তরুণদের ভোট টানতে স্টার্টআপ ও তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি কার কী প্রতিশ্রুতি
টেকসই উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ—এই দুই খাত অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রে জড়িত। কর্মসংস্থান, উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। এর ফলে প্রশাসনিক ব্যয়, দুর্নীতি ও অনিয়ম কমানো যায়। আর স্টার্টআপে তৈরি হয় নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান।
দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছিল বিগত সরকার। ২০২১ সালে স্টার্টআপ ফান্ড নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও গঠন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারও প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে। এ ছাড়া ডিজিটাল সেবা ও প্ল্যাটফর্মগুলোয় আন্তসংযোগ স্টারলিংক ইন্টারনেটও দেশে আনে অন্তর্বর্তী সরকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি—এই তিন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণ উদ্যোক্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি আছে। কোন দলের কেমন প্রতিশ্রুতি? এ নিয়ে কী বলছেন এই খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা?
১০ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বিএনপির
নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি খাতে বিএনপি অ্যাগ্রিপ্রেনিউরশিপ স্টার্টআপ প্রকল্প ও কৃষি উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম গঠনের কথা বলেছে। আর কৃষকদের দেওয়া হবে কৃষক কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি ও কৃষিঋণের সুবিধাসহ কৃষক মুঠোফোনে আবহাওয়া, বাজার তথ্য ও ফসলের চিকিৎসা–সুবিধা পাবেন।
আর শিক্ষা খাতে ডিজিটাল এডুকেশন পলিসি তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। এক শিক্ষক, এক ট্যাব, সংযুক্ত ক্লাসরুম এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা শিক্ষা আইডি করা হবে। এর ফলে শিক্ষায় একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
আইটি পার্কগুলোয় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াই–ফাইয়ের সুবিধা দেওয়া হবে। শিল্পপার্কে স্টার্টআপ শিল্প ইউনিটের সুবিধা দেওয়া হবে। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য পেপ্যাল চালুর কথাও বলা আছে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিপণন সহজে অ্যামাজন ও আলিবাবার মতো বড় ই–কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা হবে। প্রতিবছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও ফ্রিল্যান্স তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ বছর মেয়াদি করের সুবিধা দেওয়া হবে। স্বল্প সুদে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে ঋণের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। আর পুঁজিবাজারে স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস ব্যবস্থা চালু করা হবে। দেশের জনবহুল স্থানে বিনা মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হবে।
রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ বলেন, ইশতেহারে দেশের প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, এটি ইতিবাচক। এই দুই খাতকে এগিয়ে নিতে হলে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে কর ব্যবস্থার সংস্কারও প্রয়োজন। তাই এ বিষয়গুলো ইশতেহারে থাকা প্রয়োজন ছিল।
আমার টাকা আমার হিসাব
সরকারের আয়–ব্যয়সংক্রান্ত তথ্যসহ দেশি–বিদেশি ঋণ, অনুদান, প্রবাসী আয় ও বিভিন্ন সেবামূলক খাতে সরকারের আয়ের তথ্য জানা যাবে অ্যাপ থেকে। এই অ্যাপের নাম দেওয়া হবে আমার টাকা আমার হিসাব। সরকারি সব সেবার জন্য একক ই–গভর্ন্যান্স পোর্টাল চালু করা হবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
জামায়াতে ইসলামী আরও বলছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিতে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ফ্রিল্যান্স খাতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে পাঁচ বছরে ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। আর পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেট, বনানী, যাত্রাবাড়ী, উত্তরাসহ ২০টি হাই ট্রাফিক জংশনে রিয়েল টাইম ট্রাফিক অ্যানালিসিস অনুযায়ী সিগন্যাল ব্যবস্থা করা হবে। একটি শহর সব বাস, ট্রেন, বিআরটি ও মেট্রোর জন্য একই ই–টিকিটিং কার্ড ও মোবাইল অ্যাপ করা হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়নে সিসিটিভি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ই–ফাইন বা ডিজিটাল জরিমানা ব্যবস্থা চালু করা হবে।
চাঁদাবাজি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হবে। বিভাগীয় শহরগুলোয় ইনকিউবেশন সেন্টার তৈরি করা হবে। যেখানে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং ও বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় উচ্চগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও কো–ওয়ার্কিং স্পেসসহ ‘ইয়ুথ টেক হাব’ তৈরি করা হবে। নারী, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে।
দলগুলোর ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে শিক্ষা প্রযুক্তি (এডটেক) স্টার্টআপ শিখোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহির চৌধুরী বলেন, শুধু নতুন পরিকল্পনার কথা বললেই হবে না। সবচেয়ে জরুরি হলো, এগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। বিশেষ করে স্টার্টআপ অর্থায়নের ক্ষেত্রে। পুঁজিবাজার সংস্কার, বিদেশি বিনিয়োগ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল আনার পরিবেশও তৈরি করা প্রয়োজন। সব দলের ইশতেহার ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবনে অগ্রাধিকার।
১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ইশতেহারে নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করার কথা বলেছে। নতুন স্টার্টআপ বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও প্রথম পাঁচ বছর কর অবকাশ দেওয়া হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত করতে একটি কেন্দ্রীয় স্টার্টআপ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানত ও লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
দলটির ইশতেহারে বলা হয়, ডিজিটাল অর্থনীতি খাতে পাঁচ বছরে ১৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। ৬৪টি জেলায় ডিজিটাল হাব স্থাপন করা হবে। সেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও কো–ওয়ার্কিং স্পেসসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। দেশে ক্যাশলেস অর্থনীতি তৈরিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি) চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ইশতেহারে আরও বলা হয়, আর সব ধরনের সরকারি সেবা সহজ করতে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কার্ডকে একমাত্র ডিজিটাল আইডি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এনআইডিকে নির্বাচন কমিশন থেকে পৃথক করা হবে। এনআইডিভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বহিঃশত্রু আক্রমণ ও সামাজিক মিডিয়ায় অপপ্রচার (ডিজইনফরমেশন) রোধে বিশেষায়িত সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে। পাঁচ বছরে দেশের সুপারকম্পিউটিং সক্ষমতা ৫০ পেটা ফ্লপে উন্নীত করা হবে।
বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাসরুর প্রথম আলোকে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ নিয়ে সব দলই বেশ ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। স্টার্টআপ খাতে কর অবকাশও একটি ভালো উদ্যোগ। তবে স্টার্টআপ খাতে বড় প্রতিবন্ধকতা স্টার্টআপ তহবিলের প্রয়োগ। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখনো জরুরি হলো বাজার আরও সহজ করা। এ জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি ইন্টারনেটের ওপর শুল্ক কমানো বা দাম কমানো। তবে এ নিয়ে তিন দলের কেউই কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।