এর ফলে ঋণ বিতরণ বেড়ে গেছে।
মমিনুল ইসলাম, এমডি আইপিডিসি ফাইন্যান্স।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার প্রভাবে যাঁদের আয় কমেনি, আবার ঘোরাঘুরির খরচও বেঁচে গেছে, তাঁদের অনেকেই ফ্ল্যাট কিনছেন। কারণ, এখন আবাসন ঋণে সুদ তুলনামূলক কম। আবার সামনে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কাতেও অনেকেই তাড়াহুড়া করে ফ্ল্যাট কিনছেন বা বুকিং দিচ্ছেন।

নিজের একটি ফ্ল্যাট হবে—এটা মধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের কাছে এক বড় স্বপ্ন। তাঁদের এ স্বপ্ন পূরণে এখন হাতছানি দিয়ে ডাকছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ জন্য প্রায় সবাই গ্রাহকদের দীর্ঘ মেয়াদে আবাসন ঋণ দিতে নেমেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তো গ্রাহকের আবেদন পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ঋণ অনুমোদন দিচ্ছে। তবে অধিকাংশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের পরিচয় ভালোভাবে জেনে ও তাঁর চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই করে নেয়।

দেশে ২০২০ সালের এপ্রিলে সুদের হার ৯ শতাংশ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেন তা আরও কমানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সেই সঙ্গে আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বেশির ভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ঋণের সুদহার সাড়ে ৮ শতাংশে নামে। তবে ইদানীং সবার মধ্যে সুদহার বাড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও তা ৯ শতাংশের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক নিজেরা ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের ঋণও কিনে নিচ্ছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকায় সে ক্ষেত্রে সুদ কিছুটা কম নিচ্ছে। সার্বিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবাসন ঋণ বিতরণে জোর দেওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও নতুন ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

করোনার শুরুতে আবাসন ঋণে যে ধাক্কা এসেছিল, এখন তা থেকে খাতটি পুরো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ঋণের চাহিদাও আছে।
মাহীয়ুল ইসলাম, রিটেইল বিভাগের প্রধান ব্র্যাক ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আবাসন খাতে ঋণ বিতরণে শীর্ষ ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে আইএফআইসি, ডাচ্-বাংলা, প্রাইম, ব্র্যাক, দি সিটি, ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক প্রভৃতি। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং (ডিবিএইচ), আইপিডিসি, আইডিএলসি, ন্যাশনাল হাউজিং, লংকাবাংলা এগিয়ে আছে।

জানতে চাইলে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয় মাস ধরে বাড়ি কেনার ঋণের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর কারণ, সুদহার কিছুটা কম। মানুষের হাতেও টাকা জমেছে। সামনে দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায়ও অনেকে এখনই ফ্ল্যাট কিনছেন। এর ফলে ঋণ বিতরণ বেড়ে গেছে। গত দুই বছরে আমরা একাই প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি।’

মমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা আগামী বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতি মাসে ৬০ কোটি টাকা ও এর বাইরে ৩০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এটা সফল হলে আমাদের এ খাতে ঋণ দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যাবে।’

দেশে আবাসন ঋণের সুদহার কমিয়ে প্রথম বড় আলোচনায় আসে বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংক। ২০১৫ সালের শুরুর দিকেও ব্যাংকটি যেখানে গৃহঋণের বিপরীতে ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদ নিত, সেখানে ডিসেম্বরে তা কমিয়ে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশে নামিয়ে আনে। তখন ব্যাংক খাতে সুদহার ছিল ১৫ শতাংশের ওপরে। এর ফলে কম সুদে ঋণ বিতরণে সাফল্য আসে। গ্রাহকেরা সবচেয়ে বেশি আবাসন ঋণ নেন আইএফআইসি ব্যাংক থেকে। ব্যাংকটির ‘আমার বাড়ি’ নামে আলাদা একটি পণ্য রয়েছে। এ ব্যাংক বাড়ি নির্মাণে ২ কোটি ও সেমিপাকা ভবন নির্মাণে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়। আইএফআইসি ব্যাংকের দেখাদেখি অন্যান্য ব্যাংক আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এ পথে হাঁটতে শুরু করে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহককে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (লিজিং কোম্পানি) আগে থেকেই গ্রাহকের চাহিদামতো ঋণ দিতে পারছে। ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনও (বিএইচবিএফসি) ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সুদের হারও কম সরকারি এ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ফ্ল্যাট কেনার এ ঋণে খেলাপি কম হয় এবং ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ফ্ল্যাট ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর সংকটে না পড়লে কেউ ফ্ল্যাটের মালিকানা হারাতে চান না। তাই ব্যাংকগুলো দিন দিন এ ঋণে মনোযোগ দিচ্ছে।

সিটি ব্যাংক এখন প্রতি মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকার আবাসন ঋণ দিচ্ছে এবং সামনের বছরে মাসে ৮০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। এ ছাড়া আগামী রিহ্যাব মেলায় তাৎক্ষণিকভাবে ঋণ অনুমোদন করা হবে।

জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান অরূপ হায়দার বলেন, ‘আমরা এখন কম সময়েই ঋণ অনুমোদন করছি। করোনার আগের তুলনায় আবাসন খাতে ঋণ বিতরণ তিন গুণ বেড়েছে, যা সামনের বছরে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করেছি। আবাসন খাতে ঋণ বাড়াতে আমরা জনবল বাড়িয়েছি।’

ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল বিভাগের প্রধান মাহীয়ুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার শুরুতে আবাসন ঋণে যে ধাক্কা এসেছিল, এখন তা থেকে খাতটি পুরো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ঋণের চাহিদাও আছে। ফলে প্রতি মাসে এখন ৩০-৪০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হচ্ছে। করোনার আগে প্রতি মাসে ঋণ বিতরণ হতো ৮-১০ কোটি টাকা।’

নথিপত্র যা লাগবে

বাড়ি নির্মাণ ঋণের জন্য প্রথমেই দরকার যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার সত্যায়িত ফটোকপি, মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান, খাজনা রসিদের সত্যায়িত ফটোকপি। এ ছাড়াও সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ানের সত্যায়িত কপি এবং জেলা বা সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের ১২ বছরের তল্লাশিসহ নির্দায় সনদ (এনইসি) লাগে। সরকার থেকে বরাদ্দ পাওয়া জমির ক্ষেত্রে মূল বরাদ্দপত্র এবং দখল হস্তান্তরপত্র দেখাতে হয়।

ফ্ল্যাট কেনার ঋণের জন্য অবশ্য কাগজপত্র কম লাগে। এ জন্য ফ্ল্যাট ক্রেতা ও ডেভেলপারের মধ্যে সম্পাদিত ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করার চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি দিতে হয়। এ ছাড়া জমির মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, অনুমোদিত নকশা ও অনুমোদনপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি এবং ফ্ল্যাট কেনার রেজিস্ট্রি করা বায়না চুক্তিপত্রের মূলকপি ও বরাদ্দপত্র লাগবেই।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন