default-image

পোশাককর্মীদের স্বাস্থ্যবিমায় দিনে এক টাকা করে খরচ করলে কর্মীরা কাজের মাধ্যমে মালিকপক্ষকে ফেরত দিতে পারবেন ১৭ গুণ। স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের শারীরিক–মানসিক সুস্থতার জন্য ধাপে ধাপে স্বাস্থ্যবিমা চালুর ওপর জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন এসএনভি-প্রথম আলোর ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া বক্তারা।

গত বুধবার ‘পোশাক খাতে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা: স্বাস্থ্যবিমা’ শিরোনামের সভায় বক্তারা বিমার কিস্তি প্রদানে সরকার, মালিক ও শ্রমিক সব পক্ষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে কর্মীরা বিমার ব্যাপারে আস্থা পাবেন এবং একটি কার্যকর বিমা চালু করা সম্ভব হবে। পোশাক কারখানায় নারী কর্মীর সংখ্যা বেশি থাকায় বিমার আওতায় নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলেছেন তাঁরা।

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহযোগিতায় পরিচালিত এসএনভি বাংলাদেশের ওয়ার্কিং উইথ ওমেন প্রকল্প-২ এবং প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে ‘পোশাকশিল্পে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা’ শিরোনামের ৬ পর্বের ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভার তৃতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয় গত বুধবার। এ পর্বে বক্তারা কথা বলেন পোশাক কারখানার কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে। এর আগে দ্বিতীয় পর্ব ২১ অক্টোবর এবং প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ৮ অক্টোবর।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের (কেন্দ্রীয় তহবিল) মহাপরিচালক মো. আমির হোসেন বলেন, ৪ হাজারের বেশি নিবন্ধিত পোশাক কারখানার মধ্যে ৩ হাজার ৬০০ প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাতের ৪৫ লাখের বেশি কর্মীর ৮০ শতাংশ নারী। ২০১৭ সালে ইউএসএইড পোশাক কারখানার কর্মীদের ওপর একটি বেইজলাইন জরিপ পরিচালনা করে দেখে, বেশির ভাগ কর্মীই নিজের স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে সচেতন নন। এখন অর্ধেকের বেশি সংখ্যক সচেতন। এই অবস্থায় কর্মীদের ওপর নতুন করে জরিপ পরিচালনা করা দরকার। প্রতিদিন মালিক ও কর্মী এক টাকা করে দিলে ৩৬৫ দিনে কর্মীর জন্য একটি বিমা করা সম্ভব।

কর্মীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক চিন্তা দূর করে মানসিক শান্তি দেওয়ার জন্য বিমা চালু করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএর স্বাস্থ্যবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হানিফুর রহমান। তিনি বলেন, বেতন তুলে বাড়ি যেতে যেতেই একজন পোশাককর্মীর বেতনের ৭৫ শতাংশ শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় নিজে অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচের কথা চিন্তা করে পিছিয়ে যান। অসুখ পুষে কাজ করেন। একসময় অসুস্থ হয়ে ১–২ দিন কারখানায় অনুপস্থিত থাকেন। তাই কারখানার উৎপাদনের স্বার্থে কর্মীর সুস্থ থাকার দিকে নজর বাড়াতে হবে। অনেক কর্মী মারা যান। সেই কারণগুলোও বিশ্লেষণ করা দরকার।

হানিফুর রহমান বলেন, মালিকদের রপ্তানি আয়ের একটি অংশ কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা করা হয়। তবে সে তহবিলের অর্থ শুধু কর্মীর মৃত্যু বা বেশি অসুস্থতার ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। কর্মীর স্বাস্থ্যবিমার পেছনে দিনে এক টাকা খরচ করলে কর্মী কাজের মাধ্যমে মালিককে ফেরত দিতে পারবেন ১৭ টাকা। একসঙ্গে কাজ করলে এই ‘মূল্যহীন’ এক টাকা ‘অসাধারণ মূল্য’ হয়ে দাঁড়াবে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ বলেন, এক টাকা কিস্তিতে ১৭ গুণ ফেরত দেওয়ার তাত্ত্বিক হিসাব যত সহজ, বাস্তবে প্রয়োগ তত সহজ নয়। তবে কর্মীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ধাপে ধাপে হলেও স্বাস্থ্যবিমা চালু করা জরুরি। শাহাদৎ হোসেনের মতে, বিমার কিস্তি পরিশোধ যৌথভাবে হওয়া উচিত।

শুধু কর্মীর পকেট থেকে খরচ হওয়া আদর্শ হবে না। মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন ও সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিমা চালুর আগে কিস্তি কত হবে, কোন কোন রোগ বিমার আওতায় থাকবে, কর্মীর পরিবার আওতাভুক্ত হবে কি না, তা বিবেচনায় রাখতে হবে। পোশাককর্মীদের বেশির ভাগ নারী হওয়ায় বিমায় প্রজনন স্বাস্থ্যকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এই বড় কর্মযজ্ঞ চালাতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন করতে হবে এবং বিমার সার্বিক বিষয় তদারকির জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

একই মত প্রকাশ করলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের (কেন্দ্রীয় তহবিল) মহাপরিচালক মো. আমির হোসেন। তিনি বলেন, সময়সাপেক্ষ কাজটি ধাপে ধাপে শুরু করার জন্য সব পক্ষের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সবাই অংশ নিলে টেকসই ও কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা চালু করা সম্ভব।

বিমার বিষয় টেকসই করার জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন এসএনভি বাংলাদেশের ইনক্লুসিভ বিজনেস অ্যাডভাইজার জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ১২টি কারখানায় স্বাস্থ্যবিমার ওপর পাইলট প্রকল্প নিয়েছে এসএনভি। সেখানে কর্মী ও মালিক, দুই পক্ষই বিমার অর্থ দিচ্ছে। অনুপস্থিত আছে সরকারি সহায়তা। তবে এ কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিমা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব। কর্মী মনে করেন, শুধু মালিকই অর্থ দেবেন, নিজেদের দিতে হবে না।

মালিকপক্ষ চায় সরকার অংশীদার হবে। এসব নানামুখী ভাবনার কারণে বিমার বিষয়টি পোশাক কারখানায় প্রস্তাব করাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিমা চালুর মাধ্যমে কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন আরও গতিশীল হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0