বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত সোমবার এই ক্রেতা-বিক্রেতার কথোপকথনের সময় রফিক মিয়ার কাছে ব্রয়লারের দাম অস্বাভাবিক হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এর আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। এখন চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়েছে।’

এরপর সরেজমিন তালতলা কাঁচাবাজারেও দেখা গেল একই চিত্র। দুই বাজারেই প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগেও ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। অন্যদিকে পাকিস্তানি কক মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা, যেটা এক মাস আগে ছিল ২০০ থেকে ২১০ টাকা। এ ছাড়া গত এক মাসে প্রতি কেজি লেয়ার মুরগির দাম ২১০-২২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৪০-২৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৩৮০ টাকা থেকে ৪২০ টাকায় উঠেছে।

পোলট্রিশিল্পে অস্থিরতার কারণ নিয়ে খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁরা বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে পোলট্রির চাহিদা কমতে থাকে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সবকিছু ছিল স্থবির। সারা দেশে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর আবার পোলট্রি পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি। ফলে বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে।

জানতে চাইলে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল হক বলেন, চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ না থাকায় পোলট্রির বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। আর পোলট্রির মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পোলট্রি ফিড ভুট্টা, সয়ামিলসহ এই খাতের কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য বলছে, করোনার আগে সারা দেশে প্রতি সপ্তাহে পোলট্রি মুরগির আড়াই কোটি বাচ্চা উৎপাদিত হতো। সেটি কমে এখন ১ কোটি ২৫ লাখে নেমেছে। অর্থাৎ, উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমে গেছে। তাই বাজারে ব্রয়লারের দাম বেড়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে তাদের কাছ থেকে নিবন্ধন নেওয়া খামারির সংখ্যা ৮৫ হাজার ২২৭। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, করোনার আগে সারা দেশে খামারির সংখ্যা ছিল দেড় লাখের মতো। তবে করোনার কারণে কতটি খামার বন্ধ হয়েছে, সেই তথ্য কারও কাছে নেই।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জনজীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসায় হোটেল-রেস্তোরাঁ খুলেছে। দেশজুড়ে বিয়েশাদি বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস চালু হয়েছে। নির্মাণশিল্পেও কাজের গতি এসেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলেছে। সব মিলিয়ে সারা দেশেই ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

জানতে চাইলে বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু সে হারে সরবরাহ বাড়েনি। সরবরাহ বাড়তে আরও কিছু সময় লাগবে। নভেম্বরের শেষের দিকে গিয়ে পোলট্রির দাম স্বাভাবিক হবে। তিনি আরও বলেন, পোলট্রি ফিডের কাঁচামালের দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম কমে আসার পাশাপাশি খামারিরা যখন আবার পুরোদমে খামার চালু করবেন, তখন দাম কমবে।

জানা গেছে, গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টার দাম ৫০ শতাংশ, সয়ামিলের দাম ৪৪ শতাংশ ও কাঁচামাল পরিবহনের খরচ ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। সার্বিকভাবে কাঁচামালের দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ, যার প্রভাব পড়েছে পোলট্রিশিল্পের ওপর।

২০১৯ সালে করোনার আগে লক্ষ্মীপুর সদরে পোলট্রি খামার করেন তারিকুল ইসলাম। করোনা মহামারি শুরুর পর দীর্ঘ ১০ মাস খামার বন্ধ ছিল। খামার আবার চালু করেছেন ঠিকই, কিন্তু পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশ বিপাকেই পড়েছেন এই খামারি। তিনি বলেন, নারিশ পোলট্রি ফিড ৫০ কেজির এক বস্তার দাম করোনার আগে ছিল ২ হাজার ২৫০ টাকা (প্রতি কেজি ৪৫ টাকা)। সেই বস্তা এখন কিনতে হচ্ছে, ২ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি কেজি ফিডের এখন দাম পড়ছে ৫৪ টাকা।

এদিকে পোলট্রির কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বেশ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এর কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করতে শুরু করেছেন। এমন বাস্তবতায় দাম স্বাভাবিক রাখতে ১২ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পোলট্রি তৈরির অন্যতম কাঁচামাল সয়ামিল রপ্তানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রভাবে দেড় বছরে পোলট্রিশিল্পের ক্ষতি হয়েছে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা। এ খাতে ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন