কৃষিবাণিজ্য
ফাইটোস্যানিটারির মান রক্ষায় নতুন প্রকল্প
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য এবং এফএওর আইপিপিসি স্বাক্ষরকারী হিসেবে বাংলাদেশকে ফাইটোস্যানিটারির আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে।
কৃষিক্ষেত্রে স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারির (এসপিএস) আন্তর্জাতিক মান যথাযথভাবে বজায় রাখতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যথাযথভাবে এই মান বজায় না থাকায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বাণিজ্যে সমস্যা হচ্ছে। নতুন প্রকল্পটির নাম ‘বাংলাদেশে ফাইটোস্যানিটারি ট্রেড কমপ্লায়েন্স উন্নতকরণ’।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এক অনলাইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ এবং থাইল্যান্ডের এশিয়া প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটসের (এপিএএআরআই) পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশে ফাইটোস্যানিটারি ট্রেড কমপ্লায়েন্স উন্নতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড ও ভারতের বিশেষজ্ঞ এবং অংশীদারেরা অংশ নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসডিএর সহায়তায় সম্প্রতি তৈরি করা ‘বাংলাদেশের ফাইটোস্যানিটারি ক্যাপাসিটি মূল্যায়ন’ থেকে জানা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে কৃষিক্ষেত্রে স্যানিটারি এবং ফাইটোস্যানিটারির (এসপিএস) আন্তর্জাতিক মান যথাযথভাবে বজায় না রাখার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বাণিজ্যে সমস্যা হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য ব্যবসার সুযোগ যথাযথভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
প্রকল্পটির আওতায় কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং অন্য সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো হবে। তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং সহযোগিতাও বাড়ানো হবে। বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি খাতের শিল্পের প্রয়োজনকে সমর্থন করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যোগসূত্র স্থাপন করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে, যা বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (আইপিএম) মাধ্যমে বালাই দমনে একটি সংহত পরিচালনা পদ্ধতি যেমন জৈব বালাইনাশক নিবন্ধনে নিয়ন্ত্রণ এবং কীটনাশকের সর্বাধিক অবশিষ্টাংশের পরিমাণ (এমআরএল) সম্পর্কিত বাণিজ্যে নন–কমপ্লায়েন্স ইস্যুগুলোর সীমারেখা টানা ও মেনে চলায় সহায়তা প্রদান করবে। এতে বাণিজ্য–সম্পর্কিত ইস্যুগুলোতে সচেতনতা বাড়বে।
প্রকল্পের ভার্চ্যুয়াল ইনসেপশন ওয়ার্কশপে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ডিএই, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বেসরকারি খাত, আঞ্চলিক সংস্থা, বিভিন্ন অংশীদার, সমিতি, বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা আলোচনায় অংশ নেন। প্রকল্পের উদ্দেশ্য, বিষয় ও লক্ষ্যগুলো ব্যাখ্যা করেন এপিএএআরআইয়ের নির্বাহী রবি খেতারপাল, বায়োপেস্টিসাইড অ্যান্ড অর্গানিক সাপোর্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাইকেল ব্র্যাভারম্যান।
বৈঠকে বালাই ঝুঁকি বিশ্লেষণসহ (পিআরএ) বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এ ছাড়া এমআরএল বিশ্লেষণের দক্ষতা, যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তা; এমআরএলের বিষয় নিষ্পত্তি করে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি বৃদ্ধিসহ কোডেক্স কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে সমন্বয়, উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং ট্রেসাবিলিটি নিশ্চিতকরণ, বাজারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে অংশীদারদের সচেতনতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট (পিসি) সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, এমন বিষয় আলোচনায় আসে।
কর্মশালাটির উদ্বোধনকালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘কর্মশালার আলোচনা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভালো ধারণা পাওয়া গেছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানো।’ তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার, ডিএইএ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) মধ্যে সার্বিক সহযোগিতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চলতি বছরে তা আরও গভীর হবে।
ডিএইর মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ জানান, ‘ডিএইর কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ তৈরি করা হবে। আইনের কোনো দুর্বলতা থাকলে তা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জৈব বালাইনাশকের প্রয়োগ বাড়ানো ও এমআরএলের একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনা রাখা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসডিএর বৈদেশিক কৃষিবিষয়ক সেবার আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম বিশেষজ্ঞ জেসি মুডজিটাবা ফার্নান্দেজ বলেন, ‘বিজ্ঞানভিত্তিক কমপ্লায়েন্স এবং আন্তর্জাতিক এসপিএস বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য প্রবেশাধিকারে বাধা দূর করবে। বিশ্ব রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতায় দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করবে। যা উচ্চমানের কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে গ্রামীণ আয়ের উন্নতির ভিত্তি স্থাপন করবে।’
ইউএসডিএর অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাটাচি টাইলার ব্যবকক বলেন, বাংলাদেশের ‘জাতীয় উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কর্তৃপক্ষ’ নামে নতুন সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্ববাজারে কৃষি ও পরিবেশসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক কৃষি সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়াতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের কৃষির মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এপিইডিএ) ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্য বিবেচনার দিক থেকে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে শাকসবজি, আলু, পান, ফল ও চাল। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা মোট ১৭২টি পণ্যের মধ্যে ৭০টিই শস্যভিত্তিক। পাকিস্তানে সবজি বীজ এবং সৌদি আরবে আলু বীজ রপ্তানির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। এই সম্ভাবনা প্রসারের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্যদেশ এবং এফএওর আইপিপিসি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ফাইটোস্যানিটারির আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডগুলো অনুসরণ করতে হবে। প্রকল্পটি শুল্কবিহীন প্রতিবন্ধকতা, এসপিএস ও আইপিপিসির প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। এ জন্য প্রাসঙ্গিক নির্দেশিকা বা এসওপি তৈরিতে মানসম্পন্ন পরিচালনা পদ্ধতি গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ওই সব বাধা দূর করতে কাজ করবে। প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টিন আইন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এনপিপিওর প্রযুক্তিগত, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং কার্যক্ষমতা উন্নত করার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রকল্পটির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কোয়ারেন্টিন প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, ওয়েবভিত্তিক এসপিএস তথ্যসমৃদ্ধ একটি পোর্টাল তৈরি ও পরিচালনা এবং আইপিএম সিস্টেমের অংশ হিসাবে এমআরএলের তীব্রতা কমিয়ে আনা ও জৈব কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমন্বিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই একটি কার্যকর এনপিপিও প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে। এখন এনপিপিও বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও ইতিবাচক পর্যায়ে নিতে ভূমিকা রাখবে।