ডেইমলার ও মেব্যাচের ঠিক এক বছর আগে ১৮৮৪ সালে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে বাটলার পেট্রল সাইকেল নামে একটি মোটরসাইকেলের ধারণা দেন যুক্তরাজ্যের এডওয়ার্ড বাটলার। ওই বছরেই লন্ডনের ‘স্ট্যানলি সাইকেল শো’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে তিনি গাড়িটির বিষয়ে নিজের পরিকল্পনা প্রদর্শন করেন। ১৮৮৮ সালে গ্রিনউইচের মেরিওয়েদার ফায়ার ইঞ্জিন কোম্পানি এই মোটরসাইকেল তৈরি করে।

বাটলার পেট্রল সাইকেলটি ছিল মূলত একটি থ্রি-হুইলার, অর্থাৎ ত্রিচক্রযান, তথা তিন চাকার গাড়ি। এটির চালকের বসার আসন ছিল সামনের চাকার মাঝ বরাবর ওপরে। বাটলারের উদ্ভাবন শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কারণ, মোটরসাইকেলটি উৎপাদন ও বিপণনের জন্য তিনি আর্থিক সহায়তা পাননি।

সেই যুগে অনেক কর্তৃপক্ষই বাষ্পচালিত, বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল বা ডিজেলচালিত দুই চাকার গাড়িকে ‘মোটরসাইকেল’-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দিয়েছে। তবে তারা ডেইমলার রিতওয়াগেনকে বিশ্বের প্রথম মোটরসাইকেল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করেনি। এটি প্রথম ব্যবহারিক মোটরসাইকেল হওয়াটাই ছিল স্বীকৃতি পাওয়ার কারণ।

যদি স্টিম বা বাষ্পচালিত দুই চাকার একটি গাড়িকে মোটরসাইকেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রথম মোটরসাইকেল ছিল ফ্রান্সের মিশক্স-পেরেঅক্স। ১৮৬৭ সালে এটি উদ্ভাবন করেন পিয়েরে মিশক্স লুইস ও গিলোমে পেরেঅক্স। এ গাড়ির জন্য পেটেন্ট পেতে আবেদন করা হয় ১৮৬৮ সালের ডিসেম্বরে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের সিলভেস্টার এইচ রোপার রক্সবেরি তৈরি করেন রোপার স্টিম ভেলোসিপিড নামের গাড়ি। তিনি ১৮৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে এক মেলা ও সার্কাসে তাঁর গাড়িটি প্রদর্শন করেন। রোপার ১৮৬০ থেকে ১৮৯৬ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বাষ্পীয় ইঞ্জিনযুক্ত প্রায় ১০টি গাড়ি ও মোটরসাইকেল তৈরি করেন।

বিশ্বের প্রথম মোটরসাইকেল কোম্পানি হলো জার্মানির মিউনিখভিত্তিক হিল্ডেব্র্যান্ড ও উলফমুলার কোম্পানি। তারা ১৮৯৪ সালে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। এর দুই বছরের মাথায় ১৮৯৬ সালে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে যুক্তরাজ্যের এক্সেলসিয়র মোটর কোম্পানি। এটি ছিল মূলত বাইসাইকেল কোম্পানি।

মোটরসাইকেলের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের এক্সেলসিয়র মোটর কোম্পানির মতো বাইসাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রথম দিকে মোটরসাইকেল তৈরির ব্যবসায়ে হাত দেয়। এসব কোম্পানি, বিশেষ করে তাদের সাইকেলের নকশায় অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিন সংযোজন করে। এর ফলে নতুন নকশায় বাইসাইকেলকে ছাড়িয়ে যায়। এভাবে মোটরসাইকেল নির্মাতাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

উনিশ শতকের একেবারে শেষ দিকে ব্যাপকহারে মোটরসাইকেল উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের ট্রুইম্ফ মোটরসাইকেল ১৮৯৮ সালে মোটরবাইক উৎপাদন শুরু করে। ১৯০৩ সাল নাগাদ কোম্পানিটি পাঁচ শতাধিক মোটরবাইক তৈরি করে।

ভারতে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু হয় ১৯০১ সালে। এর দুই বছর পর মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক হিসেবে যাত্রা শুরু করে হার্লে-ডেভিডসন কোম্পানি। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বের বৃহত্তম মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক হিসেবে আবির্ভূত হয় ভারতীয় কোম্পানি, যারা প্রতিবছর ২০ হাজারেরও বেশি মোটরবাইক তৈরি করত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর দ্রুত যোগাযোগ ও সরবরাহের বাহন হিসেবে মোটরবাইকের ব্যবহার শুরু হয়। এতে মোটরসাইকেলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯১৫ সালে বাজারে মডেল এইচকে প্রথম ‘আধুনিক মোটরসাইকেল’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফোর-স্ট্রোক ইঞ্জিনের এই মোটরবাইক ব্যবহারকারীদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে তখন এটির ডাকনাম দেওয়া হয় ‘বিশ্বাসযোগ্য বিজয়’। এর বদৌলতে হার্লে-ডেভিডসন ১৯২০ সাল নাগাদ মোটরসাইকেলের বৃহত্তম নির্মাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। তখন বিশ্বের ৬৭টি দেশে তাদের তৈরি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। ব্রিটিশ মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক চ্যাটার-লিয়া ১৯২৪ সালে নিয়ে আসে ১০০ মাইল গতির মোটরসাইকেল, যা রেসারদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

স্বাচ্ছন্দ্যকর পরিবহন হিসেবে বিশ্বের সব দেশেই মোটরসাইকেলের ব্যবহার রয়েছে। এর মধ্যে চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো জনবহুল দেশগুলোয় মোটরসাইকেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। বর্তমানে মোটরস্কুটার ও দুই বা তিন চাকা মিলিয়ে বিশ্বে আনুমানিক ২০ কোটি মোটরসাইকেল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গত ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখের ওপরে।

সূত্র: উইকিপিডিয়া ও বাইসাইকেল হিস্ট্রি ডট নেট

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন