default-image

একে তো ৩০ লাখ টাকার সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ি, তার ওপর রক্ষণাবেক্ষণ, তেল খরচ ও চালকের বেতন বাবদ মাসে ৫০ হাজার টাকা দিচ্ছে সরকার। উপসচিব থেকে সচিব মর্যাদার সরকারি কর্মচারীরা তিন বছর আগে থেকেই এমন সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু সুবিধাটির ব্যাপক অপব্যবহার করছেন একশ্রেণির প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, একশ্রেণির কর্মকর্তা গাড়ি ঠিকই কিনছেন, কিন্তু তা পরিবারের সদস্যদের জন্য। সেসব গাড়ির জন্য মাসে মাসে জ্বালানি খরচও নিচ্ছেন তাঁরা। আর নিজেরা চলাফেরা করছেন সরকারি কমন গাড়িতে। অথচ যাঁরা গাড়ি কেনার জন্য ঋণ পান না, তাঁদের জন্যই কমন গাড়িগুলো বরাদ্দ।

এসব অনিয়ম রোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের এ পর্যন্ত তিন দফা চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতিই হয়নি।
‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা, ২০২০ (সংশোধিত)’ অনুযায়ী, গাড়ির সুবিধার প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হচ্ছেন উপসচিব পদে কমপক্ষে তিন বছর পার করেছেন এমন কর্মকর্তা, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব ও সিনিয়র সচিব।

বিজ্ঞাপন

সরকার গাড়ি ঋণ বিষয়ে প্রথমে ২০১৭ সালের জুনে নীতিমালা করে। এরপর সরকারি কর্মকর্তাদের স্বার্থে ওই বছরের আগস্ট–সেপ্টেম্বরে তিন দফায় এবং সর্বশেষ চলতি বছরে আরেকবার নীতিমালাটি সংশোধন হয়।

নীতিমালা অনুযায়ী একজন কর্মকর্তা একবারই ঋণ পাবেন। কোনো প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর থেকে গাড়ির সুবিধা পেলেও ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে ঋণের টাকায় গাড়ি কিনলে অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে।

ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ ১২০টি সমান কিস্তিতে, অর্থাৎ ১০ বছরে আদায়যোগ্য। ফলে ৩০ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা, যা ঋণগ্রহীতার প্রতি মাসের বেতন থেকে সরকার কেটে রাখে। এককালীনও এই ঋণ পরিশোধ করা যায়।
কিন্তু এক বছর না যেতেই ঋণ নিয়ে অনিয়ম শুরু হয়। তা দূর করতে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর, ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর এবং এ বছরের ৮ মার্চ সতর্ক করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাছে চিঠি পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দুই মাস আগে ২৩ সেপ্টেম্বর দুদকও চিঠি দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিছু কিছু কর্মকর্তা সুদমুক্ত ঋণের গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন অধিদপ্তর, সংস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়িতে করে অফিসে যাতায়াত করছেন। কেউ কেউ পারিবারিক কাজেও গাড়ি ব্যবহার করছেন। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ ৫০ হাজার টাকা করে তুলে নিচ্ছেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

বিষয়টি রোধে সুদমুক্ত ঋণের অর্থে কেনা গাড়ির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ও সরকারি গাড়ি অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। নীতিমালার ব্যত্যয় ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে।

অপব্যবহার রোধে নির্দেশনা

সুবিধার অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা নিতে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। এগুলো হচ্ছে ১০০ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় গ্রহণের ক্ষেত্রে সুদমুক্ত ঋণের অর্থে কেনা গাড়ি ব্যবহার করতে হবে; মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্পের যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না; প্রেষণ, মাঠ প্রশাসন, প্রকল্পে কর্মরত কোনো কর্মকর্তার সার্বক্ষণিক সরকারি যানবাহন ব্যবহারের সুবিধা থাকলে সুদমুক্ত ঋণের অর্থে কেনা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে নির্ধারিত অর্থের ৫০ শতাংশ পাবেন ও কর্মস্থলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সুদমুক্ত ঋণের অর্থে কেনা গাড়ি ব্যবহার করতে হবে।

জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী গাড়ি কেনা ও ব্যবহারের বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে একশ্রেণির সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি এমন চিঠি দিয়ে থাকে, তাহলে শুরুর দিকে তাদের চিহ্নিত করে তিরস্কার করা যেতে পারে। বিধি লঙ্ঘনের ধরন দেখে আরও কঠিন ব্যবস্থাও আসতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন