বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার জিএম অ্যান্ড জেসি কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বেতন ও বোনাসের দাবিতে শনিবার থেকে অবস্থান নেন। কারখানার ভেতরেই রাত যাপন করেছেন তাঁরা। কারখানার ভেতরেই পানি-বিস্কুট খেয়ে ইফতারি ও সাহ্‌রি করেছেন শ্রমিকেরা। রোববার বেলা দুইটায়ও কারখানার ভেতরে শ্রমিকেরা অবস্থান করছিলেন। বেতন-বোনাস না নিয়ে কারখানা ছাড়বেন না বলে জানিয়েছেন শ্রমিকেরা।

গত সোমবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর পল্লবীর কটন টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস নামের একটি কারখানার শ্রমিকেরা বকেয়া মজুরির দাবিতে মিরপুর ১১ নম্বর সড়কে অবস্থান নেন। একই দাবিতে ইন্ট্রাকো ডিজাইন ও ইন্ট্রাকো ফ্যাশন—এই দুই কারখানার শ্রমিকেরা উত্তরার জসিমউদ্দিন-আজমপুর সড়ক অবরোধ করেন। তিন কারখানার শ্রমিকেরা দাবি করেছেন, তাঁদের ২-৩ মাসের মজুরি পাওনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কটন টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস বেতন-ভাতা দিলেও ইন্ট্রাকো ডিজাইন ও ইন্ট্রাকো ফ্যাশন শ্রমিকদের উৎসব ভাতা দিতে পারেনি।

সস্তা শ্রমবাজার হওয়ায় বিদেশি ক্রেতা ও দেশীয় কারখানার মালিকদের অনেকে বিভিন্নভাবে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করেন। বকেয়া বেতন-ভাতার জন্য সড়কে নামলেই শ্রমিকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠান পুলিশের সদস্যরা। উল্টো দিকে অপরাধ করলেও কোনো পোশাককারখানার মালিককে পুলিশের পিটুনিতে হাসপাতালে যেতে হয়েছে, সেই নজির নেই।
নাজমা আক্তার, শ্রমিকনেত্রী

ঈদের আগেই কেন সমস্যা হয়
১০ বছরের মধ্যে শুধু করোনাকালের একটি বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছিল। বাকি সব বছরই তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ হাজার ৯০৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে সেই রপ্তানি বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি ডলার। তার মানে গত ১০ বছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৬৪ শতাংশ।

বছর বছর পোশাক রপ্তানি বাড়লেও ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতার দাবিতে কেন সড়কে নামতে হয়, সে বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, সস্তা শ্রমবাজার হওয়ায় বিদেশি ক্রেতা ও দেশীয় কারখানার মালিকদের অনেকে বিভিন্নভাবে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করেন। বকেয়া বেতন-ভাতার জন্য সড়কে নামলেই শ্রমিকদের পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠান পুলিশের সদস্যরা। উল্টো দিকে অপরাধ করলেও কোনো পোশাককারখানার মালিককে পুলিশের পিটুনিতে হাসপাতালে যেতে হয়েছে, সেই নজির নেই।

শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়ে যেসব মালিক প্রতারণা করেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি করেন নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, কারখানাগুলো যদি ঈদের ছয় মাস আগে পরিকল্পনা করে এগোয়, বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা হওয়ার কথা না। তারপরও শেষ মুহূর্তে কোনো কারখানা আটকে গেলে সরকারের শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে শ্রমিকের অর্থ পরিশোধ করা যেতে পারে। তা ছাড়া শ্রমিকদেরও সংগঠিত হবে। সংগঠন করতে হবে। যৌথ দর-কষাকষিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন এই শ্রমিকনেত্রী।

পোশাকশিল্পের অধিকাংশ কারখানাই শনিবার ছুটি হয়েছে। ওই দিন বিজিএমইএর একজন নেতা জানান, চট্টগ্রামে তাঁদের সংগঠনের সদস্য তিন পোশাক কারখানা এপ্রিলের মজুরি দেয়নি। অন্যদিকে বিকেএমইএর একজন নেতা জানান, তাঁদের সদস্য গাজীপুরে ড্রিম অ্যান্ড ড্রেস নিটওয়্যার ও এনটিকেসি নিটওয়্যার—এই দুই কারখানার বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা আছে।

অবশ্য এতে প্রকৃত চিত্র বোঝা যাচ্ছে না। আশুলিয়া-সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা ও কুমিল্লায় ৯ হাজার ১৭৬টি শিল্পকারখানা রয়েছে। তার মধ্যে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা কমপক্ষে ২ হাজার ৬৮৮। শিল্প পুলিশ এসব কারখানা তদারক করে।

শনিবার রাতে শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ৮৩ শতাংশ শিল্পকারখানা এপ্রিল মাসের ১৫ দিনের মজুরি দিয়েছে। আর ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে ৯৫ শতাংশ শিল্পকারখানা। বেতন-ভাতা পরিশোধ না করার শিল্পকারখানার মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র খাতের অনেকগুলো কারখানা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বললে, শনিবার পর্যন্ত পোশাক ও বস্ত্র খাতের ১৫টি কারখানা বোনাস এবং ৬০টি কারখানা এপ্রিল মাসের অর্ধেক মজুরি পরিশোধ করেনি।

সব কারখানার আর্থিক সক্ষমতা এক রকম না। অনেক সময় বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ আসতে বিলম্ব হয়। আবার ব্যাংকও অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে না। সে কারণে ঈদের আগের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তবে তদারকির কারণে এ ধরনের ঘটনা আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে।
শহিদউল্লাহ আজিম, সহসভাপতি, বিজিএমইএ

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম প্রথম আলোকে বলেন, সব কারখানার আর্থিক সক্ষমতা এক রকম না। অনেক সময় বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ আসতে বিলম্ব হয়। আবার ব্যাংকও অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে না। সে কারণে ঈদের আগের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তবে তদারকির কারণে এ ধরনের ঘটনা আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে।

সারা বছর কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করলেও বছরের দুই ঈদের আগে বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে কিছু কারখানা আর্থিক সংকটে পড়ে। কেন কারখানাগুলোর হাতে সঞ্চয় থাকে না, এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে বিজিএমইএর এই নেতা বলেন, কারও হাতেই সঞ্চয় থাকে না। কারণ, কারখানার মালিকেরা মুনাফার অর্থ বাড়ি নিয়ে যান না, পুনরায় বিনিয়োগ করেন। এভাবেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বড় হয়েছে। ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধের সমস্যা সমাধানে তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, অধিকাংশ কারখানাই ১-২টি ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করে। ফলে প্রতিটি ক্রয়াদেশের রপ্তানি অর্থের একটি ছোট্ট অংশ যদি ব্যাংক কেটে রেখে সংশ্লিষ্ট কারখানার নামে গচ্ছিত রাখে; বেতন-ভাতা পরিশোধসহ যেকোনো সংকটকালে সেই অর্থ আবার দিতে পারে।

শুধু যে ঈদের আগেই বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা হয়, তা-নয়। সারা বছরই কমবেশি সমস্যা থাকে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) ঢাকা কার্যালয়ে শ্রমিক ও কর্মীরা যত অভিযোগ করেন, তার বেশির ভাগই বেতন-মজুরি না পাওয়া এবং ছাঁটাইয়ের পর পাওনা না দেওয়া-সংক্রান্ত। ২০২১ সাল ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাস মিলিয়ে ১৩ মাসে ৮০২ জন শ্রমিক-কর্মী ডিআইএফইর ঢাকা কার্যালয়ে অভিযোগ করেছেন। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর ৯১ শতাংশ অভিযোগই মজুরি ও পাওনা না দেওয়া নিয়ে।

কিছু কারখানার মালিকের মানসিকতা এমন যে তাঁরা ঈদ এলেই সুযোগ নেন। কখনো কখনো ছোট কারখানাগুলো ঈদের আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে আন্দোলন হলে নামমাত্র কিছু পয়সা দিয়ে শ্রমিকদের বিদায় করা হয়। এভাবে কৌশল করে শ্রমিকদের ঠকানো হয়।
বাবুল আক্তার, শ্রমিকনেতা

জানতে চাইলে শ্রমিকনেতা বাবুল আক্তার বলেন, কিছু কারখানার মালিকের মানসিকতা এমন যে তাঁরা ঈদ এলেই সুযোগ নেন। কখনো কখনো ছোট কারখানাগুলো ঈদের আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে আন্দোলন হলে নামমাত্র কিছু পয়সা দিয়ে শ্রমিকদের বিদায় করা হয়। এভাবে কৌশল করে শ্রমিকদের ঠকানো হয়। আইনি ফাঁকফোকরের কারণেও মালিকদের সুযোগ নেওয়া সহজ হয়। ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন এই শ্রমিকনেতা।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বাবুল আক্তার বলেন, এবার মাসের শুরুতে ঈদ হওয়ায় এপ্রিলের অর্ধেক মজুরি পেয়েছেন শ্রমিকেরা। সাধারণত মাস শেষে সাত কর্মদিবসের মধ্যে বেতন পান শ্রমিকেরা। তবে মাসের শেষ বা শুরুতে ঈদ হলে বেতন কত দিনের দেওয়া হবে, সে বিষয়ে শ্রম আইন বা বিধিমালায় কিছু বলা নেই। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কমপক্ষে ২০ দিনের বেতন পাওয়া উচিত। আবার উৎসব ভাতার পরিমাণ কত হবে, সে বিষয়ে শ্রম বিধিমালায় জটিল সমাধান দেওয়া হয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, উৎসব ভাতা মূল মজুরির বেশি হতে পারবে না। তবে কত কম হবে, সেটি আবার বলা হয়নি। সে জন্য মালিকেরা নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী উৎসব ভাতা দিতে পারেন। আবার আইনে আছে, চাকরির বয়স এক বছরের কম হলে শ্রমিকেরা উৎসব ভাতা পাবেন না। অথচ কারখানাগুলোতে মোট শ্রমিকের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশের চাকরির বয়স এক বছরের কম। তার মানে, বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আইনিভাবে উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত।

বাবুল আক্তার দাবি করেন, মালিকপক্ষ নিজেদের আর্থিক ও রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে আইন ও বিধিমালা নিজেদের মতো করে। শ্রমিক নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ায় কাজটি সহজেই করতে পারে তারা। এ জন্য মালিকেরাই বেশি সুবিধা ভোগ করেন। আইনের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যান তাঁরা। শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হোন। সে জন্যই শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন