বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিজয়পুরে অবস্থিত এই সমিতির কারখানায় তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের মাটির সামগ্রী। যেমন-ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি, ফুলদানি, খাবার প্লেট, বল-বাটি, টব, মনীষীদের প্রতিকৃতি, দেয়াল প্লেট ইত্যাদি। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হয় বিজয়পুরের মাটির সামগ্রী। গ্রামের কুমারেই এখানে কাজ করেন। তারাই বানান এসব দৃষ্টিনন্দন মৃৎশিল্প। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে কুমারদের কর্মযজ্ঞ। সম্প্রতি বিজয়পুরের এই সমিতির কারখানা ঘুরে সরেজমিনে এই কর্মযজ্ঞ দেখা গেছে।
মৃৎশিল্পের এই কারখানা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়; আবার ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠানও নয়। ৬০ বছরে আগে এটি আশপাশের সাতটি গ্রামের দরিদ্র কুমারেরা সমবায়ের ভিত্তিতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নয়, ধনিদের দয়া দক্ষিণ্যে নয়-নিভু নিভু মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখছেন নিজেরাই। করোনাকালেও তাদের দমাতে পারেনি।

যেভাবে যাত্রা শুরু

কুমিল্লার বিজয়পুর অঞ্চলের সাতটি গ্রামে শত শত বছর ধরে দরিদ্র পাল সম্প্রদায় বা কুমারদের বসবাস। দক্ষিণ বিজয়পুর, উত্তর বিজয়পুর, গাঙকুল, টেকুরিয়া পাড়া, নোয়াপাড়া, বারোপাড়া ও দুর্গাপাড়া-এই সাত গ্রাম এক সময় শতভাগ পরিবারের সদস্যরা পেশায় কুমার ছিলেন। মাটির জিনিসপত্র বানানোকেই বংশপরম্পরায় পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। ষাটের দশকের শুরুতে মৃৎশিল্প ধীরে ধীরে হুমকির মুখে পড়তে থাকে। ১৯৬১ সালে কুমিল্লা বার্ডের প্রতিষ্ঠাতা আখতার হামিদ খানের পরামর্শে ও সহযোগিতায় বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি গঠন করা হয়। প্রথমে এর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ২৪৯। সবাই আশপাশের গ্রামের পাল সম্প্রদায়ের লোক।

এবার দেখা যাক, অর্থের জোগান কীভাবে আসে। কারণ, মৃৎশিল্পের কারখানার জন্য বিলের মাটি কেনা, কুমারদের মজুরি, কাঁচা মাটির জিনিসপত্র পোড়ানো-এসব কাজে প্রতিনিয়ত অর্থের জোগান দিতে হয়। সমিতির সব সদস্য প্রতি সপ্তাহে ২০ টাকা জমা রাখেন। প্রতি বছর ১০০ টাকার কমপক্ষে চারটি শেয়ার কেনেন। এভাবে ঠিক রাখা হয় টাকার প্রবাহ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২০ লাখ টাকার আমানতের স্থিতি আছে। প্রতি বছর সদস্যরা লভ্যাংশ পান। নিজেদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত নয় সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদও আছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও সমিতির সদস্য ৭৫ শতাংশ লভ্যাংশ পেয়েছেন।

সবাই যেন শিল্পী

সম্প্রতি বিজয়পুরের মৃৎশিল্প কারখানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কারখানার ভেতরে থরে থরে সাজানো কাচা মাটির জিনিসপত্র। কোথাও ফুলের টব, কোথাও দইয়ের ভাঁড়, আবার কোথাও মাটির শো পিস। পোড়ানোর অপেক্ষায় আছে এসব মৃৎশিল্প। আশপাশের গ্রামের ৬০ থেকে ৭০ মৃৎশিল্পী একমনে বসে কাজ করছেন। কেউ কাঁচা মাটিতে আঁচড় ফেলে অবয়ব বানাচ্ছেন। কেউবা মাটির জিনিসপত্র দৃষ্টি নন্দন করতে শেষ আঁচড় দিচ্ছেন। এই সময় কথা হলো মৃৎশিল্পী হরে কৃষ্ণ পালের সঙ্গে। তিনি জানান, গত ৩৫ বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকায় সংসার চলে। তিনি নিজে প্রতিদিন ১০-১২টি মাটির পাত্র বানাতে পারেন।
জানা গেছে, প্রতি মাসে এই কারখানা থেকে কমপক্ষে ১০-১২ লাখ টাকার মাটির জিনিসপত্র বেচাকেনা হয়। কুমিল্লা শহরের পাইকাররা কিনে নিয়ে সারা দেশে সরবরাহ করেন। দামও বেশ সস্তা। যেমন-দইয়ের কাপ ৩ টাকা, দইয়ের বাটি সাড়ে আট টাকা, শো পিছ আকারভেদে ২০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।

মৃৎশিল্পীদের এই সমিতির যাত্রা শুরুর প্রায় বিশ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮০ সালে প্রথম বিজয়পুরের মাটির শোপিস ইউরোপে রপ্তানি হয়। এখন প্রতি বছর গড়ে আট থেকে দশ লাখ টাকার দৃষ্টিনন্দন মাটির শো পিস যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে যায়। করোনার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে সাত লাখ টাকার পণ্য বিদেশে গেছে।

টিকে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা

বিজয়পুরের মৃৎশিল্পীরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছিল গত বছর করোনার সময়। ওই সময় মৃৎশিল্প কারখানাটি প্রায় তিন মাস বন্ধ ছিল। তখন এখানে কর্মরত কুমারদের মাসিক মজুরির তিন ভাগের এক ভাগ মজুরি দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। পরে ২০২০ সালের জুলাই মাসে কারখানা আংশিক চালু হয়। তখন দৈনিক হাজিরা মজুরির পাশাপাশি মজুরির ৫০ শতাংশ করোনা ভাতা দেওয়া হয়। একজন শ্রমিক মাসে ১০ দিন কাজ করলে ১০ দিনের মজুরি পেতেন। পাশাপাশি মজুরির ৫০ শতাংশ করোনা ভাতা হিসেবে পেতেন। এবারের পূজায় বোনাসও দেওয়া হয়।

আশপাশের বিলের মাটি থেকে সংগ্রহ করে তা দিয়ে এসব মৃৎশিল্প বানানো হয়। জানা গেছে, এখন আশপাশের বিলগুলো মাছ চাষের জন্য ব্যবহার হওয়ায় আগের মতো মাটি সহজলভ্য নয়। ফলে প্রায়ই মাটির সংকটের পড়তে হয়।
এ ছাড়া বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতির কারখানায় গ্যাসের চুলায় কাচা মাটির জিনিসপত্র পোড়ানো হয়। কিন্তু ২০১৫ সালের পর পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ নেই। গ্যাস না পেলেও প্রতি মাসে ন্যূনতম বিল গুনতে হয়; আবার লাকড়ির চুলায় পোড়াতে হয়। এতে খরচ বাড়ছে।

বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি তাপস কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, এক সময় সাত গ্রামের প্রায় শতভাগ পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। এমন প্রায় সাড়ে সাত শ পরিবার ছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে তাঁরা পেশা পরিবর্তন শুরু হয়। কারণ, সামাজিক মানমর্যাদাও কম, আবার আয়-রোজগারও কম। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন।

গাঙকুল গ্রামের বিকাশ পাল তিন বছর আগে পেশা পরিবর্তন করে ভ্যান চালাতে শুরু করেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, দৈনিক ১০০-১৫০ টাকা আয় দিয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো কঠিন। তাই পেশা পরিবর্তন করেছেন তিনি।
তবে এখনো বিজয়পুর অঞ্চলে শ খানেক পরিবারের সদস্যরা এই পেশায় টিকে আছেন। বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমিতির বাইরেও পরিবার পর্যায়ে কিছু মৃৎশিল্প তৈরি হয়। এরা মূলত দইয়ের কাপ ও বাটি বানায়।

জানা গেছে, রুদ্রপাল সমবায় সমিতির কারখানা নয়; একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও আছে। গত কয়েক বছরে এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫০ জন মৃৎশিল্পী বিভিন্ন দেশে গেছেন। এই সমিতি ১৯৯১,১৯৯৮ ও ২০১১ সালে জাতীয় সমবায় পুরস্কার পান।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন