১০০০ মাটির হাঁড়ি বানিয়ে মাসে লাভ মাত্র ৩ হাজার টাকা

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর অঞ্চল মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। সেই বিজয়পুর অঞ্চলের গাঙকুল গ্রামের মৃৎশিল্পী রত্না রানী পাল। বয়স ৪০–এর কোঠায়। বংশপরম্পরায় তিনি কুমারের কাজ করেন। সারা মাস কাদামাটি নিয়ে খেলা করেন তিনি। তৈরি করেন হাজার হাজার মাটির পাত্র। পূর্বপুরুষেরা মাটির হাঁড়ি–পাতিল বানাতেন। তাই রত্না রানী পালও এ পেশায় রয়ে গেছেন।

রত্না রানী পাল জানেন না, তাঁর পূর্বপুরুষেরা কত পুরুষ আগে থেকে এ পেশায় এসেছেন। তবু রত্না রানী পাল বংশানুক্রমিক এ পেশা ধরে রেখেছেন। ছোটবেলায় তিনি শুধু দেখেছেন, তাঁর দাদা হীরক পাল ও বাবা সুভাস পাল এ পেশায় ছিলেন। মাটির হাঁড়ি বিক্রি করে আয় নেই বললেই চলে। সংসারের হাঁড়ি যেন চলে না। প্রতি মাসে এক হাজার মাটির হাঁড়ি বানিয়ে খরচ বাদে হাতে থাকে মাত্র তিন হাজার টাকা। তবু বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারছেন না।

সম্প্রতি এক দুপুরে গাঙকুল গ্রামে রত্না রানী পালের বাড়ির উঠোনে বসে কথা হলো। রত্না রানী বলেন, ‘মাটির কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ জানি না। ছোটবেলা থেকেই বাপ-দাদাদের দেখেছি, কীভাবে মাটির জিনিসপত্র বানাতে হয়। তাদের কাছেই কাজ শিখেছি। এখন আর কী করব? তাই বাপ-দাদার কাজেই আছি।’

লাভ কেমন হয়, এ কথা জিজ্ঞাসা করতেই নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরলেন। তিনি জানান, সারা মাস খেটে তিনি একাই এক হাজার মাটির পাত্র বানাতে পারেন। প্রতিদিন ৩০-৪০টি মাটির হাঁড়ি বানিয়ে রাখেন। মাসে একবার বাড়ির উঠানে একসঙ্গে প্রায় এক হাজার হাঁড়ি পোড়ানো হয়। সব মিলিয়ে খরচ হয় ছয় হাজার টাকা। যেমন এক ট্রাক্টর মাটির দাম দুই হাজার টাকা পড়ে। আর পোড়ানোর জন্য তিন বস্তা খড় কিনতে খরচ হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা। এ ছাড়া গোবরের লাঠি (জ্বালানি) ৮০০ টাকা, লাকড়ি ৬০০ টাকা, প্রলেপের জন্য কাদামাটি কেনায় ৩০০ টাকা লাগে। এ ছাড়া যেদিন পোড়ানো হবে, সেদিন একজন লোক লাগে। তাঁকে ৫০০ টাকা মজুরি দিতে হয়।

সবশেষে এক কেজি দইয়ের হাঁড়ি পাইকারি মূল্য মাত্র ৯ টাকা। এক হাজার হাঁড়ির জন্য রত্না রানী পান মাত্র ৯ হাজার টাকা। সারা মাস খাটুনির পর খরচ বাদে আয় মাত্র তিন হাজার টাকা।

রত্না রানী পালের তিন সন্তান, এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ১৬ বছর বয়সী বড় ছেলে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। বাকি দুই মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। স্বামীসহ পাঁচজনের সংসার চালাতে কষ্ট হয়। স্বামী বিকাশ পালও একসময় পেশায় কুমার ছিলেন। কিন্তু রোজগার কম, তাই বছর চারেক আগে থেকে ভ্যানগাড়ি চালাতে শুরু করেন। সময় পেলেই স্ত্রীকে কাজে সহায়তা করেন।

রত্না রানী পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুমারদের কেউ দাম দেয় না। নিচু জাতের মনে করে, অনেকে কথাই বলতে চায় না। অন্য কোনো কাজ তো শিখিনি। তাই কষ্ট হলেও এ পেশায় আছি।’ তিনি বলেন, মেয়েদের তিনি লেখাপড়া করাবেন। এ পেশায় কিছুতেই আনবেন না।