বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রচুর ক্রয়াদেশ থাকায় দুই পালায় উৎপাদন চালানো সহজ হয়েছে। অবশ্য শ্রমিকসংকটের কারণে দ্বিতীয় পালার কাজ পুরোদমে শুরু করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
ফজলুল হক, বস্থাপনা পরিচালক, প্লামি ফ্যাশনস

প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানায় সুইং শাখায় দ্বিতীয় পালায় কাজ বা উৎপাদন করার অতীত ইতিহাস নেই। ফলে পুরো বিষয়টিতে শ্রমিকদের অভ্যস্ত হতে সময় লেগেছে। তবে বর্তমানে নারী শ্রমিকেরা বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রচুর ক্রয়াদেশ থাকায় দুই পালায় উৎপাদন চালানো সহজ হয়েছে। অবশ্য শ্রমিকসংকটের কারণে দ্বিতীয় পালার কাজ পুরোদমে শুরু করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।

বিদায়ী ২০২০–২১ অর্থবছরে প্লামি ফ্যাশনস ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। দ্বিতীয় পালা শুরুর ফলে চলতি বছর না হলেও পরের বছর রপ্তানি দ্বিগুণ হবে বলে প্রত্যাশা করছেন ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘করোনার আগে আমরা কারখানার দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলাম। সেখান থেকে সরে এসে এখন দুই পালায় কারখানা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং হলেও ব্যয়সাশ্রয়ী বলে মন্তব্য করলেন তিনি।

প্লামি ফ্যাশনসের মতো কয়েকটি পোশাক কারখানা দ্বিতীয় পালা চালু করেছে। আরও কয়েকটি কারখানাও এই পরিকল্পনা করছে। তবে অনেক কারখানা সক্ষমতা বাড়িয়েছে করোনাকালে। মূলত করোনার প্রথম ধাক্কার পর পোশাকের বিপুল ক্রয়াদেশ আসতে শুরু করে। তখন বাড়তি ক্রয়াদেশের পণ্য প্রস্তুত করতে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা নানাভাবে কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে শুরু করেন।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম প্রথম আলোকে বলেন, প্লামি ফ্যাশনসের পাশাপাশি ঊর্মি, এসকিউ গ্রুপ ও নিট এশিয়া গ্রুপ সম্প্রতি দুই পালায় উৎপাদন চালু করেছে। এর বাইরে অনেকেই স্বল্প পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে শ্রমিকসংকট প্রকট। আগের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সে জন্য ক্রয়াদেশ থাকলেও তা নিতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। কারণ, তাতে লোকসানের আশঙ্কা থাকছে।

নরসিংদীর পলাশে ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে চরকা। কারখানাটিতে ব্রা, প্যান্টি, বক্সার, স্যান্ডো গেঞ্জিসহ বিভিন্ন ধরনের অন্তর্বাস তৈরি হয়। তার বাইরে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, লেগিংস, হুডিসহ বিভিন্ন ধরনের নিট পোশাকও তৈরি হয়। চরকায় কাজ করেন ৭ হাজার শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নারী। হাজার দুয়েক শ্রমিকের থাকার জন্য আছে ডরমিটরি। শ্রমিকেরা ৫ টাকার বিনিময়ে দুপুরের খাবার পান। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ডলার বা ৭৬৫ কোটি টাকা।

চরকা টেক্সটাইল কাটিং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং—এই তিনটি সেকশনে দ্বিতীয় শিফট চালু করেছে। শিগগিরই সুইং সেকশনের দ্বিতীয় শিফট চালু করবে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার প্রভাব কেটে যেতেই প্রচুর ক্রয়াদেশ আসছে। সম্ভাবনা থাকায় বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদিও শ্রমিকসংকট রয়েছে।’

করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে পোশাক রপ্তানি ইতিমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি। পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ভালো ক্রয়াদেশ থাকায় চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে। ইতিমধ্যে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ১ হাজার ৫৮৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে সাড়ে ২৩ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয় পালা চালু না করলেও অনেক পোশাক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার রাইজিং গ্রুপ। বাড়তি ক্রয়াদেশের কারণে এই শিল্পগোষ্ঠী তাদের কারখানায় নতুন করে ৪০০ মেশিন বসিয়েছে। এ জন্য ৮০০ কর্মী নিয়োগ দিয়েছে তারা।

রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ক্রয়াদেশ বেশি। তাই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ হতে পারে। তবে সেটি ৩০-৩৫ শতাংশ হলেও অস্বাভাবিক হবে না।

আবার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেও অনেক উদ্যোক্তা সফল হচ্ছেন না। কারণ, শ্রমিকসংকট প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি মজুরি দিয়েও কর্মী মিলছে না। চট্টগ্রামের ডেনিম এক্সপার্ট নামের কারখানাটি তেমনই সমস্যায় পড়েছে। বাড়তি ক্রয়াদেশের কারণে ৪০০-৪৫০ নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে গত কয়েক মাসে মাত্র ১১০ জন নিয়োগ দিতে পেরেছে। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে কারখানাটি ২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের কর্মীর সংখ্যা ২ হাজার ৫০ জন।

জানতে চাইলে ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকবলসংকটের কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারছি না।

সে জন্য নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য রপ্তানির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা কষ্ট হয়ে পড়েছে। অনেক নতুন ক্রয়াদেশও ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনাকালে পোশাক খাতের অনেক শ্রমিকই বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকেছেন। সে জন্য ভয়াবহ শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে। বাড়তি মজুরি দিয়েও কর্মী মিলছে না। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে শিগগিরই নজর দেওয়া না হলে রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাতটি ভুগবে।

শিল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন