default-image

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা একসময় ট্রেড ইউনিয়নের নাম শুনলেই আঁতকে উঠতেন। নিজেদের কারখানায় ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেই সেটি ঠেকাতে নানা পন্থা অবলম্বন করত মালিকপক্ষ। সে কারণেই ১৯৮৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে মাত্র ১৩৮টি ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয়। অবশ্য রানা প্লাজা ধসের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আন্তর্জাতিক চাপে একের পর এক ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন হওয়া শুরু হয়। ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে এক শর বেশি ইউনিয়ন নিবন্ধিত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে নানা পন্থায় ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। তবে নিবন্ধিত ইউনিয়নের বেশির ভাগই কাগুজে, অর্থাৎ কারখানা পর্যায়ে অস্তিত্ব নেই। সাধারণ শ্রমিকেরা যেন সংগঠন করতে না পারে সে জন্য মালিকপক্ষই পছন্দের শ্রমিক দিয়ে ইউনিয়ন নিবন্ধন করিয়ে নিচ্ছে। তাতে সহায়তা করছে কিছু শ্রমিকনেতা। অন্যদিকে ইউনিয়ন করতে গেলেই সাধারণ শ্রমিকেরা হয়রানির মুখে পড়ছেন। ছাঁটাই ও মারধরেরও শিকার হচ্ছেন কেউ কেউ। আবার আইনের মারপ্যাঁচে অনেক প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়নের আবেদন বাতিলের ঘটনাও ঘটছে।

বিজ্ঞাপন

বছর বছর বিপুলসংখ্যক ট্রেড ইউনিয়ন হলেও শ্রমিকেরা কোনো সুফল পাচ্ছেন না বলে স্বীকার করলেন শ্রমিক সংগঠন ও পোশাকশিল্পের মালিকদের একাধিক নেতা। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, মালিকদের নানা কৌশলের কারণে কাগুজে ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত শ্রম অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। আর মালিকপক্ষের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ একটি দল ইউনিয়নের আবেদন করছে। আবেদন প্রত্যাহারের জন্য তাঁরা মালিকদের কাছে টাকা দাবি করে। অনেক মালিক সেই ফাঁদে পা-না দেওয়ায় ইউনিয়ন নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়ছে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানায়, পোশাক খাতে বর্তমানে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ১ হাজার ৩৩। তার মধ্যে ৮৯৫টি গঠিত হয়েছে রানা প্লাজা ধসের পর। ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৮৮টি ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধিত হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে ২০১৯ সালে—১২৪টি। গত বছর করোনাকালেও নিবন্ধন পেয়েছে ৯৯টি ইউনিয়ন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ৬২টি ইউনিয়ন নিবন্ধন পেয়েছে।

default-image

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিনের উদ্যোগ সত্ত্বেও মালিক ও শ্রমিকদের বিশ্বাসের ঘাটতি কমানো যায়নি। সে জন্য লোক দেখানোর প্রক্রিয়ার মতো ট্রেড ইউনিয়ন হচ্ছে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে পর আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ ও পোশাকশ্রমিকদের অধিকার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তখন কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক জোট নতুন করে চাপ তৈরি করে। ফলে সরকার ইউনিয়ন নিবন্ধনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।

বর্তমানে যেসব ইউনিয়ন হচ্ছে সেগুলো কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শহীদউল্লাহ আজিম। তিনি গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন দিয়ে শ্রমিকদের দুই পয়সারও লাভ হচ্ছে না। তবে শ্রমিকদের সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদান, মাতৃত্বকালীন ছুটি ইত্যাদির বিষয়ে কমপ্লায়েন্স কারখানার পক্ষে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

ট্রেড ইউনিয়ন ঠেকাতে যা হচ্ছে

গাজীপুরের টঙ্গীর একটি পোশাক কারখানার ৫৩৩ জন শ্রমিক গত বছরের ৪ নভেম্বর ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য ঢাকার বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরে আবেদন করেন। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি আবেদনটি মিথ্যা ও ভুয়া দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে অধিদপ্তর। পুনরায় নিবন্ধনের জন্য আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু করলে ৭ জানুয়ারি প্রস্তাবিত ইউনিয়নের সভাপতি আক্কাস আলী, সাধারণ সম্পাদক শাহীন আলমসহ ২০ জনকে চাকরিচ্যুত করে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। চাকরিচ্যুত ২০ জনের মধ্যে ৬ জন পাশের একটি কারখানায় যোগ দেন ১৭ জানুয়ারি। ১৩ দিন পর সেখান থেকেও চাকরি হারান তাঁরা। কারণ, আগের কারখানা থেকে প্রস্তাবিত ইউনিয়নের ২০ জনের ছবিসহ তালিকা পাঠানো হয়। তারপর দ্বিতীয় কারখানাটির কর্তৃপক্ষ বলে দেয়, ‘আমরা তোমাদের কাজে রাখতে পারব না।’

কারখানাটির প্রস্তাবিত ওই ইউনিয়নের সভাপতি আক্কাস আলী ও সাধারণ সম্পাদক লিখিতভাবে ইউনিয়ন বাতিল ও শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতির অভিযোগ করে যথাক্রমে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকার শ্রম পরিচালকের কাছে আবেদন করেন। প্রতিকার না পেয়ে তাঁরা শ্রম আইনে মামলা করেন। নতুন করে ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্যও আবেদন করা হয়। বর্তমানে সেটি প্রক্রিয়াধীন।

তথ্যপ্রমাণসহ ঘটনাটি প্রথম আলোকে জানায় বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন। তারাই কারখানাটির প্রস্তাবিত ট্রেড ইউনিয়নের সার্বিক বিষয় তদারকি করছে। ফেডারেশনটির সভাপতি বাবুল আখতার গত মঙ্গলবার অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্রসলাইনের সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও মালিকপক্ষ না চাওয়ায় সেখানে ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন মেলেনি। আসলে শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মালিকদের যোগসাজশের কারণে সত্যিকারের ইউনিয়ন করা খুবই কঠিন। গত তিন বছরে ২০টি ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য আবেদন দিলেও পেয়েছি মাত্র একটি।’

বাবুল আখতারের অভিযোগের সূত্র ধরে আমরা শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল লতিফ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে ৫৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা ছাড়া ইইউ ও আইএলওর চাপও আছে। প্রায়ই কিছু অভিযোগ আসে। অনেকে মহৎ উদ্দেশ্য, অনেকে আবার অসৎ উদ্দেশ্যেও আবেদন করে। কিছু আবেদন পরে এগিয়ে নিতে চান না শ্রমিকনেতারা। মালিকপক্ষের সঙ্গে হয়তো তাদের আপস হয়। এসব ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কিছুই করার নেই।

হেমায়েতপুরে অবস্থিত পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় একটি গ্রুপের কারখানায় ইউনিয়নের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন। আবেদনের পর সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে প্রস্তাবিত ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। এমনকি ইউনিয়নের অফিস গুটিয়ে নিতে বাধ্য করে মালিকপক্ষ। এরপরও নিজেদের পছন্দের লোকজনদের দিয়ে আবেদন করে ইউনিয়নের নিবন্ধন নিয়ে নেয় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, সুস্থ ধারার ট্রেড ইউনিয়ন করার পরিবেশ নেই। ইউনিয়ন করতে গেলেই শ্রমিকদের হুমকিধমকি দেওয়া হয়। চাকরির পাশাপাশি এলাকাছাড়াও করা হয়। তিনি বলেন, প্রকৃত ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেই মালিকপক্ষ টাকা য়সা খরচ করে বাতিল করার ব্যবস্থা করে।

বিজ্ঞাপন

আইনের মারপ্যাঁচ

চার বছর আগেও ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য একটি কারখানার ৩০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর লাগত। এতে ইউনিয়ন করা ছিল একপ্রকার দুঃসাধ্য। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শ্রমিক সংগঠনের চাপে সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে ২০১৮ সালে। বর্তমানে ২০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর নিয়েই ইউনিয়ন করা যাচ্ছে। তবে তার আগেই শ্রম আইনের বিধিমালায় ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিধিমালার আগে ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য আবেদনপত্র, কমিটির তালিকা, কমিটির সদস্যদের বিস্তারিত তথ্য, সদস্যদের নাম, বয়স, পদবি ও কারখানার পরিচয়পত্র দিলেই হতো। বিধিমালায় ইউনিয়নের সদস্য ফরমে পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানে সাধারণ সদস্যদের নাম, পিতা বা স্বামী ও মায়ের নাম, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, কারখানায় যোগদানের তারিখ, কারখানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিতে হয়। কোনো কারখানায় ১০ হাজার শ্রমিক থাকলে ২০ শতাংশ হারে ২ হাজার শ্রমিকের ফরম কম্পিউটারে পূরণ করে স্বাক্ষর নিতে হয়। কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপিও চাওয়া হয়। তা ছাড়া ইউনিয়নের আবেদনের সঙ্গে দুটি বৈঠকের কার্যবিবরণী, গঠনতন্ত্র, কমিটি, সদস্যদের তালিকা ইত্যাদি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কাগজপত্রগুলো প্রথমে অনলাইনে আপলোড করার পর বিভাগীয় শ্রম দপ্তরে জমা দিতে হয়। জমা দেওয়ার সময় প্রস্তাবিত ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সশরীর হাজির থাকতে হয়। তারপর শ্রম দপ্তর কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে শ্রমিকের সংখ্যা, নাম, আইডি কার্ড নম্বর ও স্বাক্ষরের সত্যায়িত কপি চায়। সেটি পাওয়ার পর ইউনিয়নের আবেদনে থাকা শ্রমিকের তথ্যাদি ও স্বাক্ষর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।

কয়েকজন শ্রমিকনেতা অভিযোগ করেন, আইনি জটিলতার কারণে সহজেই ইউনিয়ন নিবন্ধন বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ পান মালিকেরা। তার মধ্যে অন্যতম বিগত কয়েক মাসে চাকরি ছেড়ে যাওয়া শ্রমিকদের সংযুক্ত করে সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া। যাতে প্রস্তাবিত ইউনিয়নে ২০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা পূরণ না হয়।

জানতে চাইলে ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সালাউদ্দিন স্বপন প্রথম আলোকে বলেন, আইনে প্রতিটি কারখানায় তিনটি ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকলেও একটির পর মালিকেরা আর করতে দিচ্ছেন না। সেটিও আবার মালিকেরা নিজেরাই করে নিচ্ছেন। কাগজে–কলমের ট্রেড ইউনিয়নের কারণে সাময়িকভাবে কারখানার মালিকেরা লাভবান হচ্ছেন।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন