বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় টেপকোকে না রাখার দাবি

জাপানি প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানিকে (টেপকো) বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ বিদ্যুৎ খাতে বেশ কিছু কাজ করছে। আবার এই টেপকো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি) প্রণয়ন করেছে ২০১০ সালে। ফলে জাপানের এ সংস্থাটি এমনভাবে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের পরিকল্পনা করেছে, যাতে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করা যায়। এটি স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিষ্কার নিদর্শন। এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা সংশোধনপ্রক্রিয়ায় জাপানি প্রতিষ্ঠান টেপকোকে পরামর্শক হিসেবে আর বিবেচনা না করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের ৫০টি নাগরিক সংগঠন ও জলবায়ু আন্দোলনকারী প্ল্যাটফর্ম।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে এই ৫০টি সংগঠন স্বাক্ষরিত চিঠিটি ই–মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান সাবের হোসেন চৌধুরীর কাছে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মটেগি তোশিমিৎসু, জাইকা প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিটাওকা এবং টেপকো প্রেসিডেন্ট তোমোয়াকি কোবাকাওয়ার কাছে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে।

টেপকো স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে চিঠিতে এমন অভিযোগ এনে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের পরে টেপকো মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন পরামর্শক এবং আনোয়ারা-মাতারবাড়ী ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন প্রকল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটি মাতারবাড়ী আরও একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে যুক্ত হওয়ার জন্যও প্রতিযোগিতা করছে। এ ছাড়া টেপকো হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণ, ডেসকোর জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড সাবস্টেশন, বিদ্যুৎ খাতের ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রভৃতি প্রকল্পের বাস্তবায়নের সঙ্গেও জড়িত।

সংগঠনগুলোর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে টেপকোর গুরুতর স্বার্থের সংঘাত রয়েছে, যে কারণে তাকে পরবর্তী মহাপরিকল্পনার সংশোধনকাজে সংযুক্ত করা যায় না। এ ছাড়া সংগঠনগুলো পরিকল্পনাধীন সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পিএসএমপিতে সংযুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, ২০১০ সালে দেশের প্রথম বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানি প্রতিষ্ঠান টেপকো পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। ওই মহাপরিকল্পনায় ভবিষ্যতের বিদ্যুতের চাহিদা অবাস্তব ধরা হয়েছে স্বীকার করে টেপকো ২০১৬ সালে এর সংশোধনপ্রক্রিয়ায় জড়িত হয়। দেশের বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশোধিত পরিকল্পনায়ও বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি দেখানো হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গত এক দশকে বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম প্রতিনিয়ত কমে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশে সৌরশক্তি থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেগাওয়াট এবং অফশোর বায়ু থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে কম হবে।
অন্যদিকে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় ২০১০ অনুসারে, ২০৩০ সাল নাগাদ টেপকো মাত্র ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ২০১৬ সালের সংশোধিত পিএসএমপিতে সেটিকে ২০৪১ সাল নাগাদ মাত্র ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ সংশোধনে এটিকে আরও কমিয়ে ৩.৮ শতাংশ করা হয়েছে। টেপকো ইচ্ছা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এনে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে, যাতে তারা বাংলাদেশে নিজেদের ব্যবসা বাড়াতে পারে।

স্বাক্ষরকারী বাংলাদেশের সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র), নাগরিক সংহতি, গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান প্রভৃতি। এ ছাড়া জাপান সেন্টার ফর আ সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোসাইটি (জ্যাকসেস), ফ্রেন্ডস অব আর্থ জাপান, উর্গেওয়াল্ড জার্মানি, অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল ইউএস, গ্রোথওয়াচ ইন্ডিয়া, এনজিও ফোরাম অন এডিবি প্রভৃতি বিদেশি সংগঠন চিঠিটি সই করে।