সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে ট্যানারিমালিকেরা ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, চামড়াশিল্প নগরী বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সরকারের এই সংস্থাই কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণে নিয়োগ করে চীনা ঠিকাদার। তারাই যথাযথভাবে সিইটিপি নির্মাণের আগেই সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে মালিকদের বাধ্য করে। তাই পরিবেশদূষণের বিষয়ে মালিকদের কোনো দায় নেই। আর ট্যানারি বন্ধ করলে শ্রমিক বেকার হবেন, মালিকেরাও ঋণগ্রস্ত হয় পড়বেন। অন্যদিকে চামড়া রপ্তানিতেও ধস নামবে।

শিল্পনগরী বন্ধ করাটা কোনো সমাধান হবে না। এটি চালু রেখেই কীভাবে পরিবেশদূষণ বন্ধ করা যায়, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করব। রাতারাতি তো অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।
জাকিয়া সুলতানা, শিল্পসচিব

অবশ্য পরিবেশদূষণ হলেও চামড়াশিল্প নগরী বন্ধ করার পথে না হাঁটার ইঙ্গিত দিলেন শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা। গত মঙ্গলবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী এখনো পাইনি। সেটি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শিল্পনগরী বন্ধ করাটা কোনো সমাধান হবে না। এটি চালু রেখেই কীভাবে পরিবেশদূষণ বন্ধ করা যায়, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করব। রাতারাতি তো অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে সিইটিপি ৮০ শতাংশ কার্যকর করতে পেরেছি আমরা।’

দূষণের দায় কার

ঢাকার হাজারীবাগে থাকাকালে ট্যানারিগুলো দিনে প্রায় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় ফেলত। এ ছাড়া চামড়ার উচ্ছিষ্ট বেড়িবাঁধের পাশে, খালে, জলাধারে ও রাস্তার পাশে ফেলা হতো। এই সমস্যার সমাধানে শিল্প মন্ত্রণালয় ২০০৩ সালে চামড়াশিল্প নগর প্রকল্প হাতে নেয়। ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অধীনে সাভারের হেমায়েতপুরে ১৯৯ একর জমি অধিগ্রহণ করে ১৫৪টি ট্যানারিকে প্লট দেওয়া হয়।

৫৪৭ কোটি টাকায় সিইটিপি নির্মাণের জন্য ২০১২ সালে একটি চীনা কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেয় বিসিক। ১৮ মাসে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ৯ বছরের বেশি সময় নেয়। তা–ও সিইটিপি যথাযথ মান অনুযায়ী হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

দফায় দফায় সময় বেঁধে দেওয়ার পরও মালিকেরা সিইটিপি প্রস্তুত নয় এমন যুক্তিতে ট্যানারিগুলো সাভার শিল্পনগরে নিতে চাইছিলেন না। অবশেষে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল সেবা-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ট্যানারিগুলোকে হাজারীবাগ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সাভারেও ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণের অভিযোগ ওঠে। সিইটিপি যে ‘অকার্যকর’, তা উঠে এসেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনে। গত ২৯ আগস্ট ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে বলা হয়, সিইটিপি অকার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নালা দিয়ে ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পরিবেশদূষণ নিয়ে বিসিকের কর্মকর্তারা বলেন, মালিকেরা বর্জ্য নির্গমনের নিয়ম মানেন না। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকেরা বলেন, সিইটিপি নির্মাণ ও পরিচালনা করছে বিসিক। ফলে দায়ও তাদের।

সমাধান কোথায়

সাভার চামড়াশিল্প নগরে বিসিকের তৈরি সিইটিপির দৈনিক বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। সাভারে ভরা মৌসুমে দিনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদিত হয়।

এমন তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সিইটিপির সক্ষমতা অনুযায়ী ট্যানারিগুলো থেকে বর্জ্য নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করেও সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। বড় কয়েকটি ট্যানারি স্বতন্ত্র ইটিপি করলে সিইটিপির ওপর চাপ কমবে।

এদিকে দেশে যে পরিবেশসম্মত ট্যানারি তৈরি করা সম্ভব, তা দেখিয়েছে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার। গাজীপুরে তাদের জুতার কারখানার ট্যানারি ইউনিট এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া। চামড়াশিল্প নগরেও অ্যাপেক্সের যৌথ বিনিয়োগের ট্যানারি আছে। ২০১৭ সালেই তারা এ কারখানায় আলাদা ইটিপি নির্মাণের অনুমতি চেয়েছিল। একইভাবে ইটিপি করার অনুমতি চায় বে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই তা পায়নি।

জানতে চাইলে অ্যাপেক্স ট্যানারির নির্বাহী পরিচালক এম এ মাজেদ গতকাল বলেন, ‘সাভারের চামড়াশিল্প নগরে যত চামড়া প্রক্রিয়াজাত হয়, তার প্রায় অর্ধেকই করে অ্যাপেক্স, বে ও ঢাকা হাইডস’—এই তিন ট্যানারি। তারা যদি আলাদা ইটিপি করে, তাহলেই সিইটিপির ওপর চাপ কমে যাবে। সে কারণে আমরা আবেদন করেছিলাম। যথাসময়ে অনুমোদন পেলে দেড় বছরের মধ্যে আমরা ইটিপি করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু নিত্যনতুন শর্ত দিয়ে আমাদের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন