বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কুমিল্লা শহরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা কমেছে বলে জানান সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাই বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা কমেছে। এ ছাড়া রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় বাদ্যযন্ত্র কিনতে সবাই এখন ঢাকামুখী হন।

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই শহরে প্রথম বাদ্যযন্ত্রের দোকান ছিল উপমহাদেশের বিখ্যাত ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর। ষাটের দশকের শুরুতে শহরের বাদুরতলা এলাকার সিংহ প্রেসের নিচে ছিল তাঁর দোকান। সেখানে হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি—সবই পাওয়া যেত। কিন্তু ১৯৬৭ সালে ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ মারা যাওয়ার পর দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে কুমিল্লায় মাত্র চারটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান আছে। এগুলো হলো তারক মিউজিক, মিউজিক স্ট্যান্ড, দাস অ্যান্ড কোং ও কনক মিউজিক। সব কটি দোকান কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্র রানীরবাজার এলাকায়। তবে কোনোটিরই ব্যবসা আগের মতো নেই। কুমিল্লার শহরের অন্যতম পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের দোকান হলো তারক মিউজিক। নীহার রঞ্জন আচার্য নামের এক সংগীতপ্রেমী ১৯৬৫ সালে রানীরবাজার এলাকায় তারক মিউজিক নামে এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। কিন্তু আগের মতো রমরমা বেচাকেনা আর নেই তারকের। গত বছরের অক্টোবরে নীহার রঞ্জন আচার্য মারা যান। এরপর তাঁর কনিষ্ঠ সন্তান শিউলি আচার্য ব্যবসার হাল ধরেন।

default-image

২৬ অক্টোবর দুপুরে রানীরবাজারে তারক মিউজিকে গিয়ে দেখা গেছে, দোকানভর্তি হারমোনিয়াম, বাঁশি, গিটার, তবলা। ব্যবসা কেমন চলছে, জিজ্ঞাসা করতেই শিউলি আচার্য বলেন, করোনার কারণে আগের মতো ব্যবসা নেই। বাদ্যযন্ত্র শৌখিন বস্তু। করোনা এই শৌখিনতা কেড়ে নিয়েছে।

নতুন বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি পুরোনো যন্ত্র সারাইয়ের কাজও করে তারক মিউজিক। শিউলি আচার্য জানান, করোনার আগে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে সংগীতপ্রেমীরা আসতেন। সব মিলিয়ে মাসে দু-তিন লাখ টাকার বেচাকেনা হতো। কিন্তু করোনা শুরুর পর ব্যবসা কমতে শুরু করে। এখন মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেচাকেনা হয়।

তারক মিউজিকের পরই মিউজিক স্ট্যান্ডে ঢুঁ মারলাম। সেখানেও দোকানভর্তি হারমোনিয়াম, বাঁশি, গিটার, তবলার সমাহার। এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু ১৯৯০ সালে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী প্রিন্স চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, করোনার আগপর্যন্ত পরপর দুই বছর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শচীন দেববর্মন প্রদর্শনী হয়। তিনি বলেন, এই শহরে এখন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা কমছে। করোনার আগে যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র বিক্রি ও সারাইয়ে ১০-১২ হাজার টাকার আয় হতো, সেখানে তা কমে এখন ৪-৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের দোকানে হারমোনিয়াম, তবলা ও বাঁশি বানানোর জন্য আলাদা কারিগর আছেন; যাঁরা দোকান কিংবা দোকানের পেছনে বসে কাজ করেন। হারমোনিয়াম কারিগরের একটি হারমোনিয়াম বানাতে সাত দিন সময় লাগে। এ জন্য মজুরি পান দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। করোনার কারণে হারমোনিয়ামসহ বাদ্যযন্ত্র বেচাকেনা কমে যাওয়ায় এখন যন্ত্র সারাইয়ের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। ফলে কারিগরদের আয়ও কমে গেছে।

কেন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা কমছে, তা জানতে যোগাযোগ করা হয় কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন সংলাপ কুমিল্লার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, কুমিল্লায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে গেছে। আগে শিল্পকলা একাডেমিতে প্রতিদিনই নানা অনুষ্ঠান লেগে থাকত। এখন তা আর দেখা যায় না। শিল্পীদের নিয়মিত চর্চা না থাকলে বাদ্যযন্ত্রের চাহিদাও কমে যায়। এ ছাড়া ইলেকট্রিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে সনাতনী ও ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে। তিনি মনে করেন, সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানো গেলে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা আবার বাড়বে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন