দিনাজপুর সদরের কালীতলায় উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারখানায় ঢুকতেই শ্রমিকদের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। এদিকে একজন লোহার পাত পেটাচ্ছেন তো, অন্যদিকে আরেকজন ঝালাইয়ের কাজে ব্যস্ত। কেউ চাকা লাগাচ্ছেন তো, কেউ ব্যস্ত কৃষিযন্ত্রের বডি তৈরিতে। শেডের ভেতরে অত্যাধুনিক যন্ত্রে কম্পিউটারের নির্দেশনায় কেউ স্টিলের পাত কাটছেন বা জোড়া লাগাচ্ছেন আর বাইরে তখন চলছে নতুন যন্ত্রের ট্রায়াল। প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দিয়ে দক্ষ হাতে এভাবেই তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের কৃষিযন্ত্র।
উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিচালক অমিতাভ পাল জানান, ১৯৯১ সালে ছোট্ট একটি ওয়ার্কশপ দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে যুক্ত হয়। তখন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ টাকা। এখন এটি শতকোটি টাকার কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ধান ও ভুট্টা মাড়াই, ধান থেকে চাল তৈরি, শর্ষে ভাঙানো, আলু উত্তোলন এবং ছোট সিডার ৫১ ধরনের যন্ত্র তৈরি করে উত্তরণ, যেখানে কাজ করেন ১০০ জনের বেশি শ্রমিক। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বছরে আড়াই হাজারের বেশি কৃষিযন্ত্র তৈরি করে।
উত্তরণের কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আকার ও মডেলের যন্ত্র তৈরি করেন। এসব যন্ত্র উত্তরবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও যাচ্ছে। বিশেষ করে বরগুনা ও পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় এলাকায় চাহিদা বাড়ছে। সারা দেশে উত্তরণের ১০টি নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রাফেদ উল ইসলাম জানান, তাঁরা আমদানি বিকল্প কৃষিযন্ত্র তৈরি করছেন। আমদানি করা একটি যন্ত্রের দাম যেখানে ৫০ হাজার টাকা, সেখানে একই যন্ত্র তাঁরা ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। যন্ত্রে তাঁরা বিক্রয়োত্তর রক্ষণাবেক্ষণ সেবাও দেন। তিনি বলেন, ‘দামে কম এবং মানে ভালো হওয়ায় আমাদের যন্ত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।’
* ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা দামের যন্ত্র বিক্রি।
* বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৫০ কোটি টাকার বেশি।
* দেশে কৃষিযন্ত্রের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকার।
* দেশি উৎপাদন মাত্র ৭০০ কোটির।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেন, ধরন ভেদে উত্তরণের কৃষিযন্ত্র ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। বছরে তাঁদের ৫০ কোটি টাকার বেশি যন্ত্র বিক্রি হয়। শক্ত স্টিল ব্যবহার করায় চীন থেকে আমদানি করা অনেক যন্ত্রের তুলনায় এসব যন্ত্র বেশি টেকসই ও মজবুত। তাঁদের দাবি, আধুনিক লেজার কাটিং মেশিন যুক্ত হওয়ার পর উত্তরণের তৈরি যন্ত্রের মান ও ফিনিশিং উন্নত হয়েছে। ফলে উত্তরণ এখন উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছে। আগামী ১০ বছরে দেশে কৃষিযন্ত্রের মোট চাহিদার অন্তত ৫০ শতাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় এ প্রতিষ্ঠান। তবে এ জন্য সরকারি নীতিসহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
উত্তরণের তৈরি কৃষিযন্ত্রকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে। তেমনই একজন দিনাজপুরের সবুর মিয়া। তাঁর সঙ্গে উত্তরণের কারখানায় কথা হয় প্রথম আলো প্রতিনিধির। তিনি জানান, ধান মাড়াইয়ের একটি যন্ত্র কিনতে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে এসেছেন। তাঁরা প্রতি ৫০ শতাংশ জমির ধান মাড়াইয়ের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা নেন।
দিনাজপুর, নীলফামারীসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সবুর মিয়ার মতো অনেকেই মৌসুমে যন্ত্র নিয়ে মাঠে গিয়ে ধান মাড়াই করেন। এর মানে, কৃষককে ধান নিয়ে অন্য কোথাও যেতে হচ্ছে না, বরং উদ্যোক্তারাই কৃষকের বাড়ি বা মাঠে পৌঁছে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি নীলফামারীর চিলাহাটিতে স্থানীয় উদ্যোক্তা বাপ্পি মিয়া জানান, তিন বছর আগে তিনজনে তিন লাখ টাকা দিয়ে একটি মাড়াইযন্ত্র কিনেছেন। প্রতি বিঘা জমির ধান মাড়াইয়ে তাঁরা ৫০০ টাকা নেন। মৌসুমে মাসে ৬০ হাজার টাকার বেশি আয় হয় বলে জানান তিনি।
খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে কৃষিযন্ত্রের বাজারের আকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার যন্ত্র দেশে তৈরি হয়। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ছোট-বড় প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান এ খাতে কাজ করছে।
জানতে চাইলে অ্যাগ্রিকালচার মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশের (এএমএমএ-বি) সভাপতি আলিমুল আহসান চৌধুরী বলেন, এবার হাওরে ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিযন্ত্রের বিক্রিতে প্রভাব পড়েছে। অনেকে অর্ডার করেও যন্ত্র নেননি। তাঁর মতে, কৃষিযন্ত্রের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। তবে কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে দেশে কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ব্যয়বহুল রয়ে গেছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদের হার ৭ থেকে ১৪ শতাংশে উঠে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি এসব সমস্যার সমাধান চান।
উত্তরণের আরেক বড় চ্যালেঞ্জ বিক্রির অর্থ আদায়। ইতিমধ্যে বাজারে পাঁচ কোটি টাকার বেশি পাওনা আটকে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অমিতাভ পাল বলেন, কৃষকদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা গেলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বাকিতে যন্ত্র বিক্রি করতে হতো না। এতে কৃষকের যন্ত্র বেচাকেনা সহজ হতো, একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অর্থের জোগান পেত।
এদিকে দেশি কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বাড়লেও তা তৈরির করার দক্ষ কর্মীর সংকট কাটছে না। বিশেষ করে আধুনিক মেশিন পরিচালনায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রকট। এ কারণে উত্তরণ একটি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে।
অমিতাভ পাল বলেন, ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে তাঁরা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত একটি লেজার কাটিং মেশিন বসিয়েছেন। এই লেজার মেশিনে স্টিলের পাত নিখুঁতভাবে কাটা যায়। ফলে উৎপাদনের মান ও গতি দুটিই বাড়ে। কিন্তু সেটি চালানোর মতো দক্ষ কর্মী পেতে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লেগেছে তাঁদের।
স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উদ্যোক্তারা কাঁচামালের শুল্ক ও ঋণের সুদ মওকুফ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং যন্ত্র কেনায় কৃষকদের অর্থায়নে নীতিসহায়তা দাবি করেন উদ্যোক্তারা।